শনিবার, মে ২৮, ২০১১

ইশকুল পালিয়ে


‘আজকালকার কিশোরদের ওপর পড়া লেখার যে চাপ, তা অনেকটা রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার মতো’
ওমা, এমন কথা আবার কে বললো?
নিশ্চয়ই মহা ফাঁকিবাজ ধরনের কেউ হবে। পড়ালেখার চাপ আর রিমান্ড কি এক জিনিস হলো?
পড়ালেখাতো তুমিও করছো। তুমি কি রিমান্ডে আছো বলে মনে হয়?
কই নাতো দিব্যি স্বাধীন-ই আছো। সকালে আম্মুর ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠছো। তারপর তড়িঘড়ি করে প্রাত কাজ সারছো, নাস্তা করছো এবং আম্মু কিংবা আব্বুর সাথে ইশকুলে যাচ্ছো। কাস শেষে আবার ঠিক ঠিকই বাসায় ফিরে আসছো। তারপর কয়েকজন টিচার আসছেন তোমাকে পড়াতে। ব্যস, এভাবেইতো দিন কেটে যাচ্ছে। একে কি রিমান্ড বলা যায়?
কে সেই বোকা লোকটা, যে কিনা এমন কথা বললো?
উহু, সেই লোকটা কিন্তু মোটেও বোকা নন। তাঁর নাম রকিব হাসান।
তিন গোয়েন্দা সিরিজের লেখক?
হ্যা, রকিব হাসান বলতে তো তাকেই বোঝায়।
এই সেরেছে রে। তাহলেতো বিশ্বাস না করে উপায় নেই। তিনিতো আর মিথ্যে বলার লোক নন। তাছাড়া কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ডের মতো বিচ্ছুরা যার কলমের ইশারায় উঠবস করে, তাকে আর যাই হোক বোকা বলা যাবে না।
রকিব হাসানের কাছে তোমাদের এই অতিপড়াপড়ির রুটিনটা রীতিমত রিমান্ডের মতোই মনে হয়। এই যে আম্মুর ডাকে ঘুম থেকে উঠছো, ইশকুলে যাচ্ছো, টিউটরের কাছে পড়ছো এসবকেই তিনি রিমান্ড বলেছেন। অর্থাৎ তোমাদের জীবনে এখন পড়া লেখার রিমান্ড চলছে আরকি। এবার নিশ্চয়ই ভাবছো, রকিব হাসানের কাছে হয়তো ইশকুল মানেই ছিলো আতঙ্ক? মোটেই তা নয়। তার কাছে ইশকুল ছিলো স্বপ্ন, আনন্দ আর যত দূরন্তপনার স্বর্গরাজ্য। সেইসময়ের ইশকুলগুলো এখনকার মতো ছিলো না। তোমরাতো পড়াপড়ির চাপে না সময় পাও খেলতে যেতে, না পারো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে। তখনকার ইশকুল যদি এমন হতো, তবে হয়তো কিশোর রকিব হাসানের পড়ালেখাই করা হতো না। তাইতো এই বয়সে এসে পড়ালেখার রিমান্ডবন্দি তোমাদের জন্য বড় মায়া হয় তার। তোমরা কি এখন ইচ্ছে করলেই বেরোতে পারবে ডোংরা গাছের পাতার ভেতর টুনটুনির বাসা খোঁজার অভিযানে? একদমই পারবে না। এবার হয়তো মানবে যে, তোমাদের এখনকার অতিপড়াপড়িকে রিমান্ডের সাথে তুলনা করে ভুল করেন নি রকিব হাসান। শুনলে লোভ হতে পারে- রকিব হাসানদের ইশকুলবেলাটা ছিলো স্বপ্নের মতো। তিনি কেবল টুনটুনির বাসা-ই খুঁজেছেন এমন নয়, রীতিমত গুলতি নিয়ে পাখি শিকারেও বেড়িয়েছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছেন ডুব সাাঁতার দিয়ে। তাই বলে আবার ভেবো না, রোজ রোজ ইশকুল পালিয়ে কেবল হইরই করে বেড়াতেন। ইশকুল পালানোর রেকর্ড বলতে গেলে তার একদমই নাই। গুটিকয়েক যাও আছে তাও পড়ালেখার ভয়ে নয়। ইশকুলের পড়া তার কাছে কোন ব্যপারই ছিলো না। কারণ বছরের শুরুতে নতুন বই পাওয়ার পর পরই প্রায় সব পড়া শেষ হয়ে যেতো। তাই পিটুনির ভয়ে ইশকুল পালানোর প্রশ্নই উঠে না। তবে হ্যা, ইশকুল থেকে জানালা দিয়ে পালিয়ে আসার একটি ঘটনা আছে বটে- একবার কাসে বসেই তিনি খবর পেলেন বিরাট বিরাট গামলা ভরে মিষ্টি আসছে ইশকুলে। কি যেন কি উপলক্ষ্যে তাদেরকে মিষ্টি খাওয়ানো হবে। খবর শুনেতো কাসে শুরু হয়ে গেলো প্রচন্ড হট্টগোল। টেবিল চাপড়ানো, জোরে-জোরে কথা বলা, চেঁচানো ইত্যাদি আরকি। কিছুক্ষন পর ঠিকই দেখা গেল দফতরি মিষ্টি নিয়ে চলে এসেছে। সবাইকে বলল, যার যার খাতা থেকে একটা করে পাতা ছিঁড়ে নিতে। ফড়াত ফড়াত পাতা ছিঁড়তে লাগলো সবাই। কিন্তু রকিব হাসানের আর তর সইছিলো না। কিসের আবার ছেঁড়াছেড়ি, হাতে নিয়েই খেয়ে ফেলা যায়। আম্মাতো আর কাসে নেই যে হাত ময়লা কি না দেখতে আসবে। শুরু হলো মিষ্টি বিতরণ। সাথে করে একটা পিরিচ আর ছুরি নিয়ে এসেছে দফতরি। পিরিেিচ একটি করে রসগোল্লা তুলে রাখে, ছুরি দিয়ে কেটে দুই ভাগ করে, তারপর অর্ধেকটা রসগোল্লা আলগোছে তুলে এনে ফেলে দেয় ছেলেদের বাড়িয়ে দেয়া কাগজে। এই অর্ধেকটা করে রসগোল্লা বিতরণ করছে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো রকিব হাসানের। তাকে যখন দিতে এলো, সাফ মানা করে দিলেন, খাবেন না।
হয়তো ভাবছো মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ির সাথে আবার ইশকুল পালানোর সম্পর্ক কী? হ্যা সম্পর্কতো একটা আছেই। তাহলে পরের ঘটনা শোন- মিষ্টি খাওয়ার হইচইতো শেষ হলো। কিছুক্ষন পর পাশের ঘরে আবার শুরু হলো হট্টগােল। কী ব্যাপার? একটি ছেলে বলল, ‘আবার মিষ্টি নাকি?’। হলেও হতে পারে। তখন কম হয়ে গিয়েছিলো বলে আবার এনেছে। পরক্ষনেই গলা ফাটিয়ে চেঁচানোর শব্দ পেলেন। ঘটনা কী? কিছুক্ষন পরই খবর এলো ইশকুলের সব ছাত্রদেরকে কলেরার ইনজেকশন দেয়া হবে। এই ছিল তবে মিষ্টি খাওয়ানোর পেছনের কারণ! যথারীতি ভারিক্কি চালে কাসরুমে ঢোকল মেডিকেল টিম। ঢোকেই দরজা বন্ধ করে দিলো। প্রথম বেঞ্চের প্রথম ছেলেটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো তারা। গাঁইগুঁই করতে লাগল ছেলেটি। কিন্তু এতে কোন কানই দিলোনা ওরা। চামড়ায় সুচ ঠেকতেই আঁউ করে উঠল ছেলেটা। তারপর ভ্য্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। সিরিয়ালে দুই নম্বর ছেলেটাকে ধরতে যেতেই সে ঢুকে গেল বেঞ্চের তলায়।
