হুরমুর করে আরো একগাদা লোক আছড়ে পড়ল বাসের উপর। তিল ধারণের জায়গাটুকু পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। কিন্তু তবুও ঠেলে-ঠুলে ঠিকই ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে লোকগুলো। কেউ ঝুলে আছে দরজায়। আবার কেউবা উঠে যাচ্ছে ছাদে। ছাদ থেকে কয়েকজনের পা জানালার দিকে ঝুলে থাকতে দেখলো ময়না। ভাগ্যিস আগে আগে ওরা টিকেট কেটে সিটে বসতে পেরেছিলো। নাহয় ওদেরকেও হয়তো এভাবেই যেতে হতো। অবশ্য সিট না পেলে দাঁড়িয়ে যেতে রাজি হতেন না বাবা। শহরে যাবার পথেই যে এত ঝামেলা পোহাতে হবে তা ধারণাও করতে পারেনি সে। এমন জানলে কেনাকাটা করার জন্য বাবার সাথে আসার বায়না ধরতো না ময়না।
মুড়ির টিনের মতো বাসটি ঘট ঘট ঘট শব্দ তুলে এগুচ্ছে গরুর গাড়ির গতিতে। বেশি প্যাসেঞ্জার বোঝাই করেছে বলে নয়, এ বাসগুলোর প্রকৃতিই এমন। মাত্র ষোল কিলোমিটার দূরত্বের এ পথটুকু পাড়ি দিতে এক থেকে দেড় ঘন্টার মতো লেগে যায়। কারণ একটু পর পর থামরে, প্যাসেঞ্জার তোলরে, স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেলে ঠেলে ঠুলে স্টার্ট তুলরে ইত্যাদি আরকি। এখন মনে হচ্ছে রিকসায় গেলেই ভালো হতো। কিন্তু রিকসা যা ভাড়া চাইল তা শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো ওদের। ঈদের মৌসুমে ভাড়া তিন থেকে চারগুন হয়ে যায় কেন তা বুঝে আসছে না ময়নার।
ওহ্, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। বাসের গোমোট পরিবেশে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বাবা অবশ্য জানালার পাশের সিটেই বসিয়েছেন তাকে। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন বাবার গায়ের উপর যেভাবে হেলে পরছে, তাতে বাবাও খানিকটা চেপে বসেছেন ময়নার দিকে। লোকজনের ঘামের বোঁটকা গন্ধে পেট গুলিয়ে আসছে। ক্ষনে ক্ষনে উথলিয়ে উঠতে চাচ্ছে বমি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জানালার কাঁচ খুলে দিয়েছেন বাবা। এতে বাইরে থেকে বাতাস ঢোকছে বটে, সেই সাথে ঢোকছে ধুলো। মুহুর্তের মাঝেই ধুলোময় হয়ে গেল ময়না। ভেতর থেকে খ্যাট খ্যাট করে উঠলো কয়েকজন লোক
- এ্যাই ভাই জানালা খুলছুইন কেরে? বালু (ধুলি) আইতাছে।
- ছেরিডা বুমি করবঅ দেকতাছুইন না? মেয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলল তোতা মিয়া।
লোকজনের কটুক্তি আর ধুলির ঝড়ে বমি করতে ভুলে গেল ময়না। বন্ধ করে দিলো জানালার কাঁচ। চুপচাপ বসে রইলো জনারন্যের ভেতর।
- আহাইরে জানডা বাইরইয়া যাইতাছেগা। বিরক্তি প্রকাশ করল এক যাত্রী। তার কথাতে ধরলো অন্য আরেকজন
- জান বাইরইতনা, বাসের মইদ্যে মানুষ কট্টি (কতগুলো) লইছে দেখছনি। দুইন্নাইডার মাইদ্যে (দুনিয়াতে) যে কত মানুষ আছে ঈদের সময় অইলে দেহুন যায়।
- আরে অহনঅই মানুষের দেখছঅ কি, ঈদ তঅ আরো কয়দিন দেরি আছে।
- হেই কতা আর কইয়েননা ভাই। সারা দেশের মইদ্যে আউলাডাতঅ লাগবঅ ঈদের আগের দিন। অফিস আদালতে ছুটি থাহে মাত্র তিন দিনের। ঈদের আগের দিন সবাই শহর ছাইরা ছুডে গেরামের দিকে। কিন্তু কেউ ঠিক সময়ের মাইদ্যে যাইতে পারেনা। কেউ যায় ঈদের দিন। আবার রাস্তায় এক্সিডেন্ট কইরা কেউ পৌঁছতেই পারেনা।
- একবার না হুনছিলাম, সরকার নাকি এইবার থেইকা ঈদের ছুটি পাঁচদিনের করবঅ? হের পরেতো আর কোনঅ খবর-টবর হুনলামনা
- রোজার ঈদ অইল গিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসবের লাইগ্যা পাঁচদিনের ছুটি দিলে মানুষ ইকটু শান্তিতে গেরামের বাড়িতে গিয়া ঈদ করতঅ পারব।
- হুনছি অইন্য অনেক দেশে নাকি বড় উৎসবে বেশি দিনের ছুটি থাহে।
- অইন্য অনেক দেশে থাকলেই যে আমার দেশে থাকতে অইব, এমুন কোন কথা না। পাঁচদিনের ছুটি অইলে আমরার লাগি সুবিধা অয়, হেইডা অইল গিয়া বড় কতা।
যাত্রীদের একেকজনের একেক কথায় কান ঝালাপালা হয়ে উঠল ময়নার। গরম, বোটকা গন্ধ, বমির উদ্রেক সব মিলিয়ে চরম এক অস্থির সময় কাটছে ওর। আর এ অস্থিরতা নিয়েই সিটে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে ময়না। এগিয়ে চলছে বাস। বাড়ছে মানুষের কোলাহল
29.08.10
বিষয়
- কবিতা/ছড়া (14)
- খুদে পন্ডিতদের জন্য (1)
- নিশিদল (2)
- পাতায় পাতায় পাতা (6)
- প্রবন্ধ-নিবন্ধ (1)
- ফিচার (17)
- রম্য (2)
- সাজঘর থেকে (24)
মঙ্গলবার, আগস্ট ৩১, ২০১০
রবিবার, আগস্ট ১৫, ২০১০
উইল্লা চোরার উপলব্ধি
- তোতা মিয়া এক কেজি ছোলা দ্যাও।
বলে ধীরে-সুস্তে বেঞ্চিটায় বসল উইল্লা চোরা। শুনতে অশোভন এ শব্দটি ছাড়া তার সত্যি কোন নাম আছে কি না এ তথ্য ময়নার জানা নেই। এ নামেই সবাই তাকে চেনে। ‘উইল্লা চোরা’ অবশ্য তার নাম নয় বরং পরিচয়। ‘নামে নয় গুণেই পরিচয়’ আরকি। উইল্লা বিলাইয়ের (হুলো বিড়ালের) মত ছেঁচড়া চুরির অভ্যাস নাকি তার ছোটকাল থেকেই। অমুকের গাছের লাউটা, গাছ পাকা কাঁঠালটা, সব্জি ক্ষেত থেকে মুলাটা প্রায়ই উধাও হয়ে যেতো আগে। আর এসবের দায়ভার উইল্লা চোরার উপরই বর্তাতো। তার আতঙ্কে নাকি ঘর খালি রেখে গ্রামের মহিলারা পাড়া বেড়াতে পর্যন্ত পারত না। পাছে কোন জিনিসটা চুরি হয়ে যায়!
সেই হিসাবে এখন বেশ শান্তিতেই আছে গ্রামের মানুষ। কারণ আগের সেই ছ্যাঁচরা চুরির অভ্যাসটা ছেড়ে দিয়েছে উইল্লা চোরা। তাই বলে যে চুরি-চামারি থেকে অবসর নিয়েছে এমনটি নয়। এখনও দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে তার নামে দরবার আসে মাসে তিন কি চারবার।
- তুমি ছোলা দিয়া কি করবা? জিজ্ঞেস করল তোতা মিয়া
- কি করাম মানে, রোজা রমজানের দিন ছোলা ছাড়া ইফতার অয় নাকি?
- আসার্য্য কারবার! তুমি অইলা গিয়া চুর (চোর) মানুষ, তুমি হিবার রোজা রাখছ নাকি?
একটু যেন লজ্জ্বাই পেল উইল্লা চোরা। তারপর ঘাঢ় নুইয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল, আরে বেশতি কতা কইঅ না। আমি চোর অইতাম ফারি, কিন্তুক স্বভাব বালা আছে।
- তাইলে তুমি হাছাহাছি রোজা রাকছ! যেন আকাশ থেকে পড়ে প্রশ্নটি করল তোতা মিয়া।
- রোজা লইয়া কেউ মিছামিছি কতা কয় নাকি? চিন্তা করছি এইবার থেইকা রোজা থাহুনের অভ্যাস করাম।
- বেশ বালা চিন্তা। কিন্তুক রোজা থাইক্কা চুরি-চামারি করলে কি আর রোজা অইব?
- চিন্তা করছি এইসব ছাইরা দিয়াম। এই মাসটা দেহি ইকটু পাক-পবিত্র অইয়া আল্লা-বিল্লা কইরা কাডায়া দিতারি কিনা।
- তাইলে এইমাসে তোমার কুকাম বন্দ থাকব?
- হ
- খালি এই মাসে থাকবঅ নাকি সারা বছর? ঈদের পরেই হিবার পাপ কামানি শুরু করবা!
- আরে নাহ, কইলামনা বালা অইয়া গেছি।
- বালা অইয়া গেলে বালা কতা। হুনঅ একটা কতা কই, রমজান মাস অইল গিয়া সংযমের মাস। এই মাসে সংযমের অভ্যাস করনের লাই¹া আল্লায় কইছে। কারণ এই অভ্যাসের গতি যাতে সারা বছর থাহে। তুমি যুদি একমাস চুরি-চামারি ছাইরা বাঁচতে পার, তে সারা বছর পারতানা কেরে?
বাবার কথাটি বেশ ভালো লাগলো ময়নার। সাত্যিইতো একমাস ভাল হয়ে থাকতে পারলে সারাবছরইতো ভালো হয়ে থাকা যায়। দাদির কাছে সে শুনেছে রমজান মাস হলো অনুশীলনের মাস। রাতে সেহরি খাওয়া, ফজরের নামাজ পড়া, সকালে ঘুম থেকে উঠা, কাজে যাওয়া, ইফতার করা, তারাবির নামাজ পড়ার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সময় কাটে অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। রমজান মাসে শয়তানকে নিয়ন্ত্রন করে রাখা হয় বলে মানুষের মাঝে খারাপ কাজ করার প্রবণতা কমে যায়। উইল্লা চোরাই এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
ততক্ষনে এক কেজি ছোলার প্যাকেট তোতা মিয়ার কাছ থেকে বুঝে নিলো উইল্লা চোরা। তারপর হাত বাড়িয়ে দশ টাকার চারটি কড়কড়ে নোট এগিয়ে দিলো।
- আরও পাঁচ টেহা দেওঅন লাগবঅ। দাম অহন বাড়তি, তোতা মিয়ার এ কথাতে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো উইল্লা চোরা।
- আরে কি কও, ছোলার দাম অত বাইড়া গেছেগা!
- খালি ছোলার দাম কেরে, রোজা উপলক্ষে অনেক কিছুর দামঅই অহন বাড়তি।
- রোযা অইলঅ গিয়া সংযমের মাস। আর বাংলাদেশের ব্যবসায়িরা এই মাসে সংযম করবতো দুরের কতা, লুটপাটের উৎসব লাগাইয়া দেয়। রোজার মাইদ্যে আমি উইল্লা চোরা গেলাম বালা অইয়া, আর ব্যবসায়ীরা শুরু করল ডেহাইতি (ডাকাতি)। হায় আফসোস!
বলে ধীরে-সুস্তে বেঞ্চিটায় বসল উইল্লা চোরা। শুনতে অশোভন এ শব্দটি ছাড়া তার সত্যি কোন নাম আছে কি না এ তথ্য ময়নার জানা নেই। এ নামেই সবাই তাকে চেনে। ‘উইল্লা চোরা’ অবশ্য তার নাম নয় বরং পরিচয়। ‘নামে নয় গুণেই পরিচয়’ আরকি। উইল্লা বিলাইয়ের (হুলো বিড়ালের) মত ছেঁচড়া চুরির অভ্যাস নাকি তার ছোটকাল থেকেই। অমুকের গাছের লাউটা, গাছ পাকা কাঁঠালটা, সব্জি ক্ষেত থেকে মুলাটা প্রায়ই উধাও হয়ে যেতো আগে। আর এসবের দায়ভার উইল্লা চোরার উপরই বর্তাতো। তার আতঙ্কে নাকি ঘর খালি রেখে গ্রামের মহিলারা পাড়া বেড়াতে পর্যন্ত পারত না। পাছে কোন জিনিসটা চুরি হয়ে যায়!
সেই হিসাবে এখন বেশ শান্তিতেই আছে গ্রামের মানুষ। কারণ আগের সেই ছ্যাঁচরা চুরির অভ্যাসটা ছেড়ে দিয়েছে উইল্লা চোরা। তাই বলে যে চুরি-চামারি থেকে অবসর নিয়েছে এমনটি নয়। এখনও দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে তার নামে দরবার আসে মাসে তিন কি চারবার।
- তুমি ছোলা দিয়া কি করবা? জিজ্ঞেস করল তোতা মিয়া
- কি করাম মানে, রোজা রমজানের দিন ছোলা ছাড়া ইফতার অয় নাকি?
- আসার্য্য কারবার! তুমি অইলা গিয়া চুর (চোর) মানুষ, তুমি হিবার রোজা রাখছ নাকি?
একটু যেন লজ্জ্বাই পেল উইল্লা চোরা। তারপর ঘাঢ় নুইয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল, আরে বেশতি কতা কইঅ না। আমি চোর অইতাম ফারি, কিন্তুক স্বভাব বালা আছে।
- তাইলে তুমি হাছাহাছি রোজা রাকছ! যেন আকাশ থেকে পড়ে প্রশ্নটি করল তোতা মিয়া।
- রোজা লইয়া কেউ মিছামিছি কতা কয় নাকি? চিন্তা করছি এইবার থেইকা রোজা থাহুনের অভ্যাস করাম।
- বেশ বালা চিন্তা। কিন্তুক রোজা থাইক্কা চুরি-চামারি করলে কি আর রোজা অইব?
- চিন্তা করছি এইসব ছাইরা দিয়াম। এই মাসটা দেহি ইকটু পাক-পবিত্র অইয়া আল্লা-বিল্লা কইরা কাডায়া দিতারি কিনা।
- তাইলে এইমাসে তোমার কুকাম বন্দ থাকব?
- হ
- খালি এই মাসে থাকবঅ নাকি সারা বছর? ঈদের পরেই হিবার পাপ কামানি শুরু করবা!
- আরে নাহ, কইলামনা বালা অইয়া গেছি।
- বালা অইয়া গেলে বালা কতা। হুনঅ একটা কতা কই, রমজান মাস অইল গিয়া সংযমের মাস। এই মাসে সংযমের অভ্যাস করনের লাই¹া আল্লায় কইছে। কারণ এই অভ্যাসের গতি যাতে সারা বছর থাহে। তুমি যুদি একমাস চুরি-চামারি ছাইরা বাঁচতে পার, তে সারা বছর পারতানা কেরে?
বাবার কথাটি বেশ ভালো লাগলো ময়নার। সাত্যিইতো একমাস ভাল হয়ে থাকতে পারলে সারাবছরইতো ভালো হয়ে থাকা যায়। দাদির কাছে সে শুনেছে রমজান মাস হলো অনুশীলনের মাস। রাতে সেহরি খাওয়া, ফজরের নামাজ পড়া, সকালে ঘুম থেকে উঠা, কাজে যাওয়া, ইফতার করা, তারাবির নামাজ পড়ার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সময় কাটে অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। রমজান মাসে শয়তানকে নিয়ন্ত্রন করে রাখা হয় বলে মানুষের মাঝে খারাপ কাজ করার প্রবণতা কমে যায়। উইল্লা চোরাই এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
ততক্ষনে এক কেজি ছোলার প্যাকেট তোতা মিয়ার কাছ থেকে বুঝে নিলো উইল্লা চোরা। তারপর হাত বাড়িয়ে দশ টাকার চারটি কড়কড়ে নোট এগিয়ে দিলো।
- আরও পাঁচ টেহা দেওঅন লাগবঅ। দাম অহন বাড়তি, তোতা মিয়ার এ কথাতে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো উইল্লা চোরা।
- আরে কি কও, ছোলার দাম অত বাইড়া গেছেগা!
- খালি ছোলার দাম কেরে, রোজা উপলক্ষে অনেক কিছুর দামঅই অহন বাড়তি।
- রোযা অইলঅ গিয়া সংযমের মাস। আর বাংলাদেশের ব্যবসায়িরা এই মাসে সংযম করবতো দুরের কতা, লুটপাটের উৎসব লাগাইয়া দেয়। রোজার মাইদ্যে আমি উইল্লা চোরা গেলাম বালা অইয়া, আর ব্যবসায়ীরা শুরু করল ডেহাইতি (ডাকাতি)। হায় আফসোস!
বুধবার, আগস্ট ১১, ২০১০
মঙ্গলবার, আগস্ট ১০, ২০১০
বাতাস লাগছে বাতাস
মা সন্তানকে খুন করতে সহযোগিতা করে- কথাটা একদম বিশ্বাস করতে পারল না ময়না।
- আহা, কী ফুটফুটে চেহারা রে। বলতে বলতে পত্রিকাটা তোতা মিয়ার দিকে এগিয়ে দিল মন্তাজ উদ্দিন। ময়নারও কৌতুহল হলো তিন বছরের তানহাকে দেখতে। উঁকি দিলো পত্রিকার পাতায়। ইস, ডাগর চোখের কী মায়াবি চাহনি! ফোঁকলা দাঁত। কপালে কাজলের টিপ। মেয়েটাকে আদর করে এ টিপ কে পড়িয়ে দিয়েছিলো? ‘আয় আয় চাঁদ মামা/টিপ দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ/টিপ দিয়ে যা...’ ছড়া কাটতে কাটতে মায়েরাইতো এ কাজটি করে থাকে। তানহার ক্ষেত্রেও নিশ্চয়-ই এর ব্যতিক্রম হয়নি। হয়তো ছড়ার ছন্দে ছন্দে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওকে কাজল কালো করেছিলো মা-ই। তারপর চুমুতে চুমুতে কপাল ভরিয়ে ভনিতা করে বলেছিলো, এইতো আমার চাঁদের (তানহার) কপালে চাঁদ এসে টিপ দিয়ে গেলো। হ্যা, তখন তো মায়ের কাছে চাঁদের মতোই ছিলো তানহা। অমাবশ্যার অন্ধকার দূর করে মায়ের কোল জুড়ে সে এসেছিলো পূর্ণিমার চাঁদ হয়েই। দ্যুতি ছড়িয়েছিলো মায়ের মনে। সত্যিই কি তাই? এমনটিই তো হওয়ার কথা। ময়নার দেখা সব মায়েরাইতো এমন । মায়ের উষ্ণতাই সন্তানের প্রথম আশ্রয়। মাকে ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারে না ময়না। কিন্তু কী এমন ঘটনা ঘটল যে, তিন বছরের ছোট্ট শিশুর মৃত্যু হলো নিজের মায়ের কারণে! অপরাধটা ছিলো কার, শিশুর নাকি ওর মায়ের? অপরাধ যার-ই হোক। কী কারণে একজন মা নিজের কোল থেকে পূর্ণিমার চাঁদ দূরে ঠেলে দিতে চাইবে? কোন অমোঘ টানে? তাহলে কি এখন মায়েরাও বদলে যাচ্ছে। সন্তানরা কি এখন মায়ের কোলেও নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারবে না!
- ও পুতু (চাচা) পুতুগো, তানহা কি মা’রে (মাকে) ত্যক্ত (বিরক্ত) করতঅ?
- নাহ্। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক কথায় জবাব দিলো মন্তাজ উদ্দিন। কিন্তু মন্তাজ চাচার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারটা মোটেই আঁচ করতে পারলো না ময়না।
- তে (তাহলে) ছেরিডা কী দুষ করছিন (করেছিলো) যে একবারে মাইরালান লাগব (মেরে ফেলতে হবে)!
- এই ছেরি চুপ র্ক। মুরুব্বিরার কতার মইদ্যে কতা কওঅন (বলা) বালানা। ধমকে উঠল তোতা মিয়া।
বাবার ধমকে একেবারে চুপসে গেলো সে। আর কথা বলার সাহস হলোনা। তারপরও ক্ষীণ একটি আশা ধরে রেখেছিলো যে, অন্তত: ভদ্রতার জন্য হলেও মন্তাজ চাচা বুঝি তার কৌতুহল নিবৃত্ত করবে। কিন্তু ওদিক থেকেও কোন সাড়া না পেয়ে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো ময়নার। চুপচাপ বসে রইল বাবার পাশে। মনযোগ দিলো অন্য কাজে। ভাব দেখালো যেনো এদিকের কোনো কথাতেই তার কান নেই।
- কী কইবা তোতা মিয়া, খালি পরকিয়া আর খুন না, আমরার দেশটা অহন নানা অপরাধে ভইরা যাইতাছে। ‘সামাজিক মূল্যবোধ’ কইতে (বলতে) একটা কতা আছে। হেই মূল্যবোধ কইম্মা যাইতাছে। কইম্যা যাইতাছে মানুষের নীতি-নৈতিকতা।
- হ, বাইছা (ভাই সাহেব)। তুমি উচিত কতা কইছঅ। আমরার সমাজ কিমুন জানি বদলাইয়া যাইতাছে। সবচে আপন বন্ধনগুলাও অহন ভাইঙ্গা চুরমার অইয়া যাইতাছে।
- বাতাস লাগছে বাতাস। একটা কতা কই হুনঅ, তুমি যুদি কোনো জাতিরে ধ্বংস করতা চাও, পইলা (প্রথমে) হেই জাতির সংস্কৃতি আর মূল্যবোধগুলা ধ্বংস কর। হেরপরে দেখবা আপনা-আপনি হেই জাতি এক অমোঘ নেশায় বুঁদ অইয়া যাইব। মেরুদণ্ড খাড়া কইরা দুইডা কতাও কইতে পারবনা।
- আমরারেও এমুন নেশার বাতাসে পাইছে নাকি?