এসব দেখে কি আর স্থির থাকা যায়? তার বুকেও তখন কাঁপুনি ওঠেছে। স্যার তাদেরকে অভয় দেয়ার জন্য বার বার বলছিলেন ‘কিছু না, কিছু না, পিঁপড়ের কামড়। টেরই পাবে না।’ কথার সত্যতা প্রমাণ করার জন্য নিজেই শার্টের হাতা গুটিয়ে এগিয়ে গেলেন ইনজেকশন নিতে। সুচ ফোটানোর সাথে সাথে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তাঁর চেহারা বিকৃত করে ফেলার ভঙ্গি দেখেই সবাই আন্দাজ করে ফেলেছিলো, পিঁপড়ের কামড়টা বড় শক্ত কামড়।
ভয়টা আরো বেড়ে গেল তার। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, তিনি যেখানে বসে আছেন এর পাশের জানালাতে শিক নেই। জানালাটা অনেক বড় হলেও বেশ উঁচুতে। ওটা ডিঙাতে হলে বেঞ্চের ওপর উঠতে হবে। স্যার দেখে ফেলতে পারেন। সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার যেটি তা হলো, ওখান থেকে নিচে লাফিযে নামা। জানালার ঠিক নিচে রয়েছে একটি চওড়া ড্রেন। আর কাঁটাঝোপে ভরা। তবুও সেটা ইনজেকশনের চেয়ে ভালো মনে হলো। হঠাৎ তিনি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়ালেন। একলাফে জানালায় উঠে যা থাকে কপালে ভেবে দিলেন লাফ। নর্দমা ডিঙিয়ে পড়লেন ওপাশে। কাঁটার আঁচড় লাগল দু-এক জায়গায়। তবুও দিলেন ঝেড়ে দৌড়। বইখাতা সব কাসেই ফেলে এসেছেন। জানেন, এগুলো হারাবে না। দফতরি হয়তো অফিসঘরে রেখে দেবে।
এই হলো রকিব হাসানের ইশকুল পালানোর গল্প। আর যেদিন তিনি স্থির করতেন ইশকুলে যাবেন না, ব্যাস জোর করেও কেউ তাকে পাঠাতে পারতো না। কারণ সবাই জানতো একগুঁয়ে এ ছেলের ওপর জোর খাটবে না। ইশকুলে না গিয়ে কি করতেন সে সময়টুকু? চলে যেতেন পুকুরে মাছ ধরতে কিংবা টই টই করে ঘুরে বেড়াতে।
এতক্ষনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে, তিনি টই টই করে ঘুরে বেড়িয়েছেন, মাছ ধরেছেন, গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করেছেন সবই মানলাম। তবে গোয়েন্দাগিরি করেছেন কখন?
খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন। যেহেতু তিনি তিনগোয়েন্দা সিরিজের লেখক, সেহেতো তার কিশোরবেলাটা গোয়েন্দাদের পালের গোদা হিসাবে কেটেছে এমন ধারণা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর নিশ্চয়ই বেশ কয়েকজন চৌকষ চেলাপেলা তাকে ছায়ার মতো অনুকরণ করতো। সবার কাজ ছিলো কোথায় কার মুরগি চুরি গেছে, কবে কার ছাগল হারিয়ে ফেলেছে ইত্যাদি নানান ঘটনার খোঁজখবর রাখা। আবার নিজেদের তাগিদেই রহস্য উদঘাটনে আদাজল খেয়ে লাগতো সবাই। রকিব হাসানের নামের সাথে এমন ধরনের কল্পনাইতো মানানসই, তাই না?
হ্যা, তাই। তিনিও গোয়েন্দা ছিলেন। তবে মনে মনে গোয়েন্দা আরকি। দস্যু বাহরাম, শার্লক হোমস এগুলো নিয়মিত পড়তেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অনেকটা নিঃসঙ্গ। তাই কিশোরগোয়েন্দা দল গঠন করাও তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য এমন কোন ইচ্ছেও ছিলো না তার।
কি সাঙ্ঘাতিক কথারে বাবা, ছোটবেলায় গোয়েন্দাগিরি করার সামান্যতম অভিজ্ঞতা নেই, অথচ বড় হয়ে কিনা লিখে ফেললেন গাদাগাদা রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা কাহিনী!
এতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। সব শিক্ষার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়না। বই পড়ে পড়ে পৃথিবী ঘুরে আসা যায়। কাজেই তিনিও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বই পড়ে। তাকে বাস্তবে গোয়েন্দাগিরি করে গোয়েন্দাসিরিজ লিখতে হয়নি।
রকি বীচের লোহালক্করের জঞ্জালের ভেতর থাকে গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর পাশা। বাংলাদেশী বংশো™ভ’ত। ুদ্র জিনিসও বুদ্ধিদীপ্ত এ ছেলেটির দৃষ্টি এড়ায় না। যে জিনিস একবার দেখে সেটা মনে থাকে দীর্ঘদিন। তার মুদ্রাদোষ হলো গভীর চিন্তামগ্ন থাকলে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটা। গোয়েন্দা সিরিজের দ্বিতীয় চরিত্র মুসা আমান। তাকে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, লনের ঘাস ছাটা এসব কাজ প্রায়ই করতে হয়। শত্রুর পেটে আঘাত করতে তার জুড়ি নেই। তার মুদ্রাদোষ হলো কথায় কথায় ‘খাইছে’ কিংবা ‘ইয়াল্লা’ বলা। ভ’তে তার যত ভয়। তবে বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে সাহসী হয়ে উঠে মুসা। আর তিন গোয়েন্দার নথি গবেষক হিসেবে পরিচিত রবিন মিলফোর্ড। আয়ারল্যান্ডের বংশোদ্ভোত। তার কাজ হচ্ছে তিন গোয়েন্দার সকল কেসের রেকর্ড ব্যখ্যা বা নথি সংরক্ষণ করা। সে তিন গোয়েন্দার সবার মধ্যে সবচেয়ে কেতাদুরস্ত।
এ তিনটি চরিত্রের রোমাঞ্চকর গোয়েন্দাগিরিই তার লেখার উপজীব্য। এ তিনটি চরিত্রকে অনুসরণ করে তোমাদের মতো অনেকেই গোয়েন্দা দল গঠন করে ফেলেছে। কেউ হাতে অস্ত্র নিয়ে গোপন আস্তানাও গড়েছে। দূর্ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য এলাকার মুরব্বিদের ফুসলিয়েছে এমন কিশোরেরও অভাব নেই। কেউ কেউ আবার শখের গোয়েন্দা হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতো। আবার অনেকেই প্রচন্ড আবেগ নিয়ে রহস্যের জট খোলার নতুন কৌশল শেখার আশায় দেখা করেছে স্বয়ং রকিব হাসানের সাথেও। তারপর তিনি ওদেরকে কি উপদেশ দিয়েছেন জানো?
তিনি বলেছেন ‘কল্পনাকে সবসময় বাস্তবের সাথে মেলাতে নেই।’