- লক্ষণ খারাপ। জিরজিরায়া (ঝির ঝির করে) আজইরা (অশুভ) বাতাস ঘিইরা ধরতাছে আমরারে। আমরা ঠ্যাঙ্গের উপরে ঠ্যাঙ্গ তুইল্লা ঝিমাইতাছি। আমরার সরকারের তঅ এইদিকে কোন মনযোগঅই নাই। হেরা অহন ব্যস্ত নানান আজাইরা কামে। আর হেই সুযোগে খুন, রাহাজানি, ডাকাইতি, পরকিয়ায় ভইরা যাইতাছে দেশ। আর মানুষের কাছেও এউগুলা গা সওয়া অইয়া গেছে।
- হঅ, আজাইরা কামে মানুষের টেহা (টাকা) খরচ করতাছে। আমরার চিন্তাভাবনা থেইকা নীতি-টিতি একবারে উইট্টা গেছেগা দেহি!
-নীতিটিতির কতা আর কী কও তুমি! হেদিন পত্রিকার মইদ্যে দেকলাম গত এক মাসে সারা দেশে খুনঅই অইছে ২৮০ জন! অইন্য কতা নাঅয় বাদ অই দিলাম।
- পাবলিক এক্কেবারে ত্যক্ত বিরক্ত অইয়া গেছেগা। হুনলাম আওমী লীগের (আওয়ামী লীগের) এক নেতাও নাকি ত্যক্ত-বিরক্ত অইয়া কইছে যে দেশ বিপদের দিকে আউ¹াইতাছে?
- হ, তুমি ঠিকঅই হুনছঅ। কতা তঅ হাছা। পুরা তাইজ্জব কাণ্ডকারখানা শুরু অইয়া গেছে। প্রধান বিচারপতির মুখ দিয়া পর্যন্ত বাইরঅইছে যে, দেশঅ অহন ন্যায্য কতাডা পর্যন্ত কওনের স্বাধীনতা নাই।
এতক্ষণে ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠলো ময়না। ভেবেছিলো কান খাড়া রাখলে হয়তো তানহা হত্যার রহস্য কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারবে সে। কিন্তু বাবা আর মন্তাজ চাচার কথাগুলো এমন দিকে মোড় নিয়েছে, যা ওর বোঝার কথা নয়। কিন্তু তবুও যে বোঝার চেষ্টা করে নি এমনটি নয়। আর চেষ্টা করলে কিছুনা কিছু তো সফল হওয়াই যায়।
- আহা, কী ফুটফুটে চেহারা রে। বলতে বলতে পত্রিকাটা তোতা মিয়ার দিকে এগিয়ে দিল মন্তাজ উদ্দিন। ময়নারও কৌতুহল হলো তিন বছরের তানহাকে দেখতে। উঁকি দিলো পত্রিকার পাতায়। ইস, ডাগর চোখের কী মায়াবি চাহনি! ফোঁকলা দাঁত। কপালে কাজলের টিপ। মেয়েটাকে আদর করে এ টিপ কে পড়িয়ে দিয়েছিলো? ‘আয় আয় চাঁদ মামা/টিপ দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ/টিপ দিয়ে যা...’ ছড়া কাটতে কাটতে মায়েরাইতো এ কাজটি করে থাকে। তানহার ক্ষেত্রেও নিশ্চয়-ই এর ব্যতিক্রম হয়নি। হয়তো ছড়ার ছন্দে ছন্দে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওকে কাজল কালো করেছিলো মা-ই। তারপর চুমুতে চুমুতে কপাল ভরিয়ে ভনিতা করে বলেছিলো, এইতো আমার চাঁদের (তানহার) কপালে চাঁদ এসে টিপ দিয়ে গেলো। হ্যা, তখন তো মায়ের কাছে চাঁদের মতোই ছিলো তানহা। অমাবশ্যার অন্ধকার দূর করে মায়ের কোল জুড়ে সে এসেছিলো পূর্ণিমার চাঁদ হয়েই। দ্যুতি ছড়িয়েছিলো মায়ের মনে। সত্যিই কি তাই? এমনটিই তো হওয়ার কথা। ময়নার দেখা সব মায়েরাইতো এমন । মায়ের উষ্ণতাই সন্তানের প্রথম আশ্রয়। মাকে ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারে না ময়না। কিন্তু কী এমন ঘটনা ঘটল যে, তিন বছরের ছোট্ট শিশুর মৃত্যু হলো নিজের মায়ের কারণে! অপরাধটা ছিলো কার, শিশুর নাকি ওর মায়ের? অপরাধ যার-ই হোক। কী কারণে একজন মা নিজের কোল থেকে পূর্ণিমার চাঁদ দূরে ঠেলে দিতে চাইবে? কোন অমোঘ টানে? তাহলে কি এখন মায়েরাও বদলে যাচ্ছে। সন্তানরা কি এখন মায়ের কোলেও নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারবে না!
- ও পুতু (চাচা) পুতুগো, তানহা কি মা’রে (মাকে) ত্যক্ত (বিরক্ত) করতঅ?
- নাহ্। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক কথায় জবাব দিলো মন্তাজ উদ্দিন। কিন্তু মন্তাজ চাচার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারটা মোটেই আঁচ করতে পারলো না ময়না।
- তে (তাহলে) ছেরিডা কী দুষ করছিন (করেছিলো) যে একবারে মাইরালান লাগব (মেরে ফেলতে হবে)!
- এই ছেরি চুপ র্ক। মুরুব্বিরার কতার মইদ্যে কতা কওঅন (বলা) বালানা। ধমকে উঠল তোতা মিয়া।
বাবার ধমকে একেবারে চুপসে গেলো সে। আর কথা বলার সাহস হলোনা। তারপরও ক্ষীণ একটি আশা ধরে রেখেছিলো যে, অন্তত: ভদ্রতার জন্য হলেও মন্তাজ চাচা বুঝি তার কৌতুহল নিবৃত্ত করবে। কিন্তু ওদিক থেকেও কোন সাড়া না পেয়ে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো ময়নার। চুপচাপ বসে রইল বাবার পাশে। মনযোগ দিলো অন্য কাজে। ভাব দেখালো যেনো এদিকের কোনো কথাতেই তার কান নেই।
- কী কইবা তোতা মিয়া, খালি পরকিয়া আর খুন না, আমরার দেশটা অহন নানা অপরাধে ভইরা যাইতাছে। ‘সামাজিক মূল্যবোধ’ কইতে (বলতে) একটা কতা আছে। হেই মূল্যবোধ কইম্মা যাইতাছে। কইম্যা যাইতাছে মানুষের নীতি-নৈতিকতা।
- হ, বাইছা (ভাই সাহেব)। তুমি উচিত কতা কইছঅ। আমরার সমাজ কিমুন জানি বদলাইয়া যাইতাছে। সবচে আপন বন্ধনগুলাও অহন ভাইঙ্গা চুরমার অইয়া যাইতাছে।
- বাতাস লাগছে বাতাস। একটা কতা কই হুনঅ, তুমি যুদি কোনো জাতিরে ধ্বংস করতা চাও, পইলা (প্রথমে) হেই জাতির সংস্কৃতি আর মূল্যবোধগুলা ধ্বংস কর। হেরপরে দেখবা আপনা-আপনি হেই জাতি এক অমোঘ নেশায় বুঁদ অইয়া যাইব। মেরুদণ্ড খাড়া কইরা দুইডা কতাও কইতে পারবনা।
- আমরারেও এমুন নেশার বাতাসে পাইছে নাকি?
- লক্ষণ খারাপ। জিরজিরায়া (ঝির ঝির করে) আজইরা (অশুভ) বাতাস ঘিইরা ধরতাছে আমরারে। আমরা ঠ্যাঙ্গের উপরে ঠ্যাঙ্গ তুইল্লা ঝিমাইতাছি। আমরার সরকারের তঅ এইদিকে কোন মনযোগঅই নাই। হেরা অহন ব্যস্ত নানান আজাইরা কামে। আর হেই সুযোগে খুন, রাহাজানি, ডাকাইতি, পরকিয়ায় ভইরা যাইতাছে দেশ। আর মানুষের কাছেও এউগুলা গা সওয়া অইয়া গেছে।
- হঅ, আজাইরা কামে মানুষের টেহা (টাকা) খরচ করতাছে। আমরার চিন্তাভাবনা থেইকা নীতি-টিতি একবারে উইট্টা গেছেগা দেহি!
-নীতিটিতির কতা আর কী কও তুমি! হেদিন পত্রিকার মইদ্যে দেকলাম গত এক মাসে সারা দেশে খুনঅই অইছে ২৮০ জন! অইন্য কতা নাঅয় বাদ অই দিলাম।
- পাবলিক এক্কেবারে ত্যক্ত বিরক্ত অইয়া গেছেগা। হুনলাম আওমী লীগের (আওয়ামী লীগের) এক নেতাও নাকি ত্যক্ত-বিরক্ত অইয়া কইছে যে দেশ বিপদের দিকে আউ¹াইতাছে?
- হ, তুমি ঠিকঅই হুনছঅ। কতা তঅ হাছা। পুরা তাইজ্জব কাণ্ডকারখানা শুরু অইয়া গেছে। প্রধান বিচারপতির মুখ দিয়া পর্যন্ত বাইরঅইছে যে, দেশঅ অহন ন্যায্য কতাডা পর্যন্ত কওনের স্বাধীনতা নাই।
এতক্ষণে ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠলো ময়না। ভেবেছিলো কান খাড়া রাখলে হয়তো তানহা হত্যার রহস্য কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারবে সে। কিন্তু বাবা আর মন্তাজ চাচার কথাগুলো এমন দিকে মোড় নিয়েছে, যা ওর বোঝার কথা নয়। কিন্তু তবুও যে বোঝার চেষ্টা করে নি এমনটি নয়। আর চেষ্টা করলে কিছুনা কিছু তো সফল হওয়াই যায়।
রবিবার, আগস্ট ০১, ২০১০
জামাই আইছে আনন্দে
আজ ময়নার মেয়ের বিয়ে। আয়োজন নিয়ে মহা ব্যস্ত সে। এক মুহূর্ত অবসর নেই। মেয়েটাকে কিনে এনেছিল বৈশাখী মেলা থেকে। সেই থেকে ওর সংসারেরই সদস্য সে। নিজের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছে গয়না। তারপর চিকচিকে জরির একটি গয়না পরিয়েও দিয়েছিল গলায়। কিন্তু সেটা যে কবে উধাও হয়ে গেল, তা বলতেই পারছে না ময়না। এমনকি মেয়েটাও মুখ ফুটে বলছে না যে কেউ গলা থেকে খুলে নিয়েছে, নাকি খেয়ালের বশে নিজেই হারিয়ে ফেলেছে। না না, গয়না কথা বলতে পারে না এমনটি নয়। প্রতিদিনই ময়নার সাথে কত্ত কথা হয়। অবশ্য শব্দ করে কিছুই বলতে পারে না সে। শত হলেও পুতুল তো! তাই ওর মনের ভাষা বুঝে নিতে হয় ময়নাকেই। এর জন্য কোনো দুঃখ নেই ময়নার। কারণ সে জানে পুতুলরা কখনো কথা বলতে পারে না। তবে মায়ের কাছে তাদের থাকে হাজারো আবদার। এই যেমন খাইয়ে দাও, পরিয়ে দাও, আদর করো, ঘুম পাড়িয়ে দাও। এসবের কোনো কাজই বাকি রাখে না ময়না। একেবারে খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম পাড়ানো পর্যন্ত সবকিছু সে-ই দেখাশোনা করে।
এমন আদুরে মেয়েকে বিয়ে দিতে কিছু তো খারাপ লাগছেই ময়নার। খারাপ লাগলেই আর কী? মেয়ে যেহেতু আছে আজ নয় কাল বিয়ে তো দিতেই হবে। তবে এত বিচ্ছেদ-বিরহের মাঝেও বেশ আনন্দই হচ্ছে ওর। কারণ পাত্র হিসেবে পারভিনের ছেলেটা একেবারে রাজপুত্র। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো পারভিনের সাথে একটা সম্বন্ধ তৈরি হোক, এমনটাই চাইছিল সে। হঠাৎ সে দিন বলা নেই, কওয়া নেই পারভিনই প্রস্তাব করে বসল ময়নার সাথে সই পাতবে। আর যায় কোথায়, দু’জনে মিলে ঠিক করল দিনক্ষণ। আরো ঠিক করল এই দিনেই হবে ওদের পুতুল বিয়ে। এতে নিজেদের মাঝে সম্পর্কটা আরো গাঢ় হবে। ব্যস, যেই কথা সেই কাজ।
আজ সেই কাক্সিত দিন। মহা ধুমধামে চলছে আয়োজন। ময়নার সখীরা সবাই উপস্থিত। উপস্থিত এক দঙ্গল ছেলেমেয়েও। বাঁশের কঞ্চি আর পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্যান্ডেল। একে ঘিরেই সবার ব্যস্ততা। এই বাটনা বাটরে, কুটনা কুটরে...। একটু বড়সড় টোপায় (খেলনা পাতিলে) ভাত চড়িয়েছে ময়না। টোপার ভেতরে যে ভাতের বদলে বালি ভর্তি, এ খবর কারো অজানা নয়। কিন্তু তবুও সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে কখন রান্না শেষ হবে, তারপর বর আসবে। আর ক্বল-অ, ক্বল-অ ধরনের অদ্ভুত শব্দ করে খাওয়ার ভান করবে সবাই। সেই সাথে হবে ময়না-পারভিনের সই পাতাপাতি। দু’জনের মাঝে তৈরি হবে নতুন একটি সম্পর্ক। প্রতিজ্ঞা করবে পরস্পরের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্নার অংশীদার হওয়ার। বন্ধুত্ব গড়ার সেই আনুষ্ঠানিক মুহূর্তটিকে ত্বরান্বিত করতেই এত ব্যস্ততা। আশপাশের ঝোপে বাজার করছে কয়েকজন। এরই মাঝে কাল্পনিক নানা কেনাকাটা করে ফিরেও এসেছে দুলাল। ওর ঝুলি ভর্তি ইটের সুড়কির মাংস, পাতার মাছ আর নানা ধরনের তরকারি। মেলা থেকে কিনে আনা টিনের বঁটি দিয়ে তরকারি কাটায় ব্যস্ত হয়ে গেল একজন। তারপর চুলায় ফুঁ দাওরে, আগুন জ্বালরে...। অবশেষে রান্নাবান্না শেষ হলো ময়নাদের। এরই মাঝে খবর এলো বরযাত্রা শুরু গেছে। এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠল সবার চোখ। এবার ওরা ব্যস্ত হয়ে উঠল গয়নাকে নিয়ে। ইস্ লাল টুকটুকে শাড়ি পরে আছে ও। একদম চুপ মেরে বসে আছে। ময়নাও দৃষ্টি ঘুরালো ওর দিকে। ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
এমন আদুরে মেয়েকে বিয়ে দিতে কিছু তো খারাপ লাগছেই ময়নার। খারাপ লাগলেই আর কী? মেয়ে যেহেতু আছে আজ নয় কাল বিয়ে তো দিতেই হবে। তবে এত বিচ্ছেদ-বিরহের মাঝেও বেশ আনন্দই হচ্ছে ওর। কারণ পাত্র হিসেবে পারভিনের ছেলেটা একেবারে রাজপুত্র। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো পারভিনের সাথে একটা সম্বন্ধ তৈরি হোক, এমনটাই চাইছিল সে। হঠাৎ সে দিন বলা নেই, কওয়া নেই পারভিনই প্রস্তাব করে বসল ময়নার সাথে সই পাতবে। আর যায় কোথায়, দু’জনে মিলে ঠিক করল দিনক্ষণ। আরো ঠিক করল এই দিনেই হবে ওদের পুতুল বিয়ে। এতে নিজেদের মাঝে সম্পর্কটা আরো গাঢ় হবে। ব্যস, যেই কথা সেই কাজ।
আজ সেই কাক্সিত দিন। মহা ধুমধামে চলছে আয়োজন। ময়নার সখীরা সবাই উপস্থিত। উপস্থিত এক দঙ্গল ছেলেমেয়েও। বাঁশের কঞ্চি আর পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্যান্ডেল। একে ঘিরেই সবার ব্যস্ততা। এই বাটনা বাটরে, কুটনা কুটরে...। একটু বড়সড় টোপায় (খেলনা পাতিলে) ভাত চড়িয়েছে ময়না। টোপার ভেতরে যে ভাতের বদলে বালি ভর্তি, এ খবর কারো অজানা নয়। কিন্তু তবুও সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে কখন রান্না শেষ হবে, তারপর বর আসবে। আর ক্বল-অ, ক্বল-অ ধরনের অদ্ভুত শব্দ করে খাওয়ার ভান করবে সবাই। সেই সাথে হবে ময়না-পারভিনের সই পাতাপাতি। দু’জনের মাঝে তৈরি হবে নতুন একটি সম্পর্ক। প্রতিজ্ঞা করবে পরস্পরের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্নার অংশীদার হওয়ার। বন্ধুত্ব গড়ার সেই আনুষ্ঠানিক মুহূর্তটিকে ত্বরান্বিত করতেই এত ব্যস্ততা। আশপাশের ঝোপে বাজার করছে কয়েকজন। এরই মাঝে কাল্পনিক নানা কেনাকাটা করে ফিরেও এসেছে দুলাল। ওর ঝুলি ভর্তি ইটের সুড়কির মাংস, পাতার মাছ আর নানা ধরনের তরকারি। মেলা থেকে কিনে আনা টিনের বঁটি দিয়ে তরকারি কাটায় ব্যস্ত হয়ে গেল একজন। তারপর চুলায় ফুঁ দাওরে, আগুন জ্বালরে...। অবশেষে রান্নাবান্না শেষ হলো ময়নাদের। এরই মাঝে খবর এলো বরযাত্রা শুরু গেছে। এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠল সবার চোখ। এবার ওরা ব্যস্ত হয়ে উঠল গয়নাকে নিয়ে। ইস্ লাল টুকটুকে শাড়ি পরে আছে ও। একদম চুপ মেরে বসে আছে। ময়নাও দৃষ্টি ঘুরালো ওর দিকে। ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
এলোমেলো বাদ্যের শব্দে কানে তালা লাগার মতো অবস্থা। বরযাত্রীদের মাঝে বেশ কয়েকটি ছেলের গলায় ঝুলানো রয়েছে ঢোল। কোরবানির গরুর পর্দা ভাঙা কলসের মুখে সেঁটে প্রতি বছরই ওরা এগুলো তৈরি করে। তারপর যখন ইচ্ছা তখন বাজায়। আজ কচুর ডাঁটা দিয়ে এমনভাবে বাজাচ্ছে যেন ঢোল এবং কানের পর্দা ফাটিয়েই ছাড়বে। কাছাকাছি চলে আসতেই পারভিনের ছেলেটাকে দেখতে পেল ময়না। ইস্ কি সাজে সেজেছে ও! রাজপুত্র যে একেবারে রাজপুত্রের মতোই। মাথায় টোপর, গলায় পুঁথির মালা। আসছে ঘোড়ায় চড়ে। আর ঘোড়াটা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বিয়ারিংয়ের গাড়িতে। সবাই বিপুল উৎসাহে টেনে নিয়ে আসছে গাড়িটাকে। কনে পক্ষের তৈরি পাট শোলার তোরণের সামনে এসে থামতেই হলো ওদের। তারপর দরকষাকষি। অবশেষে কাঁঠালপাতার টাকা বিনিময়ের মাধ্যমে সমঝোতা।
তোরণ উন্মুক্ত করে দাঁড়ালো ময়নারা। রাজপুত্রের মতো বর প্রবেশ করল পাতার ছাউনিতে। কোরাস তুলল এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে ‘চম্পা ফুলের গন্ধে/জামাই আইছে আনন্দে/চম্পা ফুলের সুবাসে/জামাই আইছে আহাসে...’রবিবার, জুলাই ২৫, ২০১০
আলী আক্কাসের অবস্থা ভালো নয়
আলী আক্কাস একজন রিকশা চালক। গ্রামগঞ্জে নয়, একেবারে রাজধানীর অলি-গলি চষে বেড়ায় তার বাহন। দুইদিন হলো বাড়িতে এসেছে সে। এখন আড্ডা মারছে তোতা মিয়ার দোকানের সামনে। হাতে প্রায় শেষ হয়ে আসা একটি বিড়ি। মুখ থেকে গল গল করে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে ধোঁয়ার গুলতি। যথেস্ট মনযোগ দিয়ে টানছে। কারণ শেষের দিকে যে কোন সময় আগুন খসে পড়তে পারে। আর শেষ টান মানে সুখ টান। সতর্ক আলী আক্কাস সুখ টান থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাত্র নয়। অবশ্য আরও অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হতে চায়না সে, তবুও হতে হয়। এই যেমন তিনবেলা খেয়ে-পরে থাকতে পারা আর রোগ বালাইয়ে ঠিক-ঠাকমতো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রাখে সে। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে এসব মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে হয় তাকে, আর বাকিগুলো নাহয় বাদ-ই থাকলো। কেবল বিড়ির উপরই তার যত অধিকার খাটে, অন্য কোথাও নয়। অবশ্য ধোঁয়ার একেকটি গুলতির সাথে যে একটু একটু করে জীবনীশক্তিও বাতাসে ভেসে যাচ্ছে-এ তথ্যও তার অজানা নয়। সেই ছোটবেলায় শুনেছিলো ‘আই এম এ ডিস্কু ড্যান্সার/বিড়ি খাইলে হয় ক্যান্সার’। বিড়ি খেলে ক্যান্সার হয় এটা শুনতে শুনতেই বিড়ির প্রতি আগ্রহ জন্মে। আর তখন থেকেই শুরু, এখন পর্যন্ত ছাড়তে পারেনি। কোনো দিন পারবে কি না জানা নেই।
- কীগো আলী আক্কাস, এমুন চুপচাপ বইয়া রইছ কেরে? ডাহার (ঢাকার) কিছু খবর-টবর হুনাও আমরারে। দেশের অবস্তা (পরিস্থিতি) কবে বালা অইব?