শুক্রবার, মে ২৭, ২০১১

পাতায় পাতায় গাঁথা


পাতার দ্বীপের পাতার খবর দুধ সাগরে দুলছে
দোদুল দুলে হাওয়ায় ভেসে জনে জনে তুলছে-

হাসলে পাতা মুক্তো ঝরে
কাঁদলে ঝরে পাতা
পাতার দ্বীপের কান্নাগুলো
পাতায় পাতায় গাঁথা।

কেন কেন কাঁদবে কেন
দ্বীপের রাণি পাতা!
এমন খবর মিথ্যে খবর
ধ্যত্তেরি ছাই ছাতা।

মিথ্যেনাগো মিথ্যেনাগো
মিথ্যে নয় এক রত্তি,
পাতারাণি ভীষণ একা
সত্যি খবর সত্যি।

নাম রাখা যাক পাতা



যে মেয়েটি পাতার ঘরে
পাতায় পাতায় ঘুমোয়
চোখের পাতা এক করে যে
চাঁদের চুমোয় চুমোয়।

সেই মেয়েটির নাম যেন কী?
তেপান্তরের কেউ জানে না
হয়তো বুঝি সেও জানে না।
নাম ছাড়া সে যায় না ডাকা
যায়না মনের ছবি আঁকা
তাই মেয়েটার নাম রাখা যাক
পাতা।

সেই মেয়েটির ধাম জেনেছি।
দূর কোথাও অচীনপুরে
যেখানটাতে স্বপ্ন ঘুরে
দুধ সাদা এক সাগর তীরে
পাতার দ্বীপে পাতার ভীড়ে
পাতাই হলো সেই মেয়েটির
ছাতা।

বুধবার, এপ্রিল ২০, ২০১১

দুইখানা গাভী লইয়া রাজনৈতিক রঙ্গ


ধরা যাক আপনি দু’টি গাভীর মালিক। এ দু’টি গাভীর পরিণতি কোথায় কেমন হবে তা নিয়েই রাজনৈতিক রঙ্গ

ডেমোক্রেট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। নিজের জন্য একটি রেখে অপরটি প্রতিবেশীকে দিয়ে দিন।

সোসাইলিস্ট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এর মধ্যে একটিকে সরকার নিয়ে নেবে এবং আপনার প্রতিবেশীকে দিয়ে দেবে।

আমেরিকান রিপাবলিকান
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। আর আপনার প্রতিবেশীর কোন গাভীই নেই। তাতে কী আসে যায়?