তোতা মিয়ার কথার জবাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু কাশির দমকে ভেতরেই আটকে থাকলো কথা। খুক্ খুক্ করে নয়, কাশির শব্দটা হলো খন্ খন্ ধরনের, একেবারে খনখনে বুড়োদের মতো। অথচ তার বয়স খুব হলে চল্লিশ কী বিয়াল্লিশ হবে।
- আরে, আরে থাউক। দেশের অবস্তা কউন লাগদনা। তোমার নিজের অবস্তাই দেহি বালা না। বিড়ি খাইতে খাইতে শইলডারে আঙরা বানায়া দিছ।
প্রচন্ড শ্বাসকষ্টের মাঝেও না হেসে পারলনা আলী আক্কাস। খা.....ক্ করে একদলা কফ নিক্ষেপ করল দূরে। কথা বলার আগে ছুঁড়ে ফেললো বিড়ির শেষ অংশটুকু।
- দেশের অবস্তাও আমার মতোই। আমি যেমুন কবে বিড়ি খাওয়া ছারতারাম (ছাড়তে পারব) জানিনা। আমরার দেশের অবস্তাও কবে বালা অইব জানি না।
- এইডা হিবার কিমুন ঢঙের কতা হুনাইলা?
- ঢঙের কতা না গো ঢঙের কতা না। ডাহা শহর অইল বাংলাদেশের রাজধানী। অইহানে বইয়া থাইক্কা পুরা দেশের ছবি দেহুন যায়। দেশের অবস্তা অহন বালা না। মানুষে মানুষে ভাগ অইয়া যাইতাছে। মানুষের পইসা খরচ অইতাছে নানান আজাইরা কামে। আর এইসব কামের ভোগান্তিও যাইতাছে মানুষের ওপরে দিয়াই।
- হঅ, সব কিছু কিমুন জানি আউলা-ঝাউলা (এলোমেলো) অইয়া যাইতাছে। সায় দিলো তোতা মিয়া।
- আউলা-ঝাউলার কতা আরঅ কও তুমি! নিজের মতঅ চলন-ফিরনেরও অহন স্বাধীনতা নাই। তোমার মুহঅ দাড়ি থাকলে পুলিশে তোমার দিকে বেকা অইয়া চাইবঅ। মাথার মইদ্যে টুপি থাকলে মাথা নুয়াইয়া চলুন লাগবঅ!
- হঅ, এইডা কইছঅ ঠিক কতা। পুরা আসায্য (আশ্চর্য) কারবার শুরু অইয়া গেছে। খালি তোমরার ডাহা শহরঅই না, আমরার গাঁও গেরামের মাইদ্যেও এইরহম অইতাছে। শান্তি কি পুরাপুরি আরায়া (হারিয়ে) যাইবগা নাকি?
- শান্তির আশা আর কইর না। শান্তির মা মইরা গেছে। দেশঅ অহন মানুষ গুম অইয়া যাইতাছে, খুন অইতাছে, আর জিনিসপত্রের দামতঅ বারছেই।
- দিন যাইতাছে আর আমরা দেহি অনিরাপদ আর কঠিন জীবনের দিকে আউ¹াইতাছি (এগিয়ে যাচ্ছি)! দীর্ঘশ্বাস ফেলল তোতা মিয়া।
- আমি কি আর সাধে কইলাম যে, দেশের অবস্তা আমার মতই!
নিজেকে নিয়ে আলী আক্কাসের হেয়ালি শুনে গলা ছেড়ে হেসে উঠল তোতা মিয়া। হাসল এতক্ষন চুপচাপ বসে থাকা ময়নাও। দেশের অবস্থা কেমন তা ওর বোঝার কথা নয়। তবে আলী আক্কাসের অবস্থা যে খুব একটা ভালো নয়, এটা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে ময়না।
২৫ জুলাই ২০১০
- কীগো আলী আক্কাস, এমুন চুপচাপ বইয়া রইছ কেরে? ডাহার (ঢাকার) কিছু খবর-টবর হুনাও আমরারে। দেশের অবস্তা (পরিস্থিতি) কবে বালা অইব?
তোতা মিয়ার কথার জবাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু কাশির দমকে ভেতরেই আটকে থাকলো কথা। খুক্ খুক্ করে নয়, কাশির শব্দটা হলো খন্ খন্ ধরনের, একেবারে খনখনে বুড়োদের মতো। অথচ তার বয়স খুব হলে চল্লিশ কী বিয়াল্লিশ হবে।
- আরে, আরে থাউক। দেশের অবস্তা কউন লাগদনা। তোমার নিজের অবস্তাই দেহি বালা না। বিড়ি খাইতে খাইতে শইলডারে আঙরা বানায়া দিছ।
প্রচন্ড শ্বাসকষ্টের মাঝেও না হেসে পারলনা আলী আক্কাস। খা.....ক্ করে একদলা কফ নিক্ষেপ করল দূরে। কথা বলার আগে ছুঁড়ে ফেললো বিড়ির শেষ অংশটুকু।
- দেশের অবস্তাও আমার মতোই। আমি যেমুন কবে বিড়ি খাওয়া ছারতারাম (ছাড়তে পারব) জানিনা। আমরার দেশের অবস্তাও কবে বালা অইব জানি না।
- এইডা হিবার কিমুন ঢঙের কতা হুনাইলা?
- ঢঙের কতা না গো ঢঙের কতা না। ডাহা শহর অইল বাংলাদেশের রাজধানী। অইহানে বইয়া থাইক্কা পুরা দেশের ছবি দেহুন যায়। দেশের অবস্তা অহন বালা না। মানুষে মানুষে ভাগ অইয়া যাইতাছে। মানুষের পইসা খরচ অইতাছে নানান আজাইরা কামে। আর এইসব কামের ভোগান্তিও যাইতাছে মানুষের ওপরে দিয়াই।
- হঅ, সব কিছু কিমুন জানি আউলা-ঝাউলা (এলোমেলো) অইয়া যাইতাছে। সায় দিলো তোতা মিয়া।
- আউলা-ঝাউলার কতা আরঅ কও তুমি! নিজের মতঅ চলন-ফিরনেরও অহন স্বাধীনতা নাই। তোমার মুহঅ দাড়ি থাকলে পুলিশে তোমার দিকে বেকা অইয়া চাইবঅ। মাথার মইদ্যে টুপি থাকলে মাথা নুয়াইয়া চলুন লাগবঅ!
- হঅ, এইডা কইছঅ ঠিক কতা। পুরা আসায্য (আশ্চর্য) কারবার শুরু অইয়া গেছে। খালি তোমরার ডাহা শহরঅই না, আমরার গাঁও গেরামের মাইদ্যেও এইরহম অইতাছে। শান্তি কি পুরাপুরি আরায়া (হারিয়ে) যাইবগা নাকি?
- শান্তির আশা আর কইর না। শান্তির মা মইরা গেছে। দেশঅ অহন মানুষ গুম অইয়া যাইতাছে, খুন অইতাছে, আর জিনিসপত্রের দামতঅ বারছেই।
- দিন যাইতাছে আর আমরা দেহি অনিরাপদ আর কঠিন জীবনের দিকে আউ¹াইতাছি (এগিয়ে যাচ্ছি)! দীর্ঘশ্বাস ফেলল তোতা মিয়া।
- আমি কি আর সাধে কইলাম যে, দেশের অবস্তা আমার মতই!
নিজেকে নিয়ে আলী আক্কাসের হেয়ালি শুনে গলা ছেড়ে হেসে উঠল তোতা মিয়া। হাসল এতক্ষন চুপচাপ বসে থাকা ময়নাও। দেশের অবস্থা কেমন তা ওর বোঝার কথা নয়। তবে আলী আক্কাসের অবস্থা যে খুব একটা ভালো নয়, এটা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে ময়না।
২৫ জুলাই ২০১০
শনিবার, জুলাই ২৪, ২০১০
বর্ষাযাপন!

বলুন তো আজ শ্রাবণের কততম দিন? পারছেন না তাইতো? আজকের নয়া দিগন্ত দেখুন, উত্তর পেয়ে যাবেনবর্ষা তো শেষ হতে চলল, বর্ষাযাপন করেছেন? করেননি! ক্যামনে করবেন? ‘ব্যস্ততা মোরে দেয় না অবসর’।
প্রিয় পাঠক, আপনার বর্ষাযাপন’র দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাপ্তাহিক প্রকাশনা অবকাশ ও থেরাপি। এই দুটি ম্যাগাজিনের সকল লেখক ও আগ্রহী পাঠকদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে বর্ষাযাপনের। বলুনতো কোথায়? কোথায় আবার! কিশোরগঞ্জের দিগন্ত বিস্তৃত হাওরে!
চারিদিকে অথৈ পানি। মাঝখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ওখানেই বড়শি ফেলে বোয়াল মাছ ধরার চেষ্টা করছেন আপনি। ভাবুন তো দৃশ্যটি! হ্যা, সত্যিই এ সুযোগ হবে বর্ষাযাপন এ। আরো থাকবে দিনভর হৈ-চৈ, জলকেলি, বিনোদন কত কিছু!
তাহলে যাচ্ছেন তো বর্ষাযাপন করতে? যেতে চাইলে নাম রেজিষ্ট্রশন করুন ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে। যাচ্ছি কবে? ৫ আগষ্ট রাতে। ঢাকায় ফিরব ৭ আগষ্ট সকালে।
যোগাযোগ- ০১৭১১১১৫১৬৫
প্রিয় পাঠক, আপনার বর্ষাযাপন’র দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাপ্তাহিক প্রকাশনা অবকাশ ও থেরাপি। এই দুটি ম্যাগাজিনের সকল লেখক ও আগ্রহী পাঠকদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে বর্ষাযাপনের। বলুনতো কোথায়? কোথায় আবার! কিশোরগঞ্জের দিগন্ত বিস্তৃত হাওরে!
চারিদিকে অথৈ পানি। মাঝখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ওখানেই বড়শি ফেলে বোয়াল মাছ ধরার চেষ্টা করছেন আপনি। ভাবুন তো দৃশ্যটি! হ্যা, সত্যিই এ সুযোগ হবে বর্ষাযাপন এ। আরো থাকবে দিনভর হৈ-চৈ, জলকেলি, বিনোদন কত কিছু!
তাহলে যাচ্ছেন তো বর্ষাযাপন করতে? যেতে চাইলে নাম রেজিষ্ট্রশন করুন ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে। যাচ্ছি কবে? ৫ আগষ্ট রাতে। ঢাকায় ফিরব ৭ আগষ্ট সকালে।
যোগাযোগ- ০১৭১১১১৫১৬৫
রবিবার, জুলাই ১৮, ২০১০
মন্তাজ চাচার কথাই ঠিক
দক্ষিণ দিক থেকে সরু ঢেউ অলস খেলতে খেলতে ভীরছে ঘায়েলে (ভাঙন থেকে বসতভিটা রক্ষার জন্য কচুরিপানা আর খড়ের স্তর)। মৃদু বাতাসের ঠেলায় ঘায়েল ঘেষে কোণঠাসা হয়ে আছে কচুরিপানা, শ্যাওলা-ঝাউলা। এমনভাবে স্থির হয়ে আছে যেন পানির উপর তৈরি করেছে সবুজাভ সর। এ সবুজ সরকেই কেটে কোটে ঠেলা জাল ঠেলছে সবুজ। আর ডাঙায় ডোলা হাতে দাঁড়িয়ে ময়না। সবুজের একেকটি খেউয়ে জাল ভর্তি হয়ে উঠছে শ্যাওলা আর শ্যাওলা। তারপর এগুলো ঝেড়ে ফেলে চিংড়ির খনি আবিষ্কার করার দায়িত্ব ময়নার উপরই। শ্যাওলার ভাঁজ খুলে খুলে একটা-দুটো চিংড়ি ডোলায় ভরতে ভরতেই জালের টোনায় ঝিলিক দিয়ে উঠে ছিট পারতে থাকা এদলা চিংড়ি। এতক্ষনে ডোলা প্রায় অর্ধেক হয়ে এসেছে। আর কয়েকটি খেউ দিয়েই আজকের মতো ক্ষান্ত হবে, ভাবছিলো সবুজ। কিন্তু উঠাৎ উদয় হওয়া কোষা নৌকাটিই ঘটালো যতো বিপত্তি। বলা নেই কওয়া নেই, নি:শব্দে ভেসে এসেছে ঠিক সবুজের পাশেই। পানিতে বৈঠা ফেলার শব্দটি পর্যন্ত তার কানে আসেনি। চরম বিরক্ত হয়েই তাকালো কোষার মাঝির দিকে। তারপর ভ্যাবাচেকা খেলো। মাথা নুইয়ে নিলো সসম্মানে, বৈঠা হাতে বসে আছে স্বয়ং মন্তাজ উদ্দিন!
- কি সবুজ মিয়া, পড়ালেহা থুইয়া দেহি জাল ঠেলায় মনযোগ দিছস! কিশোরগঞ্জেত্তে কবে আইলি?
- পরশুদিন আইছি পুতু (চাচা)
- কলেজ বন্ধ নাকি?
- না বন্ধ না। এইচএসসি পরীক্ষার রিজাল্ট দিছে ত-অ, এর লাইগ্যা কয়দিন ডিলাডালা কাস অইতাছে।
- তরার কলেজের রিজাল্ট কিমুন অইছে?
- বালাই। জিপিএ পাঁচ পাইছে আঠারজন। দুইডা ছেরা খালি ফেইল করছে।
জাল ঠেলা বন্ধ হয়ে গেলো বলে উদ্দম্যে ভাটা পরেছে ময়নার। খানিকটা বিরক্ত হয়ে তাকালো মন্তাজ চাচার দিকে। কিন্তু তার বিরক্তিতে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই দেখে আশাহত হলো সে। এমনিতেই বার বার ডাঙায় উঠে যেতে চাচ্ছিলো সবুজ ভাই, এখনতো আর কথাই নেই। যা ধারণা করেছিলো ঠিক তাই। পরিষ্কার পানিতে এপাশ-ওপাশ করে জাল ধুয়ে নিতে দেখলো সে। অর্থাৎ আজকের মতো মাছ ধরা এখানেই সমাপ্ত। বাধ্য হয়ে কাঠখোট্টা আলাপচারিতায় মনযোগ দিলো ময়না।
- আমার ত-অ খালি ডর করতাছে পুতু। আমরার মত গরিবের বালা রিজাল্ট কইরা কোন দাম নাই।
- আরে ডরের কি আছে বেক্কল। মনযোগ দিয়া পর, বালা রিজাল্ট কর।
- কি অইব বালা রিজাল্ট কইরা। এইবার দেহ সারা দেশ-অ আটাইশ হাজার ছয়শ’ একাত্তর জন জিপিএ পাঁচ পাইছে। এরার মইদ্যে কয়জন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অইতে পারব? টেহাওয়ালারার লাইগ্যাতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছেই। কিন্তু আমরা যায়াম কই?
- কতা তুই মন্দ কইছসনা। আমরার দেশে আছে খালি যত আউলা নিয়ম। এইযে পুলাপাইনগুলা পাস কইরা বাইর অইতাছে, এরা কই ভর্তি অইব, কি পড়ব, এরার ভবিষ্যৎ কি এইসব লইয়া সরকারের বিন্দু মাত্র চিন্তা নাই।
- এর লাইগ্যাইতো মাজে মইদ্যে পড়ালেহা ছাইরা দিতে ইচ্ছা অয় পুতু।
- আরে ধুরু, তুই খালি অলক্ষির মত কতা কছ। সমস্যা অনেক থাকব, হের লাইগ্যা কি ঘরে বইয়া থাহুন লাগব! মনে রাহিস উপরে আল্লাহ আছে। বালা কইরা পড়ালেহা কর, এইসএসসিতেও জিপিএ পাঁচ পাইয়া গেরামের মুখ উজ্জ্বল কর।
কি-সব জিপিএ পাঁচ-টাচ নিয়ে যে ওরা কথা বলে, একদম ভালো লাগেনা ময়নার। জিপিএ পাঁচ, এ প্লাস এসব শব্দ প্রায়ই কানে আসে ওর, কিন্তু কোন কিছুর অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি। তার কাছে সোজা হিসাব, পাস-ফেল। অবশ্য গত এসএসসি পরীক্ষায় রেজাল্টের ব্যাপারটা ছিলো ভিন্ন। তখন সবুজ ভাই জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলো, আর সারা গ্রামের মানুষের সেকি আনন্দ! আনন্দ হয়েছিলো তারও। সেই থেকে সে বুঝে গেছে জিপিএ পাঁচ হলো ভালো ফলাফল। কিন্তু সবুজ ভাইয়ের ভাল ফলাফল সত্ত্বেও তখন ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো শাহজাহান আলী, সারা দেশে নাকি এত ছাত্র জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলো যে তাদের ভিড়ে খেটে খাওয়া সবুজ ভাইয়ের কোন স্থানই হবেনা। শাহজাহান আলী বলেছিলো লেখাপড়া নাকি পয়সা ছাড়া হয়-ইনা। কই লেখাপড়াতো বন্ধ হয়ে যায়নি তার! কিশোরগঞ্জ শহরে লজিং থেকে, টিউশনি করে ঠিকঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে সবুজ ভাই। আসলে মন্তাজ চাচার কথাই ঠিক, উপরে আল্লাহ আছে।
- কিরে ময়না, মাছ কিমুন পাইলি?
জবাবের অপেক্ষা না করেই মারছার (পাটাতনের) নিচে বৈঠাটা চালান করে দিলো মন্তাজ উদ্দিন। তারপর এক লাফে নেমে এলো ডাঙায়। আমগাছের শেকড়ের সাথে কোষাটা বেঁধে ঢোঁ মারলো ডোলার ভেতর। তারপর সবুজের সাথে কথা বলতে বলতে হাটা ধরলো গোপাট (মেঠো পথ) ধরে। ঠেলা জালটা কাঁধে তুলে পেছন পেছন এগুলো সবুজ, গা থেকে নিংড়ে ঝরছে পানি। চিংড়ির ডোলা হাতে পা বাড়ালো ময়নাও, হাওরের জলে কোণঠাসা সবুজ রঙের শ্যাওলা-ঝাউলা পেছনে রেখে এগিয়ে চললো সবুজ এবং মন্তাজ উদ্দিনকে অনুসরণ করে।
১৮ জুলাই ২০১০
- কি সবুজ মিয়া, পড়ালেহা থুইয়া দেহি জাল ঠেলায় মনযোগ দিছস! কিশোরগঞ্জেত্তে কবে আইলি?
- পরশুদিন আইছি পুতু (চাচা)
- কলেজ বন্ধ নাকি?
- না বন্ধ না। এইচএসসি পরীক্ষার রিজাল্ট দিছে ত-অ, এর লাইগ্যা কয়দিন ডিলাডালা কাস অইতাছে।
- তরার কলেজের রিজাল্ট কিমুন অইছে?
- বালাই। জিপিএ পাঁচ পাইছে আঠারজন। দুইডা ছেরা খালি ফেইল করছে।
জাল ঠেলা বন্ধ হয়ে গেলো বলে উদ্দম্যে ভাটা পরেছে ময়নার। খানিকটা বিরক্ত হয়ে তাকালো মন্তাজ চাচার দিকে। কিন্তু তার বিরক্তিতে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই দেখে আশাহত হলো সে। এমনিতেই বার বার ডাঙায় উঠে যেতে চাচ্ছিলো সবুজ ভাই, এখনতো আর কথাই নেই। যা ধারণা করেছিলো ঠিক তাই। পরিষ্কার পানিতে এপাশ-ওপাশ করে জাল ধুয়ে নিতে দেখলো সে। অর্থাৎ আজকের মতো মাছ ধরা এখানেই সমাপ্ত। বাধ্য হয়ে কাঠখোট্টা আলাপচারিতায় মনযোগ দিলো ময়না।
- আমার ত-অ খালি ডর করতাছে পুতু। আমরার মত গরিবের বালা রিজাল্ট কইরা কোন দাম নাই।
- আরে ডরের কি আছে বেক্কল। মনযোগ দিয়া পর, বালা রিজাল্ট কর।
- কি অইব বালা রিজাল্ট কইরা। এইবার দেহ সারা দেশ-অ আটাইশ হাজার ছয়শ’ একাত্তর জন জিপিএ পাঁচ পাইছে। এরার মইদ্যে কয়জন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অইতে পারব? টেহাওয়ালারার লাইগ্যাতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছেই। কিন্তু আমরা যায়াম কই?
- কতা তুই মন্দ কইছসনা। আমরার দেশে আছে খালি যত আউলা নিয়ম। এইযে পুলাপাইনগুলা পাস কইরা বাইর অইতাছে, এরা কই ভর্তি অইব, কি পড়ব, এরার ভবিষ্যৎ কি এইসব লইয়া সরকারের বিন্দু মাত্র চিন্তা নাই।
- এর লাইগ্যাইতো মাজে মইদ্যে পড়ালেহা ছাইরা দিতে ইচ্ছা অয় পুতু।
- আরে ধুরু, তুই খালি অলক্ষির মত কতা কছ। সমস্যা অনেক থাকব, হের লাইগ্যা কি ঘরে বইয়া থাহুন লাগব! মনে রাহিস উপরে আল্লাহ আছে। বালা কইরা পড়ালেহা কর, এইসএসসিতেও জিপিএ পাঁচ পাইয়া গেরামের মুখ উজ্জ্বল কর।
কি-সব জিপিএ পাঁচ-টাচ নিয়ে যে ওরা কথা বলে, একদম ভালো লাগেনা ময়নার। জিপিএ পাঁচ, এ প্লাস এসব শব্দ প্রায়ই কানে আসে ওর, কিন্তু কোন কিছুর অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি। তার কাছে সোজা হিসাব, পাস-ফেল। অবশ্য গত এসএসসি পরীক্ষায় রেজাল্টের ব্যাপারটা ছিলো ভিন্ন। তখন সবুজ ভাই জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলো, আর সারা গ্রামের মানুষের সেকি আনন্দ! আনন্দ হয়েছিলো তারও। সেই থেকে সে বুঝে গেছে জিপিএ পাঁচ হলো ভালো ফলাফল। কিন্তু সবুজ ভাইয়ের ভাল ফলাফল সত্ত্বেও তখন ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো শাহজাহান আলী, সারা দেশে নাকি এত ছাত্র জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলো যে তাদের ভিড়ে খেটে খাওয়া সবুজ ভাইয়ের কোন স্থানই হবেনা। শাহজাহান আলী বলেছিলো লেখাপড়া নাকি পয়সা ছাড়া হয়-ইনা। কই লেখাপড়াতো বন্ধ হয়ে যায়নি তার! কিশোরগঞ্জ শহরে লজিং থেকে, টিউশনি করে ঠিকঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে সবুজ ভাই। আসলে মন্তাজ চাচার কথাই ঠিক, উপরে আল্লাহ আছে।
- কিরে ময়না, মাছ কিমুন পাইলি?
জবাবের অপেক্ষা না করেই মারছার (পাটাতনের) নিচে বৈঠাটা চালান করে দিলো মন্তাজ উদ্দিন। তারপর এক লাফে নেমে এলো ডাঙায়। আমগাছের শেকড়ের সাথে কোষাটা বেঁধে ঢোঁ মারলো ডোলার ভেতর। তারপর সবুজের সাথে কথা বলতে বলতে হাটা ধরলো গোপাট (মেঠো পথ) ধরে। ঠেলা জালটা কাঁধে তুলে পেছন পেছন এগুলো সবুজ, গা থেকে নিংড়ে ঝরছে পানি। চিংড়ির ডোলা হাতে পা বাড়ালো ময়নাও, হাওরের জলে কোণঠাসা সবুজ রঙের শ্যাওলা-ঝাউলা পেছনে রেখে এগিয়ে চললো সবুজ এবং মন্তাজ উদ্দিনকে অনুসরণ করে।
শনিবার, জুলাই ১৭, ২০১০
বেশি খেলে বাড়ে মেদ
ছেলেটা একেবারে হাড়জিরজিরে। বয়স কত আর হবে পাঁচ থেকে ছয় এর মধ্যেই। গায়ে এতটুকু কাপড় নেই। পাঁজরের সবগুলো হাড় একে একে গোনে ফেলা যাবে। মাথা থেকে খাপরি আলাদা হয়ে আছে। গর্তে লুকানো চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে টর্চ লাইটের মতো। নি®প্রাণ কিন্তু খানিকটা ভয় মেশানো দৃষ্টি মন্তাজ উদ্দিনের দিকেই।
ভীষণ অবাক ছেলেটা, তাকে এভাবে ডাকছে কেনো মন্তাজ উদ্দিন! লোকটার সাথে কখনও কোন বেয়াদবি করেছে বলেতো মনে পরছেনা। পাটকাঠির মতো দেহ দোলাতে দোলাতে নি®প্রাণ এগিয়ে আসছে ছেলেটা। চেহারায় শঙ্কা। আর বিব্রততো বটেই। চড়া গলায কাছে ডেকে ছেলেটাকে ভয় পাইয়ে দেয়ায় বিব্রত মন্তাজউদ্দিনও। তাই হয়তো অভয় দেয়ার জন্য বেঞ্চি থেকে পা নামিয়ে কিছুটা নরম স্বরে বললো
- ডরের কিছু নাই। কাছে আয়
তারপর দুই কাপ চা আর একটি বিস্কিট দিতে বললো তোতা মিয়াকে। কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারলনা আপদমস্তক উলঙ্গ ছেলেটা। কোন ধমক-টমক শুনবে এমন শঙ্কায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষন পরই ঘটলো অস্বাভাবিক ঘটনাটাা। তোতামিয়ার বানানো দুই কাপ চায়ের একটি তার দিকে আসতে দেখে ছিটকে পরলো খানিকটা দূরে। যেন শাস্তি দেয়ার জন্যই গরম পানির লিকার ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে তাকে।
- আরে বেক্কল, চা ধর। তর লাইগ্যাই বানাইছি। বলল তোতা মিয়া।
খানিকটা ইতস্তত করে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে টেনে নিলো চা। দ্বিধাহীনভাবে বসে পরলো মাটিতে, ঠিক মন্তাজ উদ্দিনের পায়ের কাছে। তারপর ধুয়া উঠা চা ঠান্ডা করে খাওয়ার জন্য একের পর এক ফুঁ দিতে লাগলো কাপে।
- আহারে, না খাইতে না খাইতে পোলাডার কি অবস্থা! খুব কষ্ট লাগে মন্তাজ বাইছা (ভাই সাহেব)। সমবেদনা জানালো তোতা মিয়া।
- কষ্ট লাগলেই আর কি করতারবা তুমি, বড়জোর মাঝে মইদ্যে ডাইকা আইন্না দুইডা চা বিস্কুট খাওয়াইতে পারবা। এতে কি আর ুধার জ্বালা শেষ অইব?
- টেকা-পইসাওয়ালা মাইনষের পোলাপাইনগুলারে মা বাপে সারাদিন খাওয়ার উপরেই রাহে। খাইতে চায়না, এর পরেও মুহের মইদ্দে ঠেইল্যা দেয়।
- বালা কতা মনে করছ। সারা বিশ্বে অহন মানুষ গবেষণা করতাছে পোলাপাইনের মোডা (মোটা) অওয়ন কেমনে ফিরান যায়। কয়েকদিন আগে পত্রিকাত (পত্রিকায়) দেখলাম আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বউ (মিশেল ওবামা) পুলাপাইনের মোডা অওনের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করছে।
- এমুন বেইক্কইল্লামি (বোকামি) কতা ত-অ আর হুনছিনা। হেরা যেইডা বেশতি খায়, এইডা আমরার মতো গরীব দেশের পুলাপাইনরারে দিয়া দিলেই ত-অ সমস্যার সমাধান অইয়া যায়।
- যত সহজে চিন্তা করতাছ, বিষয়ডা তত সহজ না। বলতে বলতে অর্ধেক শেষ করা কাপটা এগিয়ে দিলো তোতা মিয়ার দিকে।
- আরেক চামুচ (চামিচ) চিনি দেও তোতা মিয়া। চায়ে চিনি কম দিয়া আমারে কতায় বুলাইয়া রাকতাছ। এত কিপ্টামি কর কেরে? তোমার ঝি ময়নাই বালা, চিনি কম দেয়না।
ময়নাকে আরেক চামচ চিনি দেয়ার আদেশ দিলো তোতা মিয়া। তারপর বলল
- কিপ্টামি কি আর সাধে করি বাইছা। চিনির দাম গেছে গা বাইরা। কিন্তু তোমরার কতা চিন্তা কইরা চায়ের দাম বাড়াইতে পারতাছিনা।
- না তোমারে দুষ দেইনা। দুষ আমরার কপালের। ভোট দিয়া নেতা বানাই, আর হেরা ক্ষমতায় গিয়া আমরার পেটের কতা বুইল্লা যায়। নাইলে (না হয়) আলু, পটল, চাউল, ডাউল, নুন, তেলের দাম বাড়ার পরেও ডাহায় (ঢাকায়) বইয়া মন্ত্রিরা এইসব লইয়া রস করত-অ পারে? এক মন্ত্রী আমরারে চিনি কম খাওনের উপদেশ দিছে। চিনি কম খাইলে নাকি শরীর বালা থাহে। বহুত আগে হীরক রাজার সভা কবির গলয় হুনছিলাম এমুন কতা।
আশ্চর্য হলো ময়না। হীরক রাজা আবার কে? তার দেশ-ইবা কোথায়! কৌতুহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞেস করল
- পুতু হীরক রাজা কেডা?
- সত্যজিৎ রায় নামের একজন পরিচালক ছিনেমা বানাইছিলো ‘হীরক রাজার দেশে’ নামে। এই ছিনেমার মইদ্যে হীরক রাজ্যের মানুষ না খাইয়া থাকতো। আর রাজা তার সভা কবিরে দিয়া না খাইয়া থাহুনের উপকারিতা বুঝাইতো ‘ অনাহারে নাই খেদ/বেশি খেলে বাড়ে মেদ’
১১ জুলাই ২০১০
ভীষণ অবাক ছেলেটা, তাকে এভাবে ডাকছে কেনো মন্তাজ উদ্দিন! লোকটার সাথে কখনও কোন বেয়াদবি করেছে বলেতো মনে পরছেনা। পাটকাঠির মতো দেহ দোলাতে দোলাতে নি®প্রাণ এগিয়ে আসছে ছেলেটা। চেহারায় শঙ্কা। আর বিব্রততো বটেই। চড়া গলায কাছে ডেকে ছেলেটাকে ভয় পাইয়ে দেয়ায় বিব্রত মন্তাজউদ্দিনও। তাই হয়তো অভয় দেয়ার জন্য বেঞ্চি থেকে পা নামিয়ে কিছুটা নরম স্বরে বললো
- ডরের কিছু নাই। কাছে আয়
তারপর দুই কাপ চা আর একটি বিস্কিট দিতে বললো তোতা মিয়াকে। কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারলনা আপদমস্তক উলঙ্গ ছেলেটা। কোন ধমক-টমক শুনবে এমন শঙ্কায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষন পরই ঘটলো অস্বাভাবিক ঘটনাটাা। তোতামিয়ার বানানো দুই কাপ চায়ের একটি তার দিকে আসতে দেখে ছিটকে পরলো খানিকটা দূরে। যেন শাস্তি দেয়ার জন্যই গরম পানির লিকার ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে তাকে।
- আরে বেক্কল, চা ধর। তর লাইগ্যাই বানাইছি। বলল তোতা মিয়া।
খানিকটা ইতস্তত করে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে টেনে নিলো চা। দ্বিধাহীনভাবে বসে পরলো মাটিতে, ঠিক মন্তাজ উদ্দিনের পায়ের কাছে। তারপর ধুয়া উঠা চা ঠান্ডা করে খাওয়ার জন্য একের পর এক ফুঁ দিতে লাগলো কাপে।
- আহারে, না খাইতে না খাইতে পোলাডার কি অবস্থা! খুব কষ্ট লাগে মন্তাজ বাইছা (ভাই সাহেব)। সমবেদনা জানালো তোতা মিয়া।
- কষ্ট লাগলেই আর কি করতারবা তুমি, বড়জোর মাঝে মইদ্যে ডাইকা আইন্না দুইডা চা বিস্কুট খাওয়াইতে পারবা। এতে কি আর ুধার জ্বালা শেষ অইব?
- টেকা-পইসাওয়ালা মাইনষের পোলাপাইনগুলারে মা বাপে সারাদিন খাওয়ার উপরেই রাহে। খাইতে চায়না, এর পরেও মুহের মইদ্দে ঠেইল্যা দেয়।
- বালা কতা মনে করছ। সারা বিশ্বে অহন মানুষ গবেষণা করতাছে পোলাপাইনের মোডা (মোটা) অওয়ন কেমনে ফিরান যায়। কয়েকদিন আগে পত্রিকাত (পত্রিকায়) দেখলাম আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বউ (মিশেল ওবামা) পুলাপাইনের মোডা অওনের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করছে।
- এমুন বেইক্কইল্লামি (বোকামি) কতা ত-অ আর হুনছিনা। হেরা যেইডা বেশতি খায়, এইডা আমরার মতো গরীব দেশের পুলাপাইনরারে দিয়া দিলেই ত-অ সমস্যার সমাধান অইয়া যায়।
- যত সহজে চিন্তা করতাছ, বিষয়ডা তত সহজ না। বলতে বলতে অর্ধেক শেষ করা কাপটা এগিয়ে দিলো তোতা মিয়ার দিকে।
- আরেক চামুচ (চামিচ) চিনি দেও তোতা মিয়া। চায়ে চিনি কম দিয়া আমারে কতায় বুলাইয়া রাকতাছ। এত কিপ্টামি কর কেরে? তোমার ঝি ময়নাই বালা, চিনি কম দেয়না।
ময়নাকে আরেক চামচ চিনি দেয়ার আদেশ দিলো তোতা মিয়া। তারপর বলল
- কিপ্টামি কি আর সাধে করি বাইছা। চিনির দাম গেছে গা বাইরা। কিন্তু তোমরার কতা চিন্তা কইরা চায়ের দাম বাড়াইতে পারতাছিনা।
- না তোমারে দুষ দেইনা। দুষ আমরার কপালের। ভোট দিয়া নেতা বানাই, আর হেরা ক্ষমতায় গিয়া আমরার পেটের কতা বুইল্লা যায়। নাইলে (না হয়) আলু, পটল, চাউল, ডাউল, নুন, তেলের দাম বাড়ার পরেও ডাহায় (ঢাকায়) বইয়া মন্ত্রিরা এইসব লইয়া রস করত-অ পারে? এক মন্ত্রী আমরারে চিনি কম খাওনের উপদেশ দিছে। চিনি কম খাইলে নাকি শরীর বালা থাহে। বহুত আগে হীরক রাজার সভা কবির গলয় হুনছিলাম এমুন কতা।
আশ্চর্য হলো ময়না। হীরক রাজা আবার কে? তার দেশ-ইবা কোথায়! কৌতুহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞেস করল
- পুতু হীরক রাজা কেডা?
- সত্যজিৎ রায় নামের একজন পরিচালক ছিনেমা বানাইছিলো ‘হীরক রাজার দেশে’ নামে। এই ছিনেমার মইদ্যে হীরক রাজ্যের মানুষ না খাইয়া থাকতো। আর রাজা তার সভা কবিরে দিয়া না খাইয়া থাহুনের উপকারিতা বুঝাইতো ‘ অনাহারে নাই খেদ/বেশি খেলে বাড়ে মেদ’
১১ জুলাই ২০১০
নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি
ধুকপুক ধুকপুক করে পাশ কাটিয়ে গেলো একটি ট্রলার। বেপরোয়া পানি ধেয়ে এসে ধাক্কা খেলো কলার ভেলাটিয়। প্রায় পড়েই যাচ্ছিলো ময়নারা। কিছুক্ষন তিড়িংবিড়িং এপাশ-ওপাশ দুলে তারপর শান্ত হলো ওরা। শান্ত বলতে একেবারে স্থির হয়ে গেছে এমনটি নয়। মৃদু বাতাসের দোলায় দুলছে পুরো হাওর। সেই সাথে দুলছে ময়নাদের ভেলা। এ দুলুনিতে ভেলার স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হলেও এর মাঝে রয়েছে ছন্দ। পানিতে এলোমেলো আলোড়ন তুলে ছুটে চলা ট্রলারের ঢেউয়ের মতো বেপরোয়া নয়। তবে তুমুল বর্ষায় হাওরের বিচিত্র খেয়ালের হদিস পাওয়া ভার। এই হয়তো দেখা গেল স্থির জলধি। যেন জলজ চাদর বিছিনো রয়েছে আকাশ অবধি। আকাশ আর হাওরের নীলে মিলে-মিশে একাকার। আবার হয়তো মুহুর্তের মাঝেই ঘটে যেতে পারে পরিবর্তন। ক্ষ্যাপা বাতাসের উন্মত্ত শক্তিতে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলতে পারে শান্ত জলধিকে। ধেয়ে আসা একেকটা ঢেউ যেন দুই মানুষ সমান। হাওরের এ অগ্নিমূর্তি প্রতি বর্ষায়ই দেখে ময়না। আর এ কারনেই ছোট্ট কলার ভেলায় ভেসে খুব একটা দুরে যায়নি ওরা।
- লগ্যিডাত (লগিতে) একটু ভর দে দুলাল। আমি একটু জিরাইয়া লই।
এক টুকরো গামছার নেংটি ছারা আর কিছুই নেই ছিপছিপে শীরের এ ছেলেটার গায়ে। ময়নার একনিষ্ঠ চ্যালা হিসাবেই ওর পরিচয়। ভেজা শরীর নিয়ে এতক্ষন বসে কাঁপছিলো সে। তাই ময়নার আদেশ পেয়ে আর দেরি করলোনা দুলাল। প্রথমে ভেলার সামনের দিকটায় এগিয়ে গেল। তারপর পানিতে লগি ফেলে তলা নাগাল পেয়ে সজোরে ভর দিলো। ভরের বিপরীতে ভেলাটি এগিয়ে চললো সামনের দিকে। আর সম গতিতেই পেছাতে থাকলো সে। একেবারে শেষ মাথায় চলে এসেই ছপ করে তুলে নিলো লগি। তারপর আবার এগুলো সামনে। এভাবে একের পর এক লগির ভরে ঢেউ কেটে কেটে কেটে ভেলা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুলাল। আর দু’পা ছড়িয়ে আয়েস করে বসে আছে ময়না।
- এই দুলাইল্লা, একটা গান ধরছনা
- আরে ধুরু তুই এইহান-অ বইডা (বৈঠা) পাইলি কই? বোরা (ভেলা) বাইতাছস লগ্যি দিয়া ভরাইয়া (ভর দিয়ে) আর গাণের মইদ্যে কছ বইডার কতা!
- লগ্যির কোন গাণ জানিনা আমি।
- কী ছাতা জানস তুই?
লজ্জায় মাথা নুইয়ে রাখলো কিছুক্ষন। তারপর হঠাৎই যেন উদ্যম ফিরে পেল দুলাল। দ্বিগুণ শক্তিতে লগিতে ভর দিয়ে তীর বেগে ভাসিয়ে চললো ভেলা। আর আবৃত্তি করতে লাগলো ‘স্বর-অ, স্বর-আ/লগ্যি দিয়া ভরাইয়া/মাস্টর গেছে আরাইয়া/হ্রস্য-ই, দীরগু-ঈ/মাস্টর পাইছি....”
হেসে কুটি কুটি ময়না। সংক্রমিত হয়েছে দুলালও। হাসির দমকে ভেলা থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা আরকি। হাসছে, হাসছে আর হাসছে। চোখ থেকে গড়িয়ে পরছে জল। তারপর আকাশ থেকে নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি। তুমুল বর্ষার এ বর্ষণ ওদের হাসি নি:সৃত জলকে একাকার করে দিলো আকাশ আর হাওরের নীলের সাথে।
৪ জুলাই ২০১০
- লগ্যিডাত (লগিতে) একটু ভর দে দুলাল। আমি একটু জিরাইয়া লই।
এক টুকরো গামছার নেংটি ছারা আর কিছুই নেই ছিপছিপে শীরের এ ছেলেটার গায়ে। ময়নার একনিষ্ঠ চ্যালা হিসাবেই ওর পরিচয়। ভেজা শরীর নিয়ে এতক্ষন বসে কাঁপছিলো সে। তাই ময়নার আদেশ পেয়ে আর দেরি করলোনা দুলাল। প্রথমে ভেলার সামনের দিকটায় এগিয়ে গেল। তারপর পানিতে লগি ফেলে তলা নাগাল পেয়ে সজোরে ভর দিলো। ভরের বিপরীতে ভেলাটি এগিয়ে চললো সামনের দিকে। আর সম গতিতেই পেছাতে থাকলো সে। একেবারে শেষ মাথায় চলে এসেই ছপ করে তুলে নিলো লগি। তারপর আবার এগুলো সামনে। এভাবে একের পর এক লগির ভরে ঢেউ কেটে কেটে কেটে ভেলা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুলাল। আর দু’পা ছড়িয়ে আয়েস করে বসে আছে ময়না।
- এই দুলাইল্লা, একটা গান ধরছনা
উৎফুল্ল হযে উঠল দুলাল। লগির ভর কোমল করে দিয়ে বড় করে একটি শ্বাস নিয়ে নিলো। তারপর কচি গলা ভাসিয়ে দিলো হাওরের মৃদু বাতাসে ‘মন মাজি তঅর বৈডা নেরে/আমি আর বাইতে ফারলাম না.....’
তাচ্ছিল্ল করল ময়না- আরে ধুরু তুই এইহান-অ বইডা (বৈঠা) পাইলি কই? বোরা (ভেলা) বাইতাছস লগ্যি দিয়া ভরাইয়া (ভর দিয়ে) আর গাণের মইদ্যে কছ বইডার কতা!
- লগ্যির কোন গাণ জানিনা আমি।
- কী ছাতা জানস তুই?
লজ্জায় মাথা নুইয়ে রাখলো কিছুক্ষন। তারপর হঠাৎই যেন উদ্যম ফিরে পেল দুলাল। দ্বিগুণ শক্তিতে লগিতে ভর দিয়ে তীর বেগে ভাসিয়ে চললো ভেলা। আর আবৃত্তি করতে লাগলো ‘স্বর-অ, স্বর-আ/লগ্যি দিয়া ভরাইয়া/মাস্টর গেছে আরাইয়া/হ্রস্য-ই, দীরগু-ঈ/মাস্টর পাইছি....”