কমিউনিস্ট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সরকার দুটোর মালিকানা নিযে নেবে এবং আপনাকে দুধ সরবরাহ করবে।

ফ্যাসিস্ট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সরকার দুটোকেই ক্রোক করে আপনার কাছেই দুধ বিক্রি করবে। আর আপনি গোপন আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়ে ধ্বংসাত্বক প্রচারণা শুরু করবেন।

ডেমোক্রেসি (আমেরিকান স্টাইল)
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। একটি গাভীর মালিক এমন ভিনদেশী কারো সাহায্যার্থে সরকার আপনার কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করবে। যার ধকল সইতে না পেরে দুটো গাভীই বিক্রি করতে বাধ্য হবেন। উল্লেখ্য, ভীনদেশীর আগের গাভীটি ছিলো আপনার সরকারেরই উপহার

পুঁজিবাদ (আমেরিকান স্টাইল)
আপনার দু’টি গাভী রয়েছ্ েএকটি বিক্রি করে একটি ষাঁঢ় কিনেন এবং গরুর পাল তৈরি করেন।

ব্যুরোক্রেসী (আমেরিকান স্টাইল)
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সরকার দুটোকেই নিয়ে নেবে, একটিকে লাথি দেবে, অপরটির দুধ দোহন করবে এবং আপনাকে দুধের দাম পরিশোধ করতে হবে। তারপর সমস্ত দুধ ড্রেনে ফেলে দেবে।

আমেরিকান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। একটিকে বিক্রি করে অন্যটিকে চারটি গরুর সমান দুধ দেয়ার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন করে তুলুন। আপনি তখনি অবাক হবেন, যখন গাভীটি মারা যাবে।

ফ্রান্স করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। আরো একটি গাভীর মালিকানার দাবিতে আপনি ধর্মঘটে যান।

জাপানিজ করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এদেরকে এমনভাবে তৈরি করুন, যেন সাধারণ গরুর দশভাগের একভাগ আকার হয়েও দৈনিক বিশবার দুধ দেয়। তারপর চালাক চতুর গাভীর কার্টুন ইমেজ তৈরি করে বিশ্বের বাজারে ছেড়ে দিন।

জার্মান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এদেরকে এমনভাবে তৈরি করেন, যেন গাভী দুটি ১০০বছর বাঁচে, মাসে একবার খায়, তাও নিজের দুধ।

ব্রিটিশ করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এরা পাগল, এরা মৃত। এখন এদের জন্য কেবল অনুগ্রহ প্রয়োজন

ইতালিয়ান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। কিন্তু জানেন না এরা এখন কোথায় আছে। এদেরকে খোঁজে বের করার আগে দুপুরের খাবারের বিরতি নিন।

রাশিয়ান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সত্যিই গাভীর সংখ্যা দুই কিনা তা গুনে দেখুন। প্রথমবার গোনার পর দেখলেন গাভীর সংখ্যা দুইটি নয় পাঁচটি। আবার গুনুন। এবার দেখলেন পাঁচটি থেকে গাভীর সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৪২টিতে। ধৈর্য্য হারাবেন না। আবার চেস্টা চালান। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এবার সংখ্যাটা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ১২টিতে। অবশেষে ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙ্গে গেল আপনার। গাভী গোনা বন্ধ করে আরেক বোতল ভদকার ছিপি খুলুন।

সুইস করপোরেশন
আপনার দু’টি নয় ৫০০০ গাভী রয়েছে। কিন্তু এগুলো আয়ত্ত্বের বাইরে। তাই অন্যদেরকে গাভীগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিন।

ব্রাজিলিয়ান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। আমেরিকান করপোরেশনের সাথে পার্টনারশীপে আসুন। দ্রুত আপনি ১০০০ গাভীর মালিক হয়ে যাবেন এবং একসময় আমেরিকান করপোরেশন কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হবেন।

ভারতীয় করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। দুটোকেই পরম ভক্তিতে পূজা করুন।

চাইনিজ করপোরেশন
আপনার গাভী রয়েছে মাত্র দু’টি, আর দুধ দোহনের জন্য লোক রয়েছে ৩০০ জন। সবাইকে আরো বেশি দুধ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করুন। এ লোকগুলোর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হবে প্রোডাকশন বৃদ্ধির দিকে। আর এসব নিয়ে যে সাংবাদিক রিপোর্ট করবে, তাকে গ্রেফতার করুন।

ইসরাইলি করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। গাভী দু’টি আপনার ওপর নির্ভরশীল নয়। এরা নিজেরাই একটি দুধের কারখানা, একটি আইসক্রীম স্টোর খুলে বসলো। তারপর নিজেদের চলচ্চিত্র স্বত্ব বিক্রী করল। আর এদের বাছুরকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পাঠাল এমফিল করার জন্য।
সেখানে আপনার প্রয়োজন আর কতটুকু?

শনিবার, এপ্রিল ০২, ২০১১

রঙ্গব্যঙ্গ পাঁচফোড়ন

আইডিয়াবাজ সম্পাদিত রঙ্গব্যঙ্গ পাঁচফোড়ন এর মোড়ক উন্মোচন।
উন্মোচন করছেন- আনিসুল হক ও আহসান হাবীব। পাশে সোহেল অটল ও তারেক ফিরোজসহ অন্যরা। আর ক্যামেরার আড়ালে আমিতো আছিই।
তারিখ- ২৪ ফেব্রুয়ারি'২০১১
স্থান- একুশে বইমেলা