হেসে কুটি কুটি ময়না। সংক্রমিত হয়েছে দুলালও। হাসির দমকে ভেলা থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা আরকি। হাসছে, হাসছে আর হাসছে। চোখ থেকে গড়িয়ে পরছে জল। তারপর আকাশ থেকে নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি। তুমুল বর্ষার এ বর্ষণ ওদের হাসি নি:সৃত জলকে একাকার করে দিলো আকাশ আর হাওরের নীলের সাথে।
৪ জুলাই ২০১০
পানি আবার কিনে খায় কিভাবে!
মোটরসাইকেলটা শাহজাহান আলীর কাছে এক স্বপ্নের যান। সারাদিনই যন্ত্রটার পিঠে চড়ে ভট ভট শব্দ তুলে ঘুরে বেড়ায় এখানে-সেখানে। কোনো কাজটাজের উদ্দেশ্যে যে তা নয়, ড্রাইভিংটা ভালো করে রপ্ত করা আর এই ফাঁকে মোটর সাইকেলের আভিজাত্য দেখিয়ে বেড়ানো আর কি! আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার দাবি জানিয়ে নাকি গাঙ্গাটিয়া গ্রামের জনগণ তাকে সেকেন্ড হ্যান্ড এ বাহনটি উপহার দিয়েছে। কিন্তু ময়নার কাছে ভিন্ন খবর- কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করার শর্তে দশ বছরের ব্যবহৃত এ মোটরসাইকেলটি কিনে এনেছে শাহজাহান আলী। পুরনো হলে কি হবে, এর পিঠে চড়ার স্বাদ অমৃতসম। এমন কথা শাহজাহান আলীর মুখে শুনলেও ততটা বিশ্বাস করতে পারছে না ময়না। কারণ স্থান-কাল পাত্র বিবেচনা না করেই ভুঁ-ভুঁও-ভুঁওওওওক্ করে যন্ত্রটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে যেতে দেখে সে। এতে অবশ্য এর মালিকের উৎসাহে কোনো ভাটা পরতে দেখা যায় না । এই ধরা যাক এখনকার কথাই, কাঁদা-পানিতে জ্যাম হয়ে যাওয়া মোটরসাইকেলটিকে ঠেলে নিয়ে যেভাবে এগিয়ে আসছে ওদের দোকানের দিকে, তাতে মনে হচ্ছে মহাপরাক্রমশালী কোনো দৈত্যের সাথে সম্মুখ সমরে সে এক বিজয়ী বীর।
- ময়নারে, তোতা মিয়া কই?
হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল শাহজাহান আলী
- বাপজান বাড়ির বিতরে আছে।
- ডাক দিয়া ক-অ আমি আইছি। আর আমার লাগি এক কাপ চা বানা
- বাপজন, শারজাহান পুতু ((শাহজাহান চাচা) তোমারে ডাকতাছে।
ময়নার ডাক শেষ হওয়ার আগেই ওদের দোকান আর ভেতর বাড়ির সংযোগের দরজাটি খোলে গেল। কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে অলস ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো তোতা মিয়া
- আরে শারজাহান বাইছা (ভাই সাহেব) কইত্তে?
- বাজারেত্তে আইলাম আরহি, যানডা একবারে বাইরইয়া যাইতাছে। চিন্তা করলাম তর দোহানের এক কাপ চা খাইয়া যাই। একটু জিরানিও অইল আর তর লগে দুইডা আলাপ-অ অইল।
বলতে বলতে মোটরসাইকেলটাকে সমতল জায়গায় দাঁড় করিয়ে ধপ করে বেঞ্চিতে বসে পরল শাহজাহান আলী। তারপর মুখের হাসি অটুট রেখেই পরম মমতায় তাকিয়ে থাকল ওটার দিকে। মমতা ঝারলো তোতা মিয়াও
- প্যাক-কাঁদায় দেহি আপনের গাড়িডা মারা লাইগ্যা (একাকার হয়ে) গেছে।
- মারা লাগদনা! রাস্তাডার অবস্তা কী, দেখছস নি?
- বালা কতা মন-অ করছ-অ বাইছা, রাস্তাডা ঠিক করনের লাইগ্যা কোন সেঙশন (অনুদান) পাইছনি?
- আর কইছনা। এই রাস্তার লাইগ্যাইতো হেদিন ডাহা (ঢাকা) গেছিলাম এমপি সাবের লগে দেহা করতে।
- পরে এমপি সাব কী কইল?
- দেহা আর করতে পারলাম কই, ডাহা শহর-অ গাড়ি-গোড়ার জামের (জ্যাম) লাইগ্যা চলুন যায় নাকি? দেহা করার কতা আছিন এগারডার সময়, এমপি সাবের বাসাত গিয়া উঠলাম বারডা বত্রিশ মিনিডে। গিয়া দেহি ওনি বাসাত্তে বাইরইয়া গেছে গা।
- তুমি ইকটু আগে রওনা দিলেই পারতা।
- আগেই রওনা দিছিলাম। তারপরেও দেরি। ডাহা শহরের জামের কি কোন ঠিক-ঠিকানা আছে? একবার আটকাইয়া থাকলে আর ছারুনের নাম নাই। ঘন্টার পরে ঘন্টা ঠাডাপুড়া রইদের (প্রখর রোদের) মইদ্যে গাড়িগুলাইন খারইয়া থাহে, আর ডাইবার, প্যসেঞ্জার সবাইর মথার চান্দি গরম অইয়া যায়। আর এই গরম চান্দি লইয়া, কেউ কেউরে সইহ্য করত পারেনা। একটু হেত-ভেত (এদিক-সেদিক) অইলেই লাইগ্যা দেয় কাইজ্জা।
- আমি বুইজ্জা পাইনা, এই শহরের মানুষ বাঁচে কেমনে! নাই গাছ, নাই গাঙ, নাই পানি। শ্বাস ফালাইবার জায়গাডা পর্যন্ত নাই। খালি দালান আর দালান, গাড়ি আর গাড়ি। আমরার গেরাম অই বালা।
- খালি এইগুলা অইলে ত-অ বালাই আছিন। পানি পর্যন্ত কিইন্যা খাওন লাগে। হেদিন পত্রিকার মাইদ্যে লেকছে পানির অভাবে নাকি ডাহা শহর মাডির নিচে ডাইব্বা যাইবগা।
শিউরে উঠল ময়না। এ আবার কেমন শহর, পানি আবার কিনে খায় কিভাবে! ভারি অবাক মেয়েটি। পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসে তার। ঢক ঢক করে এক জগ পানি গলায় ঢেলে স্থির হতে চেস্টা করলো। কিন্তু পারলনা। এমন কথা শুনলে স্থির হতে পারার কথাওনা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এই শহরেই থাকে মন্ত্রী-এমপিসহ বড় বড় লোকেরা। এদেরকেসহ যদি ঢাকা মাটির নিচে দেবেই যায়, তবে দেশ চালাবে কে? আর এই শহরের সাধারণ মানুষগুলারই বা কী অবস্থা হবে? জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হলো ময়নার। কিন্তু ততক্ষণে শাহজাহান আলী বেঞ্চি থেকে উঠে গিয়ে শখের বাহন পরিস্কারে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। লম্বা একটি কাঠি দিয়ে দুই চাকার ভেতর আটকে থাকা দলা দলা কাঁদা বের করে নিয়ে আসছে। এতে অবশ্য সামান্য ধকল যাচ্ছে তার উপর। কিন্তু বসবাসের অনুপযোগী ঢাকার পথের চেয়ে গ্রামের এই কাঁদায় ভরা মেঠো পথে শখের বাহন তাড়িয়ে বেড়ানোতেই হয়তো অনেক প্রশান্তি, ভাবল ময়না।
২৭ জুন ২০১০
- ময়নারে, তোতা মিয়া কই?
হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল শাহজাহান আলী
- বাপজান বাড়ির বিতরে আছে।
- ডাক দিয়া ক-অ আমি আইছি। আর আমার লাগি এক কাপ চা বানা
- বাপজন, শারজাহান পুতু ((শাহজাহান চাচা) তোমারে ডাকতাছে।
ময়নার ডাক শেষ হওয়ার আগেই ওদের দোকান আর ভেতর বাড়ির সংযোগের দরজাটি খোলে গেল। কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে অলস ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো তোতা মিয়া
- আরে শারজাহান বাইছা (ভাই সাহেব) কইত্তে?
- বাজারেত্তে আইলাম আরহি, যানডা একবারে বাইরইয়া যাইতাছে। চিন্তা করলাম তর দোহানের এক কাপ চা খাইয়া যাই। একটু জিরানিও অইল আর তর লগে দুইডা আলাপ-অ অইল।
বলতে বলতে মোটরসাইকেলটাকে সমতল জায়গায় দাঁড় করিয়ে ধপ করে বেঞ্চিতে বসে পরল শাহজাহান আলী। তারপর মুখের হাসি অটুট রেখেই পরম মমতায় তাকিয়ে থাকল ওটার দিকে। মমতা ঝারলো তোতা মিয়াও
- প্যাক-কাঁদায় দেহি আপনের গাড়িডা মারা লাইগ্যা (একাকার হয়ে) গেছে।
- মারা লাগদনা! রাস্তাডার অবস্তা কী, দেখছস নি?
- বালা কতা মন-অ করছ-অ বাইছা, রাস্তাডা ঠিক করনের লাইগ্যা কোন সেঙশন (অনুদান) পাইছনি?
- আর কইছনা। এই রাস্তার লাইগ্যাইতো হেদিন ডাহা (ঢাকা) গেছিলাম এমপি সাবের লগে দেহা করতে।
- পরে এমপি সাব কী কইল?
- দেহা আর করতে পারলাম কই, ডাহা শহর-অ গাড়ি-গোড়ার জামের (জ্যাম) লাইগ্যা চলুন যায় নাকি? দেহা করার কতা আছিন এগারডার সময়, এমপি সাবের বাসাত গিয়া উঠলাম বারডা বত্রিশ মিনিডে। গিয়া দেহি ওনি বাসাত্তে বাইরইয়া গেছে গা।
- তুমি ইকটু আগে রওনা দিলেই পারতা।
- আগেই রওনা দিছিলাম। তারপরেও দেরি। ডাহা শহরের জামের কি কোন ঠিক-ঠিকানা আছে? একবার আটকাইয়া থাকলে আর ছারুনের নাম নাই। ঘন্টার পরে ঘন্টা ঠাডাপুড়া রইদের (প্রখর রোদের) মইদ্যে গাড়িগুলাইন খারইয়া থাহে, আর ডাইবার, প্যসেঞ্জার সবাইর মথার চান্দি গরম অইয়া যায়। আর এই গরম চান্দি লইয়া, কেউ কেউরে সইহ্য করত পারেনা। একটু হেত-ভেত (এদিক-সেদিক) অইলেই লাইগ্যা দেয় কাইজ্জা।
- আমি বুইজ্জা পাইনা, এই শহরের মানুষ বাঁচে কেমনে! নাই গাছ, নাই গাঙ, নাই পানি। শ্বাস ফালাইবার জায়গাডা পর্যন্ত নাই। খালি দালান আর দালান, গাড়ি আর গাড়ি। আমরার গেরাম অই বালা।
- খালি এইগুলা অইলে ত-অ বালাই আছিন। পানি পর্যন্ত কিইন্যা খাওন লাগে। হেদিন পত্রিকার মাইদ্যে লেকছে পানির অভাবে নাকি ডাহা শহর মাডির নিচে ডাইব্বা যাইবগা।
শিউরে উঠল ময়না। এ আবার কেমন শহর, পানি আবার কিনে খায় কিভাবে! ভারি অবাক মেয়েটি। পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসে তার। ঢক ঢক করে এক জগ পানি গলায় ঢেলে স্থির হতে চেস্টা করলো। কিন্তু পারলনা। এমন কথা শুনলে স্থির হতে পারার কথাওনা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এই শহরেই থাকে মন্ত্রী-এমপিসহ বড় বড় লোকেরা। এদেরকেসহ যদি ঢাকা মাটির নিচে দেবেই যায়, তবে দেশ চালাবে কে? আর এই শহরের সাধারণ মানুষগুলারই বা কী অবস্থা হবে? জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হলো ময়নার। কিন্তু ততক্ষণে শাহজাহান আলী বেঞ্চি থেকে উঠে গিয়ে শখের বাহন পরিস্কারে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। লম্বা একটি কাঠি দিয়ে দুই চাকার ভেতর আটকে থাকা দলা দলা কাঁদা বের করে নিয়ে আসছে। এতে অবশ্য সামান্য ধকল যাচ্ছে তার উপর। কিন্তু বসবাসের অনুপযোগী ঢাকার পথের চেয়ে গ্রামের এই কাঁদায় ভরা মেঠো পথে শখের বাহন তাড়িয়ে বেড়ানোতেই হয়তো অনেক প্রশান্তি, ভাবল ময়না।
২৭ জুন ২০১০
ছায়ার মতো আগলে রাখে
- কী রে ময়না, বাপের লাইগ্রা অত উতলা অইছস কেরে?
পিঁড়িতে বসে মেয়ের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করল মা।
- রেডুত (রেডিওতে) কইছে আউজ্জা (আজ) সারাডা দিন বাপজানের লগে থাহনের লাইগ্যা।
- কেরে আউজ্জা কী অইছে?
- আউজ্জা বুলে বাবা দিবস। পৃথিবীর সব মানুষই আউজ্জা বাবার লগে কাডাইব। কিন্তু আমারে ঘুমে থুইয়াই বাপজান যে বাইর-অইল, অহন-অতো আইল না।
- এই দেহ ছেরির মুহঅ (মুখে) যত আকাইম্মা কথা। তর বাপের কি আর কামকাইজ নাই যে সারা দিন তর লগে বইয়া থাকব!
ময়নার মাথায় ভর্ৎসনাসুলভ মৃদু একটি ঝাঁকি দিয়ে কথাগুলো বলল মা। তারপর আবার মনোযোগ দিলো বিলি কাটায়। দুই হাঁটু ভাঁজ করে লক্ষ্মী মেয়ের মতো সামনের পিঁড়িটায় বসে আছে মা। ঠিক বসে থাকা নয়, বেশির ভাগ সময় পায়ের পাতার সামনের দিকটার ওপর ভর করেই উঁকি দিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। কান্তি পেয়ে বসলে ভরসা হিসেবে পিঁড়িটা নিচে রয়েছে এই যা। চুলের ভাঁজে ভাঁজে মায়ের কোমল হাতের সঞ্চালন বেশ ভালোই লাগছে ময়নার। আরামে চোখ লেগে আসছে। বেশ কয়েকবারই ডলে পড়ে যাচ্ছিল। রাজ্যের ঘুম এসে চোখে ভিড় করলে কী-ই বা করার আছে ওর। কিন্তু মায়ের ঝাঁকুনি খেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শক্ত হয়ে বসতে হয়েছে তাকে। একটু-আধটু ঝাঁকুনি আর বকুনি দিলেও মা-টা তার ভীষণ ভালো। আদর আর ভালোবাসা দিয়ে একেবারে আঁচলে আগলে রাখতে চায় ময়নাকে। আর এ কারণেই মাকে ছাড়া কোথাও গেলে এক দিনের জন্যও ভালো রাগে না ময়নার। ইস্! বাবাটাও যদি এমন হতো, তাহলে আর কোনো দুঃখই ছিল না ময়নার। একদমই বাড়িতে থাকে না বাবা। আর থাকলেও দোকানের কেনা-বেচা নিয়েই সময় পার করে। মাঝে মধ্যে ময়নাকেদোকানে বসিয়ে উধাও হয়ে যায়। সারা দিন ব্যস্ত থাকে হাটবাজারে। পৃথিবী ফর্সা হওয়ার আগেই হাওরে চলে যায় ক্ষেতের কাজে। এসব একদমই ভালো লঅগে না ওর কাছে।
- আইচ্ছা মায়া (মা), বাপজান তোমার লাহান (মতো) অইল না কেরে?
ময়নার আচমকা প্রশ্নে হাতের সঞ্চালন থামিয়ে ঝুলে থাকা কাপড়ের আঁচলটা নিজের কাঁধে ছুড়ে দিলো মা। তারপর আরাম করে পিঁড়িটায় বসে বলল,
- দেহ আমার ছেরির ঢঙের কথা! তর বাপ হিবার আমার লাহান অইত কেরে?
- তুমি যেমুন সারাক্ষণ আমার পাশে থাহ, বাপজান তো থাহে না। সারা দিন খালি এইহানে ওইহানে যায়।
- বেক্কলের (বোকার) কথা হুনছনি! সারাদিন বাইত বইয়া থাকলে, কামাই না করলে আমরার সংসার চলব কেমনে?
কথাটা ঠিকই বলেছে মা, ভাবল ময়না। বাবার এত ব্যস্ততা, এত ম্রম সব তো তার জন্যই। এটা এনে দাও, ওটা কিনে দাও এসব আবদার তো বাবার কাছেই করে সে। ওর ভালো লাগায় বাবাকে উৎফুল্ল হতে যেমন দেখেছে, তেমনি ওর মন ভার থাকলে বাবাকেও মন বার করে বসে থাকতে দেখেছে। কিন্তু যেমনভাবে মায়ের ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে ময়না, বাবার বেলায় তেমনটি নয়। তবে বাবার বলিষ্ঠ হাত আর দূর থেকে ভালোবাসা যে সারাক্ষণ ছায়ার মতো আগলে রাখে তাকে, তা বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করে ময়না।
- বাপজান কোন সুময় আইব মায়া? বাবা দিবস-ত শেস অইয়া যাইতাছে।
- অইছে হুনছি, বেঢঙের কথা, এক দিনের লাইগ্যা অত দরদ ইতলাইয়া পড়ন বালা না (ভালো না)।
বলতে বলতে পায়ের পাতার ওপর ভর করে উঁচু হলো মা। পাশে রাখা টিনের বাটি থেকে তেল নিয়ে মাখতে লাগল ময়নার মাথায়। আর সেও বুঝে গেল এখন আর কথা বাড়ানো ছলবে না। অর্থাৎ চুপ করে মাকে মায়ের কাজ করতে দিতে হবে।
২০ জুন, ২০১০
পিঁড়িতে বসে মেয়ের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করল মা।
- রেডুত (রেডিওতে) কইছে আউজ্জা (আজ) সারাডা দিন বাপজানের লগে থাহনের লাইগ্যা।
- কেরে আউজ্জা কী অইছে?
- আউজ্জা বুলে বাবা দিবস। পৃথিবীর সব মানুষই আউজ্জা বাবার লগে কাডাইব। কিন্তু আমারে ঘুমে থুইয়াই বাপজান যে বাইর-অইল, অহন-অতো আইল না।
- এই দেহ ছেরির মুহঅ (মুখে) যত আকাইম্মা কথা। তর বাপের কি আর কামকাইজ নাই যে সারা দিন তর লগে বইয়া থাকব!
ময়নার মাথায় ভর্ৎসনাসুলভ মৃদু একটি ঝাঁকি দিয়ে কথাগুলো বলল মা। তারপর আবার মনোযোগ দিলো বিলি কাটায়। দুই হাঁটু ভাঁজ করে লক্ষ্মী মেয়ের মতো সামনের পিঁড়িটায় বসে আছে মা। ঠিক বসে থাকা নয়, বেশির ভাগ সময় পায়ের পাতার সামনের দিকটার ওপর ভর করেই উঁকি দিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। কান্তি পেয়ে বসলে ভরসা হিসেবে পিঁড়িটা নিচে রয়েছে এই যা। চুলের ভাঁজে ভাঁজে মায়ের কোমল হাতের সঞ্চালন বেশ ভালোই লাগছে ময়নার। আরামে চোখ লেগে আসছে। বেশ কয়েকবারই ডলে পড়ে যাচ্ছিল। রাজ্যের ঘুম এসে চোখে ভিড় করলে কী-ই বা করার আছে ওর। কিন্তু মায়ের ঝাঁকুনি খেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শক্ত হয়ে বসতে হয়েছে তাকে। একটু-আধটু ঝাঁকুনি আর বকুনি দিলেও মা-টা তার ভীষণ ভালো। আদর আর ভালোবাসা দিয়ে একেবারে আঁচলে আগলে রাখতে চায় ময়নাকে। আর এ কারণেই মাকে ছাড়া কোথাও গেলে এক দিনের জন্যও ভালো রাগে না ময়নার। ইস্! বাবাটাও যদি এমন হতো, তাহলে আর কোনো দুঃখই ছিল না ময়নার। একদমই বাড়িতে থাকে না বাবা। আর থাকলেও দোকানের কেনা-বেচা নিয়েই সময় পার করে। মাঝে মধ্যে ময়নাকেদোকানে বসিয়ে উধাও হয়ে যায়। সারা দিন ব্যস্ত থাকে হাটবাজারে। পৃথিবী ফর্সা হওয়ার আগেই হাওরে চলে যায় ক্ষেতের কাজে। এসব একদমই ভালো লঅগে না ওর কাছে।
- আইচ্ছা মায়া (মা), বাপজান তোমার লাহান (মতো) অইল না কেরে?
ময়নার আচমকা প্রশ্নে হাতের সঞ্চালন থামিয়ে ঝুলে থাকা কাপড়ের আঁচলটা নিজের কাঁধে ছুড়ে দিলো মা। তারপর আরাম করে পিঁড়িটায় বসে বলল,
- দেহ আমার ছেরির ঢঙের কথা! তর বাপ হিবার আমার লাহান অইত কেরে?
- তুমি যেমুন সারাক্ষণ আমার পাশে থাহ, বাপজান তো থাহে না। সারা দিন খালি এইহানে ওইহানে যায়।
- বেক্কলের (বোকার) কথা হুনছনি! সারাদিন বাইত বইয়া থাকলে, কামাই না করলে আমরার সংসার চলব কেমনে?