শুক্রবার, মার্চ ০৪, ২০১১

গোঁফ বিভ্রাট


শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
গোফরান সাহেব। কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। আপাদমস্তক ভদ্রলোক। অবশ্য তিনি ভদ্র কী অভদ্র সে বিষয়ে আপাতত না গেলেও চলে। কারণ অফিসের সবাই এখন গোফরান সাহেবের গোঁফ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। গোঁফ, সে তো যেকোনো পুরুষেরই থাকে। এ নিয়ে আবার ব্যস্ত হওয়ার কী আছে? হ্যাঁ, ব্যাপার একটা আছে বটেÑ
তবে ব্যাপারটাতে ঢোকার আগে গোঁফ বিষয়ে সবার একটা সাধারণ ধারণা থাকা প্রয়োজন। উইকিপিডিয়া বাংলায় গোঁফের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে ‘গোঁফ বা মোচ হলো ওষ্ঠের ওপরে গজানো চুল। সাধারণত কারো গোঁফ আছে বলা হলে মনে করা হয় তার ওষ্ঠের ওপরের অংশটুকুতেই তা সীমাবদ্ধ আছে, কারণ গাল ও থুতনির অন্যান্য অংশে গজানো চুলকে দাড়ি বলা হয়। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের গোঁফ ওঠা শুরু হয়। নিওলিথিক যুগ থেকেই পাথরের ুর দিয়ে ৗেরি করার চল শুরু হয়, আর এই সুদীর্ঘকালের ব্যবধানে গোঁফের নানারকম ফ্যাশন চালু হয়েছে। যারা গোঁফ রাখে তারা নিয়মিত ছেঁটে ও আঁচডে রীতিমতো এর যতœ করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীর্ঘ ও সযতেœ রতি গোঁফের প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। বিশ্ব দাড়ি ও গোঁফ চ্যাম্পিয়নশিপে ছয়টি উপবিভাগে গোঁফের বিভাজন করা হয়। গোঁফের এমন কদর দেখেই হয়তো বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ননসেন্স ছড়াকার সুকুমার রায় বলেছিলেন : ‘গোঁফকে বলে তোমার আমারÑ গোঁফ কি কারো কেনা?/গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’
উইকিপিডিয়ার বর্ণনা এতটুকুই। সেখানে গোফরান সাহেবের গোঁফের কথা উল্লেখ না থাকলেও সুকুমার রায়ের কবিতার একটি উদ্ধৃতি রয়েছে। হেড অফিসের এক বড়বাবু এ কবিতাটির নায়কের ভূমিকায়। আর আমাদের নায়ক গোফরান সাহেব। সুকুমার রায়ের নায়ক আর আমাদের নায়কের মাঝে পার্থক্য এতটুকু যে, বড়বাবুর সামান্য একটু মাথার ব্যামো থাকলেও এমনিতে বেশ শান্ত স্বভাবেরই। আর গোফরান সাহেবের মাথায় কোনো রকমের ব্যামোট্যামো নেই। কিন্তু তাকে কিঞ্চিত অস্থির স্বভাবের বলা চলে। আরো একটি সাঙ্ঘাতিক ধরনের পার্থক্য রয়েছেÑ একদিন কাউকে না বলে, না কয়েই বড়বাবু আন্দাজ করে বসলেন, তার গোঁফজোড়া বুঝি হারানো গেল, ‘ব্যস্ত সবাই এদিক-ওদিক করছে ঘোরাঘুরি.../বাবু হাঁকেন, ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি!/ গোঁফ হারানো! আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি?/ গোঁফ জোড়া তো তেমনি আছে, কমেনি এক রত্তি/সবাই তারে বুঝিয়ে বলে, সামনে ধরে আয়না।/ মোটেও গোঁফ হয়নি চুরি, কখনো তা হয় না।’ কিন্তু গোফরান সাহেবের গোঁফ কখনো চুরি গিয়েছিল বলে আজ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ মেলেনি। চুরি করা তো দূরের কথা তার ভোলা-ভালা পাতলা গোঁফগুলোতে হাত দেয়ার সাহস পর্যন্ত কেউ রাখে না। পাতলা বলতে একেবারে পাতলা নয়। সামান্য চারা-চারা আর ছাড়া ছাড়া আরকি। উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী এগুলোকে নিঃসন্দেহে গোঁফ বলে স্বীকৃতি দেয়া যায়।
এ তো গেলো গোঁফের কথা। কিন্তু তার দাড়ির রকমটা কী? সে বিষয়েও ধারণা নিয়ে নেয়া জরুরি। হ্যাঁ, পাতলা-টাতলা গোঁফের পাশাপাশি হালকা-সালকা কিছু দাড়িও রয়েছে তার। একবার সময় করে বসলে গুণে ফেলা যাবে সবগুলো। গোফরান সাহেব নিজে বেশ কয়েকবার দাড়ি শুমারিতে মনোনিবেশ করেছিলেন। চুলের জুলফি থেকে গালের নরম অংশটুকু পর্যন্ত সফলভাবেই গুণে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু থুতনির দিকে এসেই সব গোলমেলে হয়ে গেলো। ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’ এ মন্ত্রের শিক্ষা ছোটবেলায়ই পেয়েছিলেন তিনি। তাই জানার অদম্য বাসনায় শতবার পেরিয়ে হাজারবার পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। কিন্তু দাড়ি শুমারির কাজটা শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বার বারই থুতনিতে এসে হিসাব লণ্ডভণ্ড। একজন মানুষের ধৈর্য্য বলতেও তো একটা কথা আছে। একদিন ঠুস করেই তার ধৈর্য্যরে বাঁধটা ভেঙে গেল। সব কিছু ভাঙলে যেমন কম্পন তৈরি হয়, তারপর সেই কম্পন শব্দ হয়ে আঘাত করে মানুষের কানে, গোফরান সাহেবের বেলায়ও তেমনটি ঘটল। অর্থাৎ তার অন্তরের অন্তঃস্থলে একটি মারাত্মক ধরনের কম্পন তৈরি হলো। আর সে কম্পনের বহিঃপ্রকাশ ঘটল মুখে-চোখে। এমনকি ঠোঁটেও। তবে এই কম্পন সেই কম্পন নয়। কম্পনের চোটে তার লজ্জারাঙা মুখে মিষ্টি ধরনের ভাব ফুটে উঠল। সেই সাথে ঠোঁটের ফোকর ভেদ করে ‘হিস হিস’ ধরনের হাসির শব্দও বেরিয়ে এলো।
দেখ দেখি কী কাণ্ড! দাড়ি শুমারিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার হাসতে যাবেন কেন? এই কেনর জবাবটা যে কি তার সবটুকু বলা যাবে না। সে এক লম্বা ইতিহাস। তবে এ হাসির গোপন রহস্য সম্পর্কে অল্প-স্বল্প ধারণা দেয়া যেতে পারে মাত্র। সেদিনের সেই ঘটনার কথাটাই ধরা যাকÑ
অফিসের ক্যান্টিনে রোজকার মতো খেতে বসেছিলেন গোফরান সাহেব। হঠাৎই আবিষ্কার করলেন তিনি কোনোভাবেই ডালে চুমুক দিতে পারছেন না। যতবারই চেষ্টা করছেন ততবারই গোঁফজোড়া ভিজে যাচ্ছে। এমন ফ্যাঁসাদে জীবনে পড়েননি। রবীন্দ্রনাথ তাহলে ডাল খেতেন কিভাবে? নাকি ডাল খাওয়ার জন্য গোঁফওয়ালাদের বিশেষ কোনো পদ্ধতি রয়েছে? একজন নতুন গোঁফওয়ালা হিসেবে এসব প্রশ্নের জবাব গোফরান সাহেবের না জানারই কথা। কিন্তু এর আগেও তো তিনি ডালে চুমুক দিয়েছেন, এমন তো কখনো হয়নি! তাহলে কি ধরে নেয়া যায় আগের চেয়ে গোঁফজোড়া আরো বড় হয়ে গেছে? হলেও হতে পারে, কমপক্ষে পনের দিন তো হবেই তিনি ডাল স্পর্শ করেননি। এবার খুশি হয়ে উঠলেন গোফরান সাহেব। যাক বাবা, ছাড়াছাড়া গোঁফগুলো এবার তাহলে বাড়তে শুরু করেছে। ইচ্ছা থাকলেই যে উপায় হয় এটা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
বিপুল বিক্রমে ডালে চুমুক দিতে লাগলেন তিনি। ফুড়–ৎ-ফাড়–ৎ শব্দে ক্যান্টিন মুখরিত। অনেকটা নিজের ইচ্ছেতেই ঘনঘন গোঁফজোড়া চুবাচ্ছেন। যার গোঁফ আছে সেই তো গোঁফ নিয়ে যেমন খুশি তেমন খেলতে পারে। যার নেই তার পক্ষে তো আর সম্ভব নয়। কাজেই নগদ যা পাও তা উপভোগ করে নাও। ডালে গোঁফ চুবানোতে যে এত আনন্দ এর আগে চিন্তাও করতে পারেননি তিনি। বড্ড মায়া হলো গোঁফহীনদের জন্য। একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন ক্যান্টিনজুড়ে। তিনি ছাড়া আর কারো নাকের নিচে কিচ্ছুটি নেই। গোঁফ না রাখলে সে আবার কিসের পুরুষ মানুষ! তা ছাড়া গোঁফ চুবানো ডালের স্বাদ যে বুঝেনি তার জীবনের চৌদ্দ আনাই মিছা। তাও আবার যেনতেন গোঁফ নয়, সার-গোবর দিয়ে বড় করে তোলা গোফরান সাহেবের নিজের গোঁফ!
আহ। কী তৃপ্তিরে বাবা। হাত ধুয়ে পরপর দুইবার ঢেঁকুর তুললেন গোফরান সাহেব। তারপর ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলেন বিল পরিশোধ করতে। বিল হলো সর্বমোট তেত্রিশ টাকা। তিনি পকেট থেকে একটি কড়কড়ে পঞ্চাশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন ম্যানেজারের দিকে। যথারীতি বিল রেখে একটি দশ টাকা আর একটি পাঁচ টাকার নোট ফেরত দিলো ম্যানেজার। ‘আর দুই টাকা কোথায়?’ এমন ধরনের একটি জিজ্ঞাসা গোফরান সাহেবের চোখেমুখে ফুটে উঠার আগেই ‘ভাঙতি দুই টাকা নেই’ বলে একটি চুইংগাম বাড়িয়ে দিলো ম্যানেজার। হালের দোকানদারদের যা অবস্থা আরকি। অন্য সময় হলে দুই টাকার পরিবর্তে এই জিনিসটা নিতে রাজি হতেন না তিনি। কিন্তু আজ যে বিশেষ দিন। শখের গোঁফজোড়া যে আরো বড় হয়ে উঠছেÑ আজই তো তার প্রমাণ মিলল। তাই একদমই মেজাজ খারাপ করলেন না গোফরান সাহেব। চুপচাপ খোসা ছাড়িয়ে মুখে পুরে দিলেন চুইংগামটি। শিশুদের এ খাবারটিতে যে এত্তো স্বাদ লুকিয়ে রয়েছে, এ বিষয়ে একদম ধারণা ছিল না তার। এত দিন চুইংগাম খায়নি বলে বড় আফসোস হতে লাগল। ছন্দে ছন্দে চুইংগাম চিবাতে লাগলেন তিনি। সেই সাথে লক্ষ করলেন তার গোঁফজোড়াও সমান তালে নেচে যাচ্ছে। একেবারে সোনায় সোহাগা। গোঁফের নাচনে দোলে দোলে নিজের চেয়ারটাতে এসে বসলেন। এবার একটা সুখের ঘুম প্রয়োজন। মাথা কাত করে চেয়ারেই গা এলিয়ে দিলেন গোফরান সাহেব। দুনিয়ার সব আরাম এসে যেন ঘিরে ধরলো তাকে। লেগে গেলো চোখের পাতা। পুরো পৃথিবীটাই যেন শান্ত হয়ে এলো। চুইংগাম চিবাতে চিবাতেই তিনি চলে গেলেন অতীতের অম্লমধুর দিনগুলোতেÑ