কথাটা ঠিকই বলেছে মা, ভাবল ময়না। বাবার এত ব্যস্ততা, এত ম্রম সব তো তার জন্যই। এটা এনে দাও, ওটা কিনে দাও এসব আবদার তো বাবার কাছেই করে সে। ওর ভালো লাগায় বাবাকে উৎফুল্ল হতে যেমন দেখেছে, তেমনি ওর মন ভার থাকলে বাবাকেও মন বার করে বসে থাকতে দেখেছে। কিন্তু যেমনভাবে মায়ের ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে ময়না, বাবার বেলায় তেমনটি নয়। তবে বাবার বলিষ্ঠ হাত আর দূর থেকে ভালোবাসা যে সারাক্ষণ ছায়ার মতো আগলে রাখে তাকে, তা বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করে ময়না।
- বাপজান কোন সুময় আইব মায়া? বাবা দিবস-ত শেস অইয়া যাইতাছে।
- অইছে হুনছি, বেঢঙের কথা, এক দিনের লাইগ্যা অত দরদ ইতলাইয়া পড়ন বালা না (ভালো না)।
বলতে বলতে পায়ের পাতার ওপর ভর করে উঁচু হলো মা। পাশে রাখা টিনের বাটি থেকে তেল নিয়ে মাখতে লাগল ময়নার মাথায়। আর সেও বুঝে গেল এখন আর কথা বাড়ানো ছলবে না। অর্থাৎ চুপ করে মাকে মায়ের কাজ করতে দিতে হবে।
২০ জুন, ২০১০
আজ মন্তাজউদ্দিন বড়ই উৎফুল্ল
আজ মন্তাজউদ্দিন বড়ই উৎফুল্ল। কিন্তু কী কারণে এ সম্পর্কে কোন ধারণা করতে পারছে না ময়না। গোঁফের আড়ালে মুচকি হাসি নিয়েই দোকানে প্রবেশ করল মন্তাজ পুতু (চাচা)। তারপর বেঞ্চিটায় বসে এক কাপ চা দিতে বললো ময়নাকে। একজন লোক আপন মনে হেসে যাচ্ছে- ব্যাপারটা কিছুটা ব্যাখাপ্পা মনে হল তার কাছে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো, থাকনা ঠোঁটে হাসি। তাতে তো ময়নার কোন সমস্যা হচ্ছে না। কাউকে হাসতে দেখলে ভালোই লাগে তার। মন্তাজ পুতুর উৎফুল্ল মনের হাসিটা মুচকি হলেও এতে কোনো কুটিলতা কিংবা কৌতুক নেই। এটা-সেটা নিয়ে কৌতুক করতে অভ্যস্ত এ লোকটার হাসির সাথে ময়নার পরিচয় নেই, এমনটি নয়। তবুও আজ বেশ অপরিচিতই মনে হচ্ছে তাকে। কারণ এমন নির্মল ও তৃপ্তির হাসি এর আগে কে-ও হাসতে পেরেছে বলে মনে হয়না। নি:শব্দ উৎফুল্লতার হিল্লোল স্পর্শ করল ময়নাকেও, নিজের অজান্তেই অ™ভ’ত এক ভালোলাগার ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাকে। অর্থাৎ উৎফুল্ল হয়ে উঠল ময়নাও।
- একলা একলা পিটপিটায়া হাসতাছ কেরে পুতু?
- তুই হাসতাছস কেরে?
- তুমার হাসি দেইখ্যা।
- আমি হাসতাছি বাংলাদেশের মাইনষের তৃপ্তির হাসি দেইখ্যা।
কথাটা ঠিক বুঝতে পারলনা ময়না। বাংলাদেশের মানুষ আবার কখন হাসল! মন্তাজ পুতুই তো সেদিন বলেছিল এই দেশের মানুষকে ঘিরে রেখেছে কেবল সমস্যা আর সমস্যা। এত সমস্যার মাঝে থেকে কি কেউ হাসতে পারে! ব্যাপারটা জানার আগ্রহ হলো তার
- কী এমুন ঘটল চাচা?
- হুনছ নাই, আমরার দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে দায়িত্ব নিয়া স্বজনহারা তিন কন্যার বিয়া দিয়া দিছে।
-না হুনার কী আছে? এইডাতো সবাই হুনছে।
- এই কারণে সবার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি।
এমনভাবে তো ভেবে দেখেনি সে। সত্যিইতো কয়েকদিন যাবত দোকানে চা খেতে আসা লোকজনের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রসঙ্গটি। আহা! বিয়ে বাড়িতে আগুন লেগে কত্ত মানুষই-না মারা গেল। প্রাণ হারালো পাত্রীদের বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনসহ আরও কত্ত লোক। খবরটি শুনে খুব মায়া হয়েছিলো ময়নার। ভেবেছিলো আপনজন হারানোর সাথে সাথে বুঝি ভবিষ্যতটাও হারালো ওরা। কিন্তু যখন শুনল স্বজনহারা এ মেয়েদের মায়ের ভ’মিকায় এসে দাঁড়িয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন অন্যদের মতো ভালো লাগার অনুভূতি হয়েছিলো তারও।
- বুঝলি মায়া (মা), প্রধানমন্ত্রী এই মহৎ কামডা কইরা একটা নজির দেহাইল। অহন তারে অনুসরণ কইরা আমরা যুদি একজনের দু:খরে দশজনের মইদ্যে ভাগ কইরা লই, তাইলে কি এই দেশের কোনো মানুষ নিজেরে অসহায় মনে করব?
বলতে বলতে তৃপ্তির হাসি নিয়েই চায়ে শেষ চুমুক বসাল মন্তাজ উদ্দিন। তারপর খালি কাপটি বেঞ্চিতে রেখে উঠে দাঁড়ালো এবং জবাবের অপেক্ষা না করেই হাটা ধরল বাড়ির পথে। তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইলো ময়না। আর অপেক্ষায় রইলো অন্য আরো দিনের, যখন মন্তাজ পুতুর হাসিটা হবে ঠিক আজকের মতো নির্মল ও তৃপ্তির।
- একলা একলা পিটপিটায়া হাসতাছ কেরে পুতু?
- তুই হাসতাছস কেরে?
- তুমার হাসি দেইখ্যা।
- আমি হাসতাছি বাংলাদেশের মাইনষের তৃপ্তির হাসি দেইখ্যা।
কথাটা ঠিক বুঝতে পারলনা ময়না। বাংলাদেশের মানুষ আবার কখন হাসল! মন্তাজ পুতুই তো সেদিন বলেছিল এই দেশের মানুষকে ঘিরে রেখেছে কেবল সমস্যা আর সমস্যা। এত সমস্যার মাঝে থেকে কি কেউ হাসতে পারে! ব্যাপারটা জানার আগ্রহ হলো তার
- কী এমুন ঘটল চাচা?
- হুনছ নাই, আমরার দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে দায়িত্ব নিয়া স্বজনহারা তিন কন্যার বিয়া দিয়া দিছে।
-না হুনার কী আছে? এইডাতো সবাই হুনছে।
- এই কারণে সবার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি।
এমনভাবে তো ভেবে দেখেনি সে। সত্যিইতো কয়েকদিন যাবত দোকানে চা খেতে আসা লোকজনের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রসঙ্গটি। আহা! বিয়ে বাড়িতে আগুন লেগে কত্ত মানুষই-না মারা গেল। প্রাণ হারালো পাত্রীদের বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনসহ আরও কত্ত লোক। খবরটি শুনে খুব মায়া হয়েছিলো ময়নার। ভেবেছিলো আপনজন হারানোর সাথে সাথে বুঝি ভবিষ্যতটাও হারালো ওরা। কিন্তু যখন শুনল স্বজনহারা এ মেয়েদের মায়ের ভ’মিকায় এসে দাঁড়িয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন অন্যদের মতো ভালো লাগার অনুভূতি হয়েছিলো তারও।
- বুঝলি মায়া (মা), প্রধানমন্ত্রী এই মহৎ কামডা কইরা একটা নজির দেহাইল। অহন তারে অনুসরণ কইরা আমরা যুদি একজনের দু:খরে দশজনের মইদ্যে ভাগ কইরা লই, তাইলে কি এই দেশের কোনো মানুষ নিজেরে অসহায় মনে করব?
বলতে বলতে তৃপ্তির হাসি নিয়েই চায়ে শেষ চুমুক বসাল মন্তাজ উদ্দিন। তারপর খালি কাপটি বেঞ্চিতে রেখে উঠে দাঁড়ালো এবং জবাবের অপেক্ষা না করেই হাটা ধরল বাড়ির পথে। তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইলো ময়না। আর অপেক্ষায় রইলো অন্য আরো দিনের, যখন মন্তাজ পুতুর হাসিটা হবে ঠিক আজকের মতো নির্মল ও তৃপ্তির।
শুক্রবার, জুলাই ০২, ২০১০
সোমবার, জুন ২১, ২০১০
ভিনদেশি পতাকায় সয়লাব বাংলাদেশ
‘ছলাৎ’ করে একটি শব্দ হলো মাত্র। সাথে সাথে কাঁদা-পানিতে একাকার হয়ে গেল ময়না। কিছু বুঝে উঠার আগেই লক্ষ করল তার ঠিক সামনে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে একটি ফুটবল। আর সেটা নেয়ার জন্য দ্রুত এগিয়ে আসছে এক দল পুঁচকে ছেলে। ওরা ভালোভাবেই জানে যে ময়নার কাছে একবার বল আটক হলে ফেরত পাওয়া সহজ নয়।
এ দিকে ময়নার মেজাজ দেখে কে! মনে হলো গোটা প্রকৃতিই যেন টিটকিরি করছে ওর সাথে। ঘাসের ফাঁকে জমে থাকা পানিতে সূর্যের খাড়া রশ্মি পড়ে চিকচিক করছে। কিন্তু ওর মনে হলো এই পানিও বুঝি চিকচিকে দাঁত বের করে হেয়ালি করছে। আর দেরি করল না ময়না। ফুট বলটা পুঁচকেদের আয়ত্তে চলে যায় যায়, এমন সময় ছুঁ মেরে নিয়ে নিল।
-হ্যাই পোলাপাইন, চ্যাপচ্যাইপ্পা পানি (জমে থাকা পানি) ছাড়া খেলনের আর যাইগা নেই?
আচমকা ধমকে ভয় পেয়ে গেল ওরা। হাত কাঁচুমাচু করে মাটির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সবাই। ওদের পায়ের আঙুল থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ঢাকা পড়েছে কাঁদায়। চাপচাপ কাঁদার ভারে চোখের পাতা পর্যন্ত মেলতে পারছে না কয়েকজন। আর যারা পাড়ছে তাদের চোখের ভাষায় ফুটে উঠছে ফুটবলটি ফেরত পাওয়ার আকুলি বিকুলি। মুখ ফুটে বলার সাহস নেই, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে তবু। পরনে হাফপ্যান্ট থাক বা না থাক, প্রায় সবার কপালেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার মতো ফিতা বাঁধা রয়েছে। ব্যাপারটা গোচরে আসার পর ফুটবলটাকে নিজের সাথে আরো সেঁটে নিলো কাঁদা-পানিতে কিম্ভুত ময়না। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল ন্যাংটা ছেলেদের কপালে কপালে। নাহ্! আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ছাড়া অন্য কোনো দেশের পতাকাই নেই। অবশ্য থাকলেও চিনতে পারত না একমাত্র লাল সবুজ পতাকাটি ছাড়া। কিছুটা অবাকই হলো সে। ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাড়িতে বাড়িতে, দোকানে দোকানে পতাকা উড়ছে, কিন্তু কোথাও বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা চোখে পড়ছে না। অথচ খাতার পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে সবুজ জমিনে লাল বৃত্ত এঁকে একটি পতাকা বানিয়েছিল সে। আহলাদ করে সেঁটেও রেখেছে দোকানের বেড়ায়।
-ভিইজা এইত্তো গেছগা ময়না বুবু, আমরার লগে খেলাত নাইম্যা পর। আমরা বিশ্বকাপ খেলতাছি
একজন একটু এগিয়ে এসে সাহস করে কথাটা বলল। তারপর আবার চলে গেল নিরাপদ দূরত্বে। কিন্তু খেলার আমন্ত্রণ পেয়ে যে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে ময়না, এতটা ভাবেনি ওরা।
-তুমি কোন পক্ষে আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল?
-আমি বাংলাদেশের পক্ষে
ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ওরা। বুঝার খুব একটা প্রয়োজনও মনে করল না। হই হই করে নেমে গেল মাঠে। কাঁদা-পানিতে আলোড়ন তুলে আবার শুরু হেয়ে গেল ফুটবল বিশ্বকাপ। আর ছোট্ট ফুটবলটি ঘুরতে লাগল আর্জেন্টিনা থেকে ব্রাজিল, ব্রাজিল থেকে আর্জেন্টিনা কিংবা স্বপ্নচারি বাংলাদেশের পায়ে পায়ে।
এ দিকে ময়নার মেজাজ দেখে কে! মনে হলো গোটা প্রকৃতিই যেন টিটকিরি করছে ওর সাথে। ঘাসের ফাঁকে জমে থাকা পানিতে সূর্যের খাড়া রশ্মি পড়ে চিকচিক করছে। কিন্তু ওর মনে হলো এই পানিও বুঝি চিকচিকে দাঁত বের করে হেয়ালি করছে। আর দেরি করল না ময়না। ফুট বলটা পুঁচকেদের আয়ত্তে চলে যায় যায়, এমন সময় ছুঁ মেরে নিয়ে নিল।
-হ্যাই পোলাপাইন, চ্যাপচ্যাইপ্পা পানি (জমে থাকা পানি) ছাড়া খেলনের আর যাইগা নেই?
আচমকা ধমকে ভয় পেয়ে গেল ওরা। হাত কাঁচুমাচু করে মাটির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সবাই। ওদের পায়ের আঙুল থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ঢাকা পড়েছে কাঁদায়। চাপচাপ কাঁদার ভারে চোখের পাতা পর্যন্ত মেলতে পারছে না কয়েকজন। আর যারা পাড়ছে তাদের চোখের ভাষায় ফুটে উঠছে ফুটবলটি ফেরত পাওয়ার আকুলি বিকুলি। মুখ ফুটে বলার সাহস নেই, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে তবু। পরনে হাফপ্যান্ট থাক বা না থাক, প্রায় সবার কপালেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার মতো ফিতা বাঁধা রয়েছে। ব্যাপারটা গোচরে আসার পর ফুটবলটাকে নিজের সাথে আরো সেঁটে নিলো কাঁদা-পানিতে কিম্ভুত ময়না। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল ন্যাংটা ছেলেদের কপালে কপালে। নাহ্! আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ছাড়া অন্য কোনো দেশের পতাকাই নেই। অবশ্য থাকলেও চিনতে পারত না একমাত্র লাল সবুজ পতাকাটি ছাড়া। কিছুটা অবাকই হলো সে। ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাড়িতে বাড়িতে, দোকানে দোকানে পতাকা উড়ছে, কিন্তু কোথাও বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা চোখে পড়ছে না। অথচ খাতার পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে সবুজ জমিনে লাল বৃত্ত এঁকে একটি পতাকা বানিয়েছিল সে। আহলাদ করে সেঁটেও রেখেছে দোকানের বেড়ায়।
-ভিইজা এইত্তো গেছগা ময়না বুবু, আমরার লগে খেলাত নাইম্যা পর। আমরা বিশ্বকাপ খেলতাছি
একজন একটু এগিয়ে এসে সাহস করে কথাটা বলল। তারপর আবার চলে গেল নিরাপদ দূরত্বে। কিন্তু খেলার আমন্ত্রণ পেয়ে যে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে ময়না, এতটা ভাবেনি ওরা।
-তুমি কোন পক্ষে আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল?
-আমি বাংলাদেশের পক্ষে
ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ওরা। বুঝার খুব একটা প্রয়োজনও মনে করল না। হই হই করে নেমে গেল মাঠে। কাঁদা-পানিতে আলোড়ন তুলে আবার শুরু হেয়ে গেল ফুটবল বিশ্বকাপ। আর ছোট্ট ফুটবলটি ঘুরতে লাগল আর্জেন্টিনা থেকে ব্রাজিল, ব্রাজিল থেকে আর্জেন্টিনা কিংবা স্বপ্নচারি বাংলাদেশের পায়ে পায়ে।
রবিবার, মে ৩০, ২০১০
মুসা ইব্রাহিম নামের লোকটি
এই তো সবুজ আইয়া পড়ছে।
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো একজন। যেন তোতা মিয়ার দোকানের এই জটলাটা তার অপেক্ষাতেই ছিল। অনেকগুলো চোখের কৌতূহলি দৃষ্টিতে বিব্রত হলো সবুজ। এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করার পর লোকজনের কাছে কদর একটু বেশি-ই পাচ্ছে সে। মাঝে মাঝেই এ নিয়ে লজ্জায় পড়তে হয়। কী করবে বুঝতে পারল না সে, এমন সময় ভিড়ের মধ্য থেকে অন্য একজন হাঁক ছাড়ল...
-আরে, আগে বইতে দে সবুজরে।
চট করে একজন উঠে গিয়ে খালি করে দিলো বেঞ্চির একটা অংশ। সামান্য ইতস্তত করে মধ্যমণি হয়ে বসল সে। দোকানের সামনের পুরো জটলাটা ঘিরে ধরল তাকে। সবাই উৎসাহী। কারণ ওরা ভীষণ উদগ্রীব হয়ে আছে মুসা ইব্রাহিমকে নিয়ে।
ব্যস্ত হয়ে চা তৈরি করতে করতে তোতা মিয়া জিজ্ঞেস করল...
-মুসা ইব্রাহিম দেশে আইব কবে, এমুন কিছু লিখছে-টিকছে নাকি পত্রিকাত?
জবাবটা ভালো করে শুনবে বলে চোখ দুটো কচলে নিলো ময়না।
-কয়েক দিনের মইধ্যেই আইয়া পড়ব।
সবুজ ভাইয়ের জবাব শেষ হতে না হতেই প্রশ্ন করল অন্যজন
-হিমালয় উঁচা (উঁচু) কতখানি?
-এই ধরুইন, আপনের আমার মতো পাঁচ হাজার মানুষও যদি একজনের মাথার উপরে আরেকজন উইট্টা খাড়ই তবুও হিমালয়ের আগা (চূড়া) লাগুইল পাওন যাইত না (স্পর্শ করা যাবে না)।
-আরেব্বাইসরে, ছেড়ার বুকের পাটা দেখছনি, কত উপরে গিয়া উটছে!
বলল মুরব্বি গোছের একজন, তারপর ফুড়ুৎ করে কাপে চুমুক বসিয়ে ধীরে ধীরে মাথা তুলল অন্যজন।
-আমরার দেশের মাইনষের বুকের পাটা, চেষ্টা, বুদ্ধি-সুদ্ধি সব আছে। কিন্তু পথ দেহানোর মত মানুষ নাই। এই মুসা কত কষ্ট-মষ্ট কইরাই না টেহা জোগার করল হিমালয়ের আগায় উঠনের লাইগ্যা। সরকার কি কিছু সহযোগিতা করতে পারত না তারে? আছে ত খালি দুর্নীতি কইরা প্যাট মোটা করনের ধান্দায়।
অন্য একজন খেদ ঝাড়ল।
-আর সহযোগিতা! এসব কথা কইয়া কোনো লাভ নাই। জগতের নিয়মডাই এমুন। আমরার সবুজের কথাই ধর, সারা দিন ক্ষেতে কাম কইরা, খাইয়া না খাইয়া থাইক্কা এমুনভাবে মেট্রিক পাস করল যে অহন দশ গেরামে আমরা মাথা উঁচা কইরা কথা কইতে পারি। কিন্তু পরীক্ষার আগে ক্ষেতে কাম করার সময় কয়জন খোঁজ লইছিলা যে সবুজ কয় বেলা খাইছে কী খাইছে না?
-হ, একবারে খাঁটি কথা কইছ। অহন সবুজরে লইয়া আমরাই তো নাচানাচি করি।
তারপর একসাথে কথা বলতে শুরু করল সবাই। সৃষ্টি হলো শোরগোল। তবে এ জটলার সব কথা ঘুরপাক খেতে থাকল মুসা ইব্রাহিম আর সবুজকে ঘিরে।
পরিচিত মানুষদের উল্লাস, কাপে ফুড়–ৎ-ফাড়–ৎ চুমুকের শব্দ আর জটলা থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে উপরে উঠতে থাকা বিড়ির ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করতে করতে অ™ভূত এক ভালোলাগায় ডুবে গেল ময়না। পাহাড়ের উপরে উঠে দেশের জন্য কী সুনাম অর্জন করা যায়, তা স্পষ্ট না হলেও মুসা ইব্রাহিম নামের লোকটি যে কিছু একটা অর্জন করেছে এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত।
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো একজন। যেন তোতা মিয়ার দোকানের এই জটলাটা তার অপেক্ষাতেই ছিল। অনেকগুলো চোখের কৌতূহলি দৃষ্টিতে বিব্রত হলো সবুজ। এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করার পর লোকজনের কাছে কদর একটু বেশি-ই পাচ্ছে সে। মাঝে মাঝেই এ নিয়ে লজ্জায় পড়তে হয়। কী করবে বুঝতে পারল না সে, এমন সময় ভিড়ের মধ্য থেকে অন্য একজন হাঁক ছাড়ল...