আজকের এই গোঁফ একদিনের ফসল নয়। প্রতিটি সফলতার জন্যই প্রয়োজন নিবিড় অধ্যবসায়। গোফরান সাহেবের অধ্যবসায়ের সেই দিনগুলোই বয়ে এনেছে আজকের সাফল্য। তখন কেবল গোফরান সাহেব কৈশোরে পা দিয়েছেন। সমবয়সি অনেকের কাজলকালো গোঁফ ভেসে উঠলেও তার নাকের নিচে গোঁফের কোনো রেখাই দেখা দেয়নি। সেই সুযোগে অনেক বন্ধুরাই নিজেদের বড় ভাই হিসেবে দাবি করে বসলো। সমবয়সি কাউকে ভাই বলে ডাকবে এমন অপমান সহ্য করার মতো লোক গোফরান নয়। কোনো কালেই তার এ অভ্যাস ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে করেই হোক নিজেকে বড় বলে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু এর জন্য কি করা যায়? দ্বারস্ত হলেন শুভাকাক্সিক্ষদের। কেউ কেউ একেবারেই নিরাশ করল তাকে। সাফ সাফ জানিয়ে দিলো কোনো দিনই নাকি তার গোঁফ গজাবে না। আবার একান্ত কাছের অনেকেই পরামর্শ দিলো ‘নাকের নিচে রেজার চালিয়ে দেখতে পারিস’। আইডিয়াটা পছন্দ হয়ে গেলো গোফরানের। কিন্তু বাসায় তো কোনো রেজার নেই। দোকান থেকে কিনতে যাওয়াটাও সমীচীন হবে না। বেরসিক দোকানি যদি জিজ্ঞেস করেই বসে ‘রেজার দিয়ে তোমার কি কাজ খোকাবাবু?’ কী আর করা, বাধ্য হয়েই বিকল্প পথ বেছে নিতে হলো। খাপখোলা চকচকে ব্লেড হাতে নিয়ে চুপি চুপি বাথরুমে ঢুকতে হয়েছিল তাকে। তারপর পানিতে মুখ ভিজিয়ে একচোট সাবান মেখে নিয়েছিলেন। ভাবখানা এমন যেনÑ সাবানের ফেনার নিচে অসংখ্য খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ লুকিয়ে আছে। একেবারে বড়দের মতো আরকি। তারপর কম্পমান হস্তে ব্লেডটা প্রথম চালিয়েছিলেন ঠিক ওষ্ঠ আর নাসিকার মাঝখানেই (ওষ্ঠ ও নাশিকা-উইকিপিডিয়ায় ব্যবহৃত এ দু’টি শব্দের অর্থ দাঁড়ায় যথাক্রমে ঠোঁট ও নাক)। যা হঙয়ার হলোও তাই। ঠোঁট কেটে একাকার। ভাগ্য সহায় ছিল বলে উন্নত নাসিকার কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আধুনিক যুগের ব্লেড ব্যবহার করেও পার পেলেন না গোফরান।
সদ্য কৈশোরপ্রাপ্ত গোফরান যে এমন কাজ করতে পারেন তা কেউ-ই ভাবতে পারেনি। ঘটনাটা প্রথম ফাঁস হয় তার নিজের বাড়িতেই। তারপর বাড়ি থেকে বন্ধু, বন্ধু থেকে স্কুল। এভাবে গড়াতে গড়াতে একেবারে মেয়ে বন্ধুদের কান পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। জলের মতো সহজ বিষয়টা ধীরে ধীরে বরফের মতো সাঙ্ঘাতিক হয়ে উঠতে থাকে। অন্যদের হাসি-তামাশা যেমন তেমন, মেয়েদের টিটকিরি একেবারেই সহ্য হওয়ার মতো নয়। কাসে, প্রাইভেটে, রাস্তায় যেখানে খুশি পেলেই হলো, মেয়েরা সমস্বরে উত্যক্ত করা শুরু করলো গোফরানকে। আধুনিক ভাষায় একে সম্ভবত ‘এডাম টিজিং’ হিসেবেই অভিহীত করা যায়। কেবল এডাম টিজিংয়ের শিকার হওয়াই শেষ ছিল না, মুরব্বিদের কেউ কেউ ইচড়ে পাকা বলেও খোঁচাটোচা দিতো তাকে। সেই থেকেই জেদ ধরে বসল। যে করেই হোক নাকের নিচে গোঁফ চাই-ই চাই। প্রয়োজনে রোপণ করে হলেও। এর জন্য উর্বর মাটি দরকার হলে আফ্রিকার জঙ্গলে পর্যন্ত যেতে রাজি আছে। আর একবার যদি গোঁফের বাগান জেগে ওঠে, তবে তো ছেঁটে-আঁচড়ে নিয়মিত যতœ নেবেই। শুধু গোঁফের জন্য একটি আলাদা চিরুনির বাজেটও করে ফেললেন গোফরান। এভাবে যতœ-আত্তি আর পুষ্টি পেয়ে গোঁফজোড়া যখন বড় হয়ে উঠবে, তখন তাবড় তাবড় গোঁফের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেন। এক সময় বিশ্ব গোঁফ চ্যাম্পিয়নশিপের গৌরব আসবে তার ঘরেই। তখন গিনেস বুকে যদি তার নাম উঠে যায়, এতেও কোনো আপত্তি থাকবে না।
কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল একটিমাত্র অপূর্ণতা। আর সেটা হলো চেষ্টা-তদবির করেও গোঁফের দেখা পাচ্ছেন না। কথায় আছে ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’। তাই একবার-দু’বার, তিনবার, চারবার করে করে শতবার পর্যন্ত দেখলেন তিনি। কিন্তু কোনো ফল হলো না। তার পরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলেন না গোফরান। শতবার পেরিয়ে হাজারবার। এভাবে হাজার হাজারবার রেজর চালাতে হলো তাকে। রেজরের আঁচড়ে আঁচড়ে গালের চামড়া ভারি করে তুললেন। অবশেষে দু-একটি গোঁফ অঙ্কুরিত হতে দেখা গেল। অর্থাৎ সফলতা তিনি পেয়েছেন। এই প্রথমবারের মতো তিনি প্রমাণ করলেন যেÑ ইচ্ছা থাকিলেই উপায় হয়।