-আরে, আগে বইতে দে সবুজরে।
চট করে একজন উঠে গিয়ে খালি করে দিলো বেঞ্চির একটা অংশ। সামান্য ইতস্তত করে মধ্যমণি হয়ে বসল সে। দোকানের সামনের পুরো জটলাটা ঘিরে ধরল তাকে। সবাই উৎসাহী। কারণ ওরা ভীষণ উদগ্রীব হয়ে আছে মুসা ইব্রাহিমকে নিয়ে।
ব্যস্ত হয়ে চা তৈরি করতে করতে তোতা মিয়া জিজ্ঞেস করল...
-মুসা ইব্রাহিম দেশে আইব কবে, এমুন কিছু লিখছে-টিকছে নাকি পত্রিকাত?
জবাবটা ভালো করে শুনবে বলে চোখ দুটো কচলে নিলো ময়না।
-কয়েক দিনের মইধ্যেই আইয়া পড়ব।
সবুজ ভাইয়ের জবাব শেষ হতে না হতেই প্রশ্ন করল অন্যজন
-হিমালয় উঁচা (উঁচু) কতখানি?
-এই ধরুইন, আপনের আমার মতো পাঁচ হাজার মানুষও যদি একজনের মাথার উপরে আরেকজন উইট্টা খাড়ই তবুও হিমালয়ের আগা (চূড়া) লাগুইল পাওন যাইত না (স্পর্শ করা যাবে না)।
-আরেব্বাইসরে, ছেড়ার বুকের পাটা দেখছনি, কত উপরে গিয়া উটছে!
বলল মুরব্বি গোছের একজন, তারপর ফুড়ুৎ করে কাপে চুমুক বসিয়ে ধীরে ধীরে মাথা তুলল অন্যজন।
-আমরার দেশের মাইনষের বুকের পাটা, চেষ্টা, বুদ্ধি-সুদ্ধি সব আছে। কিন্তু পথ দেহানোর মত মানুষ নাই। এই মুসা কত কষ্ট-মষ্ট কইরাই না টেহা জোগার করল হিমালয়ের আগায় উঠনের লাইগ্যা। সরকার কি কিছু সহযোগিতা করতে পারত না তারে? আছে ত খালি দুর্নীতি কইরা প্যাট মোটা করনের ধান্দায়।
অন্য একজন খেদ ঝাড়ল।
-আর সহযোগিতা! এসব কথা কইয়া কোনো লাভ নাই। জগতের নিয়মডাই এমুন। আমরার সবুজের কথাই ধর, সারা দিন ক্ষেতে কাম কইরা, খাইয়া না খাইয়া থাইক্কা এমুনভাবে মেট্রিক পাস করল যে অহন দশ গেরামে আমরা মাথা উঁচা কইরা কথা কইতে পারি। কিন্তু পরীক্ষার আগে ক্ষেতে কাম করার সময় কয়জন খোঁজ লইছিলা যে সবুজ কয় বেলা খাইছে কী খাইছে না?
-হ, একবারে খাঁটি কথা কইছ। অহন সবুজরে লইয়া আমরাই তো নাচানাচি করি।
তারপর একসাথে কথা বলতে শুরু করল সবাই। সৃষ্টি হলো শোরগোল। তবে এ জটলার সব কথা ঘুরপাক খেতে থাকল মুসা ইব্রাহিম আর সবুজকে ঘিরে।
পরিচিত মানুষদের উল্লাস, কাপে ফুড়–ৎ-ফাড়–ৎ চুমুকের শব্দ আর জটলা থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে উপরে উঠতে থাকা বিড়ির ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করতে করতে অ™ভূত এক ভালোলাগায় ডুবে গেল ময়না। পাহাড়ের উপরে উঠে দেশের জন্য কী সুনাম অর্জন করা যায়, তা স্পষ্ট না হলেও মুসা ইব্রাহিম নামের লোকটি যে কিছু একটা অর্জন করেছে এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত।
মঙ্গলবার, মে ২৫, ২০১০
লেহাপড়া করতে পইসা লাগে
শাহজাহান আলী লোকটা ভালো কি মন্দ এ সম্পর্কে ময়নার তেমন ধারণা নেই। তবে লোকমুখে শুনেছে তার বাবা রাশিদ মেম্বার নাকি নিজ হাতে তিন তিনটা ডাকাত জবাই করেছিল। সঙ্গত কারণেই শাহজাহান আলীকে সমীহ করে চলা প্রয়োজন। অনেকে করেনও। তবে ময়নার কাছে সমীহ পাওয়ার যোগ্য সে নয়। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কি কারণে? কোন সদুত্তর দিতে পারবেনা সে। লোকটাকে ভালো লাগেনা, ব্যস। কিভাবে আর ভালো লাগবে! দোকানের বেঞ্চিটায় বসে আছে ঘন্টাখানেক হলো। এর মধ্যে এক কাপ চা-ই কেবল খেয়েছে। আর সদ্য মেট্টিক পাশ করা সবুজ ভাইকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ঝাঁজরা করে দিচ্ছে।
বাবা দোকানে নেই। বেচাকেনা সামাল দিতে হচ্ছে ময়নাকে একাই। এটা দাও ওটা দাও। এমনিতেই মেজাজ টঙ হয়ে আছে। তার উপর এতক্ষন ধরে একটা লোক বেঞ্চি দখল করে থাকলে কার সহ্য হয়। শুধু বসে থাকলেও হতো, একেবারে পা তুলে দিয়ে আরাম করে পরীক্ষা নিচ্ছে সবুজ ভাইয়ের। শহরে ভর্তি হতে গেলে নাকি অনেক কিছু জানা থাকতে হয়।
- আচ্ছা বলতো আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলো কে?
হঠাৎ-ই বইয়ের ভাষা (শুদ্ধ ভাষা) শুনে কৌতুহল হল ময়নার। অবশ্য শাহজাহান আলীর মুখে এমন ভাষা আজই প্রথম শোনা গেছে তা নয়। পর পর ছয় বার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে না পারলেও শিক্ষিত ও নেতৃত্বের গুণাবলীসম্মন্ন লোক হিসাবে এলাকায় যথেস্ট যশ রয়েছে তার। সে হিসাবে মাঝে মাঝে বইয়ের ভাষায় কথা বলা দায়িত্বের আওতায় পরে।
প্রশ্ন করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জবাব দিয়ে দিলো সবুজ ভাই। কি বলেছে সঠিক বুঝতে না পারলেও ‘কলাম বাঁশ’ ধরনের একটা শব্দ ময়নার কানে এলো। এমন বাঁশের নাম সে জীবনে শোনেনি।
আগ্রহ হারিয়ে গেলো ময়নার। মনযোগ দিলো কেটলির দিকে। জ্বালানি পেয়ে উসকে উঠল চুলার আগুন। সেই সাথে উথলে উঠল সবুজ ভাইয়ের প্রতি তার দরদ। আহা, বেচারা কত কষ্ট করেইনা লেখাপড়া করেছে। রোদে-বানে সারাদিন ক্ষেতে কামলা খেটেছে। তারপর শ্রান্ত শরীর নিয়ে রাতে কোথায় ঘুমাতে যাবে তা নয়, বই নিয়ে বসেছে নুমানদের বাংলা ঘরে। নিজের বাড়িতে কুপি জ্বালানোর সাধ্য না থাকলেও হারিকেনের আলোতে নুমানকে পড়াতে পড়াতে নিজের পড়াটাও চালিয়ে গেছে। নুমানের বাবা-ইতো বইপত্র কিনে দিলো তাকে।
- এই ছেরা, চাকরি করবিনাতো কি করবি? তোর বাপের কি পইসা আছে? কলেজে লেহাপড়া করতে পইসা লাগে, পইসা।
শাহজাহান আলীর উচ্চবাচ্চে ধ্যান ভাঙল ময়নার। লক্ষ্য করল একেবারেই চুপসে গেছে সবুজ ভাই। মাথা নুইয়ে এমনভাবে বসে আছে যেন একশ’একটা খুনের আসামি।
- জ্ঞানবুদ্ধি-ত দেখলাম বালাই আছে। তো সহজ কথা সহজে বুঝসনা কেরে (কেন)! জিপিএ পাঁচ কি তুই একলাই পাইছস ? সারা দেশে এমুন রেজাল্ট করছে বহুত পোলাপান। এরার (এদের) ভীরের মইদ্যে তর মত সবুজের কোন পাত্তা থাাকবোরে?
সবুজ ভাইয়ের শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝড়ছে, লক্ষ্য করল ময়না।
- তর বাপেরে ক’ কিছু টেহা যোগার করতে, দেহি পুলিশের চাকরিতে ঢোকায়া দেয়ন যায় কিনা।
বলতে বলতে পাঞ্জাবির হাতা দুটো ভাঁজ করে নিল শাহজাহান আলী। উঠে দাঁড়ালো এবং জবাবের আশায় শেষবারের মত তাকালো সবুজের দিকে। তারপর আশাহত হয়ে পা বাড়ালো বাড়ির পথে।
বাবা দোকানে নেই। বেচাকেনা সামাল দিতে হচ্ছে ময়নাকে একাই। এটা দাও ওটা দাও। এমনিতেই মেজাজ টঙ হয়ে আছে। তার উপর এতক্ষন ধরে একটা লোক বেঞ্চি দখল করে থাকলে কার সহ্য হয়। শুধু বসে থাকলেও হতো, একেবারে পা তুলে দিয়ে আরাম করে পরীক্ষা নিচ্ছে সবুজ ভাইয়ের। শহরে ভর্তি হতে গেলে নাকি অনেক কিছু জানা থাকতে হয়।
- আচ্ছা বলতো আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলো কে?
হঠাৎ-ই বইয়ের ভাষা (শুদ্ধ ভাষা) শুনে কৌতুহল হল ময়নার। অবশ্য শাহজাহান আলীর মুখে এমন ভাষা আজই প্রথম শোনা গেছে তা নয়। পর পর ছয় বার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে না পারলেও শিক্ষিত ও নেতৃত্বের গুণাবলীসম্মন্ন লোক হিসাবে এলাকায় যথেস্ট যশ রয়েছে তার। সে হিসাবে মাঝে মাঝে বইয়ের ভাষায় কথা বলা দায়িত্বের আওতায় পরে।
প্রশ্ন করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জবাব দিয়ে দিলো সবুজ ভাই। কি বলেছে সঠিক বুঝতে না পারলেও ‘কলাম বাঁশ’ ধরনের একটা শব্দ ময়নার কানে এলো। এমন বাঁশের নাম সে জীবনে শোনেনি।
আগ্রহ হারিয়ে গেলো ময়নার। মনযোগ দিলো কেটলির দিকে। জ্বালানি পেয়ে উসকে উঠল চুলার আগুন। সেই সাথে উথলে উঠল সবুজ ভাইয়ের প্রতি তার দরদ। আহা, বেচারা কত কষ্ট করেইনা লেখাপড়া করেছে। রোদে-বানে সারাদিন ক্ষেতে কামলা খেটেছে। তারপর শ্রান্ত শরীর নিয়ে রাতে কোথায় ঘুমাতে যাবে তা নয়, বই নিয়ে বসেছে নুমানদের বাংলা ঘরে। নিজের বাড়িতে কুপি জ্বালানোর সাধ্য না থাকলেও হারিকেনের আলোতে নুমানকে পড়াতে পড়াতে নিজের পড়াটাও চালিয়ে গেছে। নুমানের বাবা-ইতো বইপত্র কিনে দিলো তাকে।
- এই ছেরা, চাকরি করবিনাতো কি করবি? তোর বাপের কি পইসা আছে? কলেজে লেহাপড়া করতে পইসা লাগে, পইসা।
শাহজাহান আলীর উচ্চবাচ্চে ধ্যান ভাঙল ময়নার। লক্ষ্য করল একেবারেই চুপসে গেছে সবুজ ভাই। মাথা নুইয়ে এমনভাবে বসে আছে যেন একশ’একটা খুনের আসামি।
- জ্ঞানবুদ্ধি-ত দেখলাম বালাই আছে। তো সহজ কথা সহজে বুঝসনা কেরে (কেন)! জিপিএ পাঁচ কি তুই একলাই পাইছস ? সারা দেশে এমুন রেজাল্ট করছে বহুত পোলাপান। এরার (এদের) ভীরের মইদ্যে তর মত সবুজের কোন পাত্তা থাাকবোরে?
সবুজ ভাইয়ের শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝড়ছে, লক্ষ্য করল ময়না।
- তর বাপেরে ক’ কিছু টেহা যোগার করতে, দেহি পুলিশের চাকরিতে ঢোকায়া দেয়ন যায় কিনা।
বলতে বলতে পাঞ্জাবির হাতা দুটো ভাঁজ করে নিল শাহজাহান আলী। উঠে দাঁড়ালো এবং জবাবের আশায় শেষবারের মত তাকালো সবুজের দিকে। তারপর আশাহত হয়ে পা বাড়ালো বাড়ির পথে।
সোমবার, মে ১৭, ২০১০
আগুন বেয়ে পড়ছে
‘.... ডুক্কু ডুক্কু লাই/পাতা কাটা যাই/পাতার ঝুম ঝুম/বেহালা বাজাই/বেহালার তরে/মৌমাছি ঘুরে/মৌমাছি ঘুরে...হ’
এই দম ছাইড়া দিছে, দম ছাইড়া দিছে, ময়না বুবু দম ছাইড়া দিছে। বলতে বলতে ময়নার গা ছুঁয়ে দিলো একজন। অর্থাৎ ময়না তখন মরা (খেলায় নিষ্ক্রিয়)।
ভ্যাপসা গরমে আমগাছের ছায়ায় বৌচি খেলছে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। মাথার ওপর ছায়া আছে বটে, বাতাসের নামগন্ধ নেই। ভাটার মতো জ্বলছে সূর্য। চোখ তুলে তাকানো যায় না। এদকি-ওদিকের স্পষ্ট রশ্মিগুলোতে উড়ন্ত ধুলোর চিক চিক। খড়ের নতুন পুঞ্জি আর রোদে শুকাতে দেয়া ন্যাড়ার ভাপ আরো চিটচিটে করে তুলছে শরীর। সেই চিটচিটে শরীর নিয়েই লুটোপুটি খাচ্ছে ওরা। দৌড়ে বেড়াচ্ছে পুরো মাঠ।
খেলায় মরে যাওয়ার পর অনেকটা হতাশ হয়েই আমগাছের শেকড়ে এসে বসেছে ময়না। পর্যবেক্ষণ করছে অন্যদের খেলা। সেই সাথে কামনা করছে নিজের দলের বিজয়। ভ্যাপসা গরমে ঘাম তো নয়, যেন আগুন বেয়ে পড়ছে শরীর থেকে।
গাছের শেকড়গুলো প ুরুষ্ট, আর বসার জন্যও বেশ। মনো হলো যেন রাজার সিংহাসনে বসে আছে সে। এখন একটু ফুরফুরে বাতাস এলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়। ওপরের দিকে তাকায় ময়না। নাহ, গাছের একটি পাতারও নড়াচড়া নেই। ডাঁসা ডাঁসা আমগুরো জুলে আছে নির্জীব। কয়েকটি পেকে হলদেটে রযও ধরেছ্ েইস, একট া আম যদি খাওয়া যেত। একবার ইচ্ছে হলো ঢিল ছুঁড়ে...। পরক্ষণেই মনে হলো মন্তাজ চাচার কথা। বাতাসে ঝরা আম কুড়িয়ে নিতে কখনো বাধা নেই চাচার। কিন্তু গাছে ঢিল পড়েছে তো সেরেছে।
- ময়না বুবু, লও গাঙের পানিতে যাই।
হঠাৎ লক্ষ করল ছেলেমেয়ের দঙ্গল তাকে ঘিরে দঁইড়য়ে আছে। আমের তেষ্টায় বিভোর হয়ে ওঠায় কখন যে খেলার গোল্লা উঠে গেল, খেয়ালই করল না সে।
- গাঙে জুয়াইরা (নতুন) পানি আইছে, অহন ডুবাইলে (দাপাদাপি করলে) জ্বর আইব।
ময়নার কথাতে মোটেই নিরুৎসাহিত হলো না ছেলেমেয়েরা।
- শইল জুড়াইয়া পানিতে নামলে কিচ্ছু অইত না।
- আইচ্ছা অহন বইয়া থাক, আগে জিরাইয়া লই, পরে গাঙে যায়াম (যাবো)।
ময়নার এক কথাতেই শেকড় ঘিরে বসে পড়ল প ুরো দঙ্গল। শরীরের ঘাম ঝেড়ে ফেলতে ফে লতে ভাঙা কণ্ঠে গান ধরল একজন- ‘আল্লা মেঘ দে/পানি দে/ছায়া দে রে তুই/আল্লা মেঘ দে।’ এতট ুকু বলতেই ধমকে উঠল ময়না।
- অইছে হুনছি। গাছের ছেমাত (ছায়ায়) বইয়া থাইক্কা আল্লার কাছে ছেমা চাস। আর গাঙের প ানি আইয়া ক্ষেতের (জমির) ফসল সব তলাইয়া দিলো, তার পরেও পানি চাস।
লজ্জায় গানের গলা ক্ষীণ হয়ে এলো ছেলেটার। তারপ র একেবারে থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপই কাটল ওদের। এক সময় ময়না আবিষ্কার করল সবার দৃষ্টিই গাছে ঝুলে থাকা আমের প্রতি।
- আম খাইবি? খাইতে চাইলে আল্লার কাছে রোদন কর তুফানের (ঝড়ের) লাইগ্যা। বৈশাখ মাস চইল্যা গেল, অহন-অ বৈশাইজ্ঞা তুফান (বৈশাখী ঝড়) আইল না।
তারপর ময়না নিজেই সুর তুলল- ‘আল্লা তুফান দে/তুফান দে...রে.../আল্লা তুফান দে.... স থে সাথে একই কথার কোরাস ধরল সবাই।
হইচই শুনে মন্তাজ চাচা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। ধীরে ধীরে এসে বসল ্ ামগাছের শেকড়টায়। ঠিক ময়নার পাশেই।
- দোয়া কর, বালা কইরা দোয়া কর। তরার (তোদের) দোয়া কবুল অইব।
তার কথা শুনে আরো উৎসাহিত হলো ছেলেমেয়ারা। গাইতে গাইতে মন্তাজ চাচাকেও ইঙ্গিত করল ধুয়া তুলতে।
- বুইড়া মাইনষের দোয়া কি আল্লায় হুনব? আমার পাপের কারণে বৈশাখ মাসের তুফান আর বৈশাখে অয় না, ধান দাওয়ার (কাটার) আগে ধানি জমি পানিতে তলায়। আমরা পৃথিবীর হিসাব-কিতাব বদলাইয়া দিছি। আমরা বাড়াইয়া দিছি পৃথিবীর তাপ। মাথার ওপর অহন গনগনে তাপে সূর্য জ্বলে। পর্বতের বরফ গইলা ডুইবা যাইতাছে পৃথিবী।
শিহরিত হয়ে উঠল ময়না। থেমে গেল কোরাস। পৃথিবী আবার ডুবে যায় কিভাবে!
- তুমি এই সব কী কইতাছ পুতু? মানুষরা কি পৃথিবীর তাপ বাড়াইতে পারে?
- পারে, পারে। প্রকৃতির নিজের একটা নিয়ম আছে। আমরা প্রকৃতিরে দূষিত কইরা তুলতাছি। এর াকরণে নিয়মের লগে তাল রাখতে পারতাছে না প্রকৃতি। দেখস না বৈশাখে অহন ঝড় অয় না, কিন্তু যহন অয় তহন সিডর অইয়া লন্ডভন্ড করে মানুষের প্রাণ। কামের সময় গাঙে পানি থাহে না, কিন্তু যহন থাহে বন্যায় ভাসাইয়া নেয় ভিটা। এইগুলো অইল প্রকৃতির প্রতিশোধ। অহন তুফানের লাইগ্যা আরো বেশি কইরা রোদন কর আল্লার কাছে। তুফান আইলে তরাও আম খাইতে পারব্ িআর পৃথিবী কিছুটা অইলেও আপন গতি ফিইরা পাইব।
এতটুকু বলে থেমে গেল মন্তাজ চাচা। হঠাৎই ছন্দপতন হওয়ায় একট ু নড়েচড়ে বসল সবাই। তারপর আবার সুর তুলল ময়না- ‘আল্লা তুফান দে/তুফান দে...রে.../আল্লা তুফান দে....’ সাথে ধুয়া তুলল মন্তাজ চাচাসহ এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে।
এই দম ছাইড়া দিছে, দম ছাইড়া দিছে, ময়না বুবু দম ছাইড়া দিছে। বলতে বলতে ময়নার গা ছুঁয়ে দিলো একজন। অর্থাৎ ময়না তখন মরা (খেলায় নিষ্ক্রিয়)।
ভ্যাপসা গরমে আমগাছের ছায়ায় বৌচি খেলছে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। মাথার ওপর ছায়া আছে বটে, বাতাসের নামগন্ধ নেই। ভাটার মতো জ্বলছে সূর্য। চোখ তুলে তাকানো যায় না। এদকি-ওদিকের স্পষ্ট রশ্মিগুলোতে উড়ন্ত ধুলোর চিক চিক। খড়ের নতুন পুঞ্জি আর রোদে শুকাতে দেয়া ন্যাড়ার ভাপ আরো চিটচিটে করে তুলছে শরীর। সেই চিটচিটে শরীর নিয়েই লুটোপুটি খাচ্ছে ওরা। দৌড়ে বেড়াচ্ছে পুরো মাঠ।
খেলায় মরে যাওয়ার পর অনেকটা হতাশ হয়েই আমগাছের শেকড়ে এসে বসেছে ময়না। পর্যবেক্ষণ করছে অন্যদের খেলা। সেই সাথে কামনা করছে নিজের দলের বিজয়। ভ্যাপসা গরমে ঘাম তো নয়, যেন আগুন বেয়ে পড়ছে শরীর থেকে।
গাছের শেকড়গুলো প ুরুষ্ট, আর বসার জন্যও বেশ। মনো হলো যেন রাজার সিংহাসনে বসে আছে সে। এখন একটু ফুরফুরে বাতাস এলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়। ওপরের দিকে তাকায় ময়না। নাহ, গাছের একটি পাতারও নড়াচড়া নেই। ডাঁসা ডাঁসা আমগুরো জুলে আছে নির্জীব। কয়েকটি পেকে হলদেটে রযও ধরেছ্ েইস, একট া আম যদি খাওয়া যেত। একবার ইচ্ছে হলো ঢিল ছুঁড়ে...। পরক্ষণেই মনে হলো মন্তাজ চাচার কথা। বাতাসে ঝরা আম কুড়িয়ে নিতে কখনো বাধা নেই চাচার। কিন্তু গাছে ঢিল পড়েছে তো সেরেছে।
- ময়না বুবু, লও গাঙের পানিতে যাই।
হঠাৎ লক্ষ করল ছেলেমেয়ের দঙ্গল তাকে ঘিরে দঁইড়য়ে আছে। আমের তেষ্টায় বিভোর হয়ে ওঠায় কখন যে খেলার গোল্লা উঠে গেল, খেয়ালই করল না সে।
- গাঙে জুয়াইরা (নতুন) পানি আইছে, অহন ডুবাইলে (দাপাদাপি করলে) জ্বর আইব।
ময়নার কথাতে মোটেই নিরুৎসাহিত হলো না ছেলেমেয়েরা।
- শইল জুড়াইয়া পানিতে নামলে কিচ্ছু অইত না।
- আইচ্ছা অহন বইয়া থাক, আগে জিরাইয়া লই, পরে গাঙে যায়াম (যাবো)।
ময়নার এক কথাতেই শেকড় ঘিরে বসে পড়ল প ুরো দঙ্গল। শরীরের ঘাম ঝেড়ে ফেলতে ফে লতে ভাঙা কণ্ঠে গান ধরল একজন- ‘আল্লা মেঘ দে/পানি দে/ছায়া দে রে তুই/আল্লা মেঘ দে।’ এতট ুকু বলতেই ধমকে উঠল ময়না।
- অইছে হুনছি। গাছের ছেমাত (ছায়ায়) বইয়া থাইক্কা আল্লার কাছে ছেমা চাস। আর গাঙের প ানি আইয়া ক্ষেতের (জমির) ফসল সব তলাইয়া দিলো, তার পরেও পানি চাস।
লজ্জায় গানের গলা ক্ষীণ হয়ে এলো ছেলেটার। তারপ র একেবারে থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপই কাটল ওদের। এক সময় ময়না আবিষ্কার করল সবার দৃষ্টিই গাছে ঝুলে থাকা আমের প্রতি।
- আম খাইবি? খাইতে চাইলে আল্লার কাছে রোদন কর তুফানের (ঝড়ের) লাইগ্যা। বৈশাখ মাস চইল্যা গেল, অহন-অ বৈশাইজ্ঞা তুফান (বৈশাখী ঝড়) আইল না।
তারপর ময়না নিজেই সুর তুলল- ‘আল্লা তুফান দে/তুফান দে...রে.../আল্লা তুফান দে.... স থে সাথে একই কথার কোরাস ধরল সবাই।
হইচই শুনে মন্তাজ চাচা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। ধীরে ধীরে এসে বসল ্ ামগাছের শেকড়টায়। ঠিক ময়নার পাশেই।
- দোয়া কর, বালা কইরা দোয়া কর। তরার (তোদের) দোয়া কবুল অইব।
তার কথা শুনে আরো উৎসাহিত হলো ছেলেমেয়ারা। গাইতে গাইতে মন্তাজ চাচাকেও ইঙ্গিত করল ধুয়া তুলতে।
- বুইড়া মাইনষের দোয়া কি আল্লায় হুনব? আমার পাপের কারণে বৈশাখ মাসের তুফান আর বৈশাখে অয় না, ধান দাওয়ার (কাটার) আগে ধানি জমি পানিতে তলায়। আমরা পৃথিবীর হিসাব-কিতাব বদলাইয়া দিছি। আমরা বাড়াইয়া দিছি পৃথিবীর তাপ। মাথার ওপর অহন গনগনে তাপে সূর্য জ্বলে। পর্বতের বরফ গইলা ডুইবা যাইতাছে পৃথিবী।
শিহরিত হয়ে উঠল ময়না। থেমে গেল কোরাস। পৃথিবী আবার ডুবে যায় কিভাবে!
- তুমি এই সব কী কইতাছ পুতু? মানুষরা কি পৃথিবীর তাপ বাড়াইতে পারে?
- পারে, পারে। প্রকৃতির নিজের একটা নিয়ম আছে। আমরা প্রকৃতিরে দূষিত কইরা তুলতাছি। এর াকরণে নিয়মের লগে তাল রাখতে পারতাছে না প্রকৃতি। দেখস না বৈশাখে অহন ঝড় অয় না, কিন্তু যহন অয় তহন সিডর অইয়া লন্ডভন্ড করে মানুষের প্রাণ। কামের সময় গাঙে পানি থাহে না, কিন্তু যহন থাহে বন্যায় ভাসাইয়া নেয় ভিটা। এইগুলো অইল প্রকৃতির প্রতিশোধ। অহন তুফানের লাইগ্যা আরো বেশি কইরা রোদন কর আল্লার কাছে। তুফান আইলে তরাও আম খাইতে পারব্ িআর পৃথিবী কিছুটা অইলেও আপন গতি ফিইরা পাইব।
এতটুকু বলে থেমে গেল মন্তাজ চাচা। হঠাৎই ছন্দপতন হওয়ায় একট ু নড়েচড়ে বসল সবাই। তারপর আবার সুর তুলল ময়না- ‘আল্লা তুফান দে/তুফান দে...রে.../আল্লা তুফান দে....’ সাথে ধুয়া তুলল মন্তাজ চাচাসহ এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে।
সোমবার, মে ১০, ২০১০
হুঁশিয়ার সাবধান খবরদার

গাঙ পারের হিজল গাছটায় বসে সেই কখন থেকে ডাকছে পেঁচাটা। একবার ‘মীমম’ ধরনের ভয়ঙ্কর শব্দ তুলে, তারপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার। ঝিঁঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ ঝিঁ ঝিঁ ঝিমমম লহরিতে ছেদ ঘটাচ্ছে শেয়ালের হাঁক। সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির এক ভুতুড়ে ঐকতান। সে ঐকতানের ছন্দ ভেঙে তীক্ষ্ম আওয়াজ তুলছে চৌকিদারের বাঁশি। থেকে থেকে ভেসে আসছে চিৎকার, হুঁশিয়ার-সাবধান-খবরদার। রাত যত গভীর হচ্ছে রহস্যধ্বনিও তত স্পষ্ট হয়ে আঘাত করছে ময়নার কানে। সেই সাথে আতঙ্ক ছড়িয়ে অবস করে দিচ্ছে তাকে। শিরশির করে উঠছে শরীর। শঙ্কিত হয়ে ভাবছে সে চৌকিদারের সাহসের কথা। একেকবার বাঁশির আওয়াজ কানে আসছে আর চৌকিদারের স্থলে নিজেকে ভেবে মেরুদণ্ড ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে তার।
গভীর রাতে জিন-ভুতের বিচরণ থাকে অবাধ। ঘরের বাইরে তো বটেই এমনকি ভেতরে এসেও মানুষের উৎপাত করতে ছাড়ে না এরা। কিন্তু কি তাজ্জব ব্যাপার, এই চৌকিদার হুঁশিয়ার সাবধান বলে বলে মধ্যরাতে পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো গ্রাম! ভাবতেই অবাক লাগছে ময়নার। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও চোখের পাতা এক করতে পারছে না মোটেই। ময়নার ছটফটানিতে ঘুম ভেঙে গেল পাশে শুয়ে থাকা দাদীরও
- ও ময়না, ময়নারে। নড়াচড়া করতাছস কেরে?
- আমার ডর করতাছে খুব।
আতঙ্কিত হয়ে উঠে দাদী। ঘুমের জড়তা কাটিয়ে ধরমড়িয়ে ওঠে বসে চৌকির ওপর। তারপর নাতনীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিক কিছু না দেখে অভয় দিয়ে বলে
- আরে ডর কিয়ের, আমি তো আছি লগে।
- অই চৌকিদারের লাগি ডর লাগতাছে আমার। মাইজ রাইতে (মধ্যরাতে) একলা একলা গেরাম পর (পাহারা) দিয়া বেড়ায়। যদি জিন-ভুতে পায়?
কোনো জবাব বেরোলনা দাদীর মুখ থেকে। এক পশলা ভয় মেশানো বাতাসের ধাক্কায় ধপ করে শব্দ তুলল টিনের জানালার পাল্লায়। সেই সাথে ধপ করে কেঁপে উঠে দাদীর ভেতরটাও। পরক্ষণেই দূর থেকে অস্পষ্ট ভেসে আসে চৌকিদারের হাঁক, হুঁশিয়ার-সাবধান-খবরদার। সাথে সাথেই যেন হুঁশিয়ার হয়ে যায় দাদী। তারপর ময়নাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলে
- জিন-ভুতের চৌদ্দ গোষ্ঠীর সাধ্যি নাই যে চৌকিদারের কোনো ক্ষতি করে।
- ভুতেরা কি চৌকিদারগরে ডরায়?
- না ডরাইলে কি এত রাইত যাইগা এরা গেরাম পর দেয়? খালি এই চৌকিদারগরেই না, সরকারি পোশাক পরইন্যা (পরিহিত) হগল সান্ত্রী, সেপাই, পুলিশগরে তারা (জিন-ভুতেরা) ডরায়।
- ও আইচ্ছা, ভুতেরাও বুঝি সরকার আর সরকারি পোশাকরে মাইন্য কইরা চলে?
জবাবে ছোট্ট করে ‘হু’ বলে আবার শুয়ে পরে দাদী। ময়নাকেও বালিশের ওপর টেনে দিয়ে হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়। মিনিটখানেক পর চোখ জড়িয়ে আসায় থেমে যায় দাদীর সঞ্চালনরত হাত। কিন্তু তখনো কৌতূহল থামেনা ময়নার। জানার আরো বিষয় ছিল তার। মন্তাজ পুতু (চাচা) যে সেদিন বলল ঢাকায় নাকি দু’জন পুলিশ খুন হয়েছে। দাদী জেগে থাকলে জিজ্ঞেস করত এদের খুনি কারা? ভেবে অবাক হচ্ছে ময়না। মানুষ ভয় পায় জিন-ভুতদের। আর তারা ভয় পায় পুলিশদের। যাকে ভুতেরা পর্যন্ত ভয় পায় তাকে খুন করা কিভাবে সম্ভব? তাহলে কি সরকারের চেয়েও এই খুনিদের ক্ষমতা অনেক বেশি?
গভীর রাতে জিন-ভুতের বিচরণ থাকে অবাধ। ঘরের বাইরে তো বটেই এমনকি ভেতরে এসেও মানুষের উৎপাত করতে ছাড়ে না এরা। কিন্তু কি তাজ্জব ব্যাপার, এই চৌকিদার হুঁশিয়ার সাবধান বলে বলে মধ্যরাতে পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো গ্রাম! ভাবতেই অবাক লাগছে ময়নার। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও চোখের পাতা এক করতে পারছে না মোটেই। ময়নার ছটফটানিতে ঘুম ভেঙে গেল পাশে শুয়ে থাকা দাদীরও
- ও ময়না, ময়নারে। নড়াচড়া করতাছস কেরে?
- আমার ডর করতাছে খুব।
আতঙ্কিত হয়ে উঠে দাদী। ঘুমের জড়তা কাটিয়ে ধরমড়িয়ে ওঠে বসে চৌকির ওপর। তারপর নাতনীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিক কিছু না দেখে অভয় দিয়ে বলে
- আরে ডর কিয়ের, আমি তো আছি লগে।
- অই চৌকিদারের লাগি ডর লাগতাছে আমার। মাইজ রাইতে (মধ্যরাতে) একলা একলা গেরাম পর (পাহারা) দিয়া বেড়ায়। যদি জিন-ভুতে পায়?
কোনো জবাব বেরোলনা দাদীর মুখ থেকে। এক পশলা ভয় মেশানো বাতাসের ধাক্কায় ধপ করে শব্দ তুলল টিনের জানালার পাল্লায়। সেই সাথে ধপ করে কেঁপে উঠে দাদীর ভেতরটাও। পরক্ষণেই দূর থেকে অস্পষ্ট ভেসে আসে চৌকিদারের হাঁক, হুঁশিয়ার-সাবধান-খবরদার। সাথে সাথেই যেন হুঁশিয়ার হয়ে যায় দাদী। তারপর ময়নাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলে
- জিন-ভুতের চৌদ্দ গোষ্ঠীর সাধ্যি নাই যে চৌকিদারের কোনো ক্ষতি করে।
- ভুতেরা কি চৌকিদারগরে ডরায়?
- না ডরাইলে কি এত রাইত যাইগা এরা গেরাম পর দেয়? খালি এই চৌকিদারগরেই না, সরকারি পোশাক পরইন্যা (পরিহিত) হগল সান্ত্রী, সেপাই, পুলিশগরে তারা (জিন-ভুতেরা) ডরায়।
- ও আইচ্ছা, ভুতেরাও বুঝি সরকার আর সরকারি পোশাকরে মাইন্য কইরা চলে?
জবাবে ছোট্ট করে ‘হু’ বলে আবার শুয়ে পরে দাদী। ময়নাকেও বালিশের ওপর টেনে দিয়ে হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়। মিনিটখানেক পর চোখ জড়িয়ে আসায় থেমে যায় দাদীর সঞ্চালনরত হাত। কিন্তু তখনো কৌতূহল থামেনা ময়নার। জানার আরো বিষয় ছিল তার। মন্তাজ পুতু (চাচা) যে সেদিন বলল ঢাকায় নাকি দু’জন পুলিশ খুন হয়েছে। দাদী জেগে থাকলে জিজ্ঞেস করত এদের খুনি কারা? ভেবে অবাক হচ্ছে ময়না। মানুষ ভয় পায় জিন-ভুতদের। আর তারা ভয় পায় পুলিশদের। যাকে ভুতেরা পর্যন্ত ভয় পায় তাকে খুন করা কিভাবে সম্ভব? তাহলে কি সরকারের চেয়েও এই খুনিদের ক্ষমতা অনেক বেশি?
বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৯, ২০১০
কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসালো সখিনা বুবু
শুকনো খড়িকাঠের জ্বালানি পেয়ে উসকে উঠল চুলার আগুন। সেই সাথে উসকে উঠল চাচীর ক্রোধ। চুলার পাড়ে বসে থাকা জহুর চাচার দিকে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখল ময়না। নাহ, কোনোই বিকার নেই তার। মুখ নিচু করে সরিষাবাটা দিয়ে একের পর এক চিতই পিঠা খেয়েই চলছে। স্ত্রীর মনের ঝাঁজে বিচলিত হওয়া তো দুরের কথা, সরিষার ঝাঁজও কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না তার ওপর। অন্তত চেহারা দেখে তা-ই মনে হচ্ছে ময়নার কাছে। গনগনে আগুনের তাপে লাল হয়ে ওঠা মুখটি আরো লাল হতে লাগল চাচীর।
হাতে থালা নিয়ে চিতই পিঠা খেতে খেতে জহুর চাচাকে যতই দেখছে ততই অবাক হচ্ছে ময়না। চাচার এমন চুপচাপ বসে থাকাটা মোটেই ভালো লাগছে না তার। আজ হঠাৎ কী হলো যে বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে! বাড়ির সবাই তো ঠিকঠাকই আছ্ েকেউ মারা যায়নি। তা হলে কেনই বা সকালে কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসালো সখিনা বুবু! বুবুর কান্না দেখে বড়ই কষ্ট পেয়েছিল স্ েতা হলে কি মেয়ে কেঁদেছির বলেই জহুর চাচা কষ্ট পেয়েছে? ভেবে কোনো কিনারা করতে পারল না ময়না।
- আরেকটা পিডা(পিঠা) দেও সখিনার মা
- অর্ধসেদ্ধ একটা চিতই পিঠা বিপুল বিক্রমে তুলে দিতে দিতে ঝামটা দিয়ে উঠল চাচী
- খাও। খাওয়া ছাড়া আর কিছুতো পারবা না। কত কইরে কইলাম মাইয়াডারে গার্মেন্ট সে পড়ানোর কাম নাই। ঢাকা শহরে অহন বখাটে পোলারা বেসুমার ঘটনা ঘটাইতাছে।
কোনো কথা বলল না জহুর চাচা। অর্ধসেদ্ধ চিতই পিঠাটি আবার খোলায় রেখে অপেক্ষায় থাকল পূর্ণসেদ্ধ হওয়ার। উত্তর না পেয়ে এবার যেন ক্রোধে ফেটে পড়তে চাইল চাচী। হাতের ছেনিটা খসে পড়ে টুং করে শব্দ তুলল খোলার ওপর। এ শব্দ-ই ধ্যান ভাঙাল চাচার। তারপর যেন স্থির শিলাখন্ড ফেটে বজ্রের আওয়াজ বেরিয়ে এলো....
- আল্লাগো তুমি এই আমার উপরে জুলুম নাজিল করলা কেরে? আমি কী পাপ করছিলাম, আমার মাইয়া কী অন্যায় করেছিল? শিক্ষিত অইয়াও এই কাম কেমনে করল পোলাডা! আগে হুনতাম, ইস্কুল-কলেজে পড়লেই নাকি মানুষ অওয়ন (হওয়া) যায়। ময়নাও শুনেছে শিক্ষাই নাকি মানুষকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলে। কিন্তু সখিনা বুবুর কান্নার সাথে তো এ কথার কোনো মিলই খুঁজে পাচ্ছে না ময়না। দেশেতো এখন অনেক লোকই পড়াশোনা করছে। তা হলে মানুষের এত অভাব কেন? ব্যাপারটা স্পষ্ট হওয়ার জন্য জহুর চাচার কথায় আরো মনযোগী হতে চেষ্টা করল ময়না। কিন্তু ততক্ষণে আবার উদাস হয়ে গেল চাচা। আর শুন্যে ঘুরপাক খেতে থাকা চাচীর চোখ থেকে এক ফে৭াটা পানি গড়িয়ে পড়ল চুলায় বসানো গরম খোলার ওপর। তারপর ময়নার চোখের সামনেই বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে লাগল চিতই পিঠা পোড়ার ধোঁয়ার সাথে।
হাতে থালা নিয়ে চিতই পিঠা খেতে খেতে জহুর চাচাকে যতই দেখছে ততই অবাক হচ্ছে ময়না। চাচার এমন চুপচাপ বসে থাকাটা মোটেই ভালো লাগছে না তার। আজ হঠাৎ কী হলো যে বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে! বাড়ির সবাই তো ঠিকঠাকই আছ্ েকেউ মারা যায়নি। তা হলে কেনই বা সকালে কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসালো সখিনা বুবু! বুবুর কান্না দেখে বড়ই কষ্ট পেয়েছিল স্ েতা হলে কি মেয়ে কেঁদেছির বলেই জহুর চাচা কষ্ট পেয়েছে? ভেবে কোনো কিনারা করতে পারল না ময়না।
- আরেকটা পিডা(পিঠা) দেও সখিনার মা
- অর্ধসেদ্ধ একটা চিতই পিঠা বিপুল বিক্রমে তুলে দিতে দিতে ঝামটা দিয়ে উঠল চাচী
- খাও। খাওয়া ছাড়া আর কিছুতো পারবা না। কত কইরে কইলাম মাইয়াডারে গার্মেন্ট সে পড়ানোর কাম নাই। ঢাকা শহরে অহন বখাটে পোলারা বেসুমার ঘটনা ঘটাইতাছে।
কোনো কথা বলল না জহুর চাচা। অর্ধসেদ্ধ চিতই পিঠাটি আবার খোলায় রেখে অপেক্ষায় থাকল পূর্ণসেদ্ধ হওয়ার। উত্তর না পেয়ে এবার যেন ক্রোধে ফেটে পড়তে চাইল চাচী। হাতের ছেনিটা খসে পড়ে টুং করে শব্দ তুলল খোলার ওপর। এ শব্দ-ই ধ্যান ভাঙাল চাচার। তারপর যেন স্থির শিলাখন্ড ফেটে বজ্রের আওয়াজ বেরিয়ে এলো....
- আল্লাগো তুমি এই আমার উপরে জুলুম নাজিল করলা কেরে? আমি কী পাপ করছিলাম, আমার মাইয়া কী অন্যায় করেছিল? শিক্ষিত অইয়াও এই কাম কেমনে করল পোলাডা! আগে হুনতাম, ইস্কুল-কলেজে পড়লেই নাকি মানুষ অওয়ন (হওয়া) যায়। ময়নাও শুনেছে শিক্ষাই নাকি মানুষকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলে। কিন্তু সখিনা বুবুর কান্নার সাথে তো এ কথার কোনো মিলই খুঁজে পাচ্ছে না ময়না। দেশেতো এখন অনেক লোকই পড়াশোনা করছে। তা হলে মানুষের এত অভাব কেন? ব্যাপারটা স্পষ্ট হওয়ার জন্য জহুর চাচার কথায় আরো মনযোগী হতে চেষ্টা করল ময়না। কিন্তু ততক্ষণে আবার উদাস হয়ে গেল চাচা। আর শুন্যে ঘুরপাক খেতে থাকা চাচীর চোখ থেকে এক ফে৭াটা পানি গড়িয়ে পড়ল চুলায় বসানো গরম খোলার ওপর। তারপর ময়নার চোখের সামনেই বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে লাগল চিতই পিঠা পোড়ার ধোঁয়ার সাথে।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