গোফরানের নাকের নিচে গোঁফ দেখে তো মুখপোড়া বন্ধুদের মুখে স্কচটেপ লেগে যাওয়ার অবস্থা। যারা বলেছিল, ‘গোফরানের কখনো গোঁফ গজাবে না’ তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে বেড়াতে লাগলেন তিনি। এরপর থেকেই সবকিছুর কেমন জানি আমূল পরিবর্তন হতে থাকল। যেই বাবার কাছে দশ টাকা চাইলে হাজারটি প্রশ্ন করে জর্জরিত করেন, সেই বাবাই তাকে রেজর কেনার জন্য পুরো ষাট টাকা দিয়ে দিলেন!
সেই থেকে তার গোঁফের যতœ-আত্তিতে মনোযোগ আরো বেড়ে গেল। আরো বেড়ে গেল আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর শঙ্কার দোলা। শঙ্কাটা তখন হয়েছিল দাড়ি নিয়ে। গোঁফের দেখা মিললেও দাড়ির কোনো চিহ্নও ছিল না গোফরানের গালে। আবার সেই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা। অর্থাৎ সার-গোবর, পানি-জল দিয়ে নিড়ানি পদ্ধতি অবলম্বন এবং অবশেষে সফল। এভাবেই চলছিল গোফরানের সংগ্রাম।
একদিন গোফরান বড় হলেন। একটি ভালো চাকরি পেলেন। সেই সাথে পেলেন মুষ্টিমেয় কিছু দাড়ি। এই গোফরান আর সেই গোফরান রইলেন না। তার ওষ্ঠ এবং নাসিকার মধ্যবর্তী স্থানে এখন ছাড়া ছাড়া গোঁফ। আর নিজে বেশ কয়েকবার শুমারি করে ব্যর্থ হয়ে নিশ্চিত হলেন যতেœ লালিত থুতনির দাড়িগুলো এখন শুমারিসীমা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে আজকের ডাল অনুভূতির কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। আহ্ বড়ই তৃপ্তির অনুভূতি। অম্লমধুর স্মৃতি রোমন্থন করতে করতেই আরো একটি মিষ্টি হাসি দিলেন তিনি।
কি অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড! গোফরান সাহেব সামান্য একটি হাসি দিয়েছেন মাত্র, তাও নিঃশব্দে। কিন্তু তার কানে এসে প্রবেশ করল অসংখ্য হাসির কলরোল। পুকুরের মাঝখানে ঢিল ছুড়লে একটি ঢেউ থেকে যেমন পুকুরজুড়ে অসংখ্য ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, ঘটনাটা ঠিক তেমনি ঘটল। ভূতটুত ভর করেনি তো তার ওপর? আধোঘুমে ডুবে থেকেই নিজের গায়ে চিমটি কাটলেন। পরক্ষণেই ককিয়ে উঠলেন ব্যথায় । সবকিছুই দেখি ঠিকঠাক আছে। অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। হয়তো সেটা মনের ভুল হতে পারে। আসলে হাসিটাসির কোনো শব্দই হয়নি। এবার নিশ্চিন্ত হতে যাচ্ছিলেন তিনি। পরপরই ভাবলেন পরীক্ষামূলকভাবে আরো একটি হাসি দিয়ে দেখা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ, ঠোঁট দুটোকে দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে দাঁতগুলো বিকশিত করলেন। ওম্মা! এবার দেখি হাসির চোটে কানে তালা লেগে যাওয়ার অবস্থা হলো। তালা প্রায় লেগেই গিয়েছিলো, যদি তৎক্ষনাৎ চোখ না খুলতেন তিনি-
ততক্ষণে গোফরান সাহেবকে ঘিরে অসংখ্য মানুষের জটলা তৈরি হয়েছে। কেউ হু-হু-হু করে হাসছে, কেউ হাহ্ হাহ্ করে। আবার কারো পেটে খিল ধরে মরণাপন্ন অবস্থা। গোফরান সাহেব ঘটনার আদ্যোপান্ত ঠাহর করতে পারছেন না। এ দিকে বেরসিকের দল তাকে ঘিরে হেসেই চলেছে। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে তিনি মোটামুটি ধরনের নিশ্চিত হয়েই গেছেন সুকুমার রায়ের বড়বাবুর মতো তার গোঁফজোড়াও বুঝি চুরি গেল। আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেনÑ ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি।
চুরি হবে কেনো, ডাকাতি। তারই এক সহকর্মী পরিস্থিতি সম্পর্কে সামান্য ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করলেন।
একি অনাসৃষ্টি! দিনদুপুরে ডাকাতি!
গোফরান সাহেবের গোঁফজোড়া বুঝি এবার খোয়াতে হবে। টিটকিরি করলেন ভিড়ের মধ্য থেকেই আরেকজন।
এতবড় স্পর্ধা! ডাকাতির হুমকি! উত্তেজিত বাতচিত শুরু করলেন গোফরান সাহেব। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এক হাত দেখে নেয়ার উদ্দেশ্যে।
অভ্যাগতদের মাঝে এতক্ষণ যারা মূল ঘটনাটি দেখতে পাচ্ছিলেন না, এবার তারাও স্পষ্ট করে দেখার সুযোগ পেলেন। রাগে গজগজ করতে থাকা গোফরান সাহেবের ডালমাখা গোঁফজোড়ায় লেপ্টে আছে চুইংগাম। বড়ই আঠাল পদার্থ এটি। একবার গোঁফে লেপ্টে গেলে শেভ না করে উপায় থাকে না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অফিসজুড়ে লেগে গেল মহা হট্টগোল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে গোফরান সাহেবের মুখের চুইংগাম গোঁফে লাগল কিভাবে?
কে জানে কিভাবে।

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১১

ম্যালা ভালোবাসা


কার্টুন: জাহিদ হাসান বেনু

শুক্রবার, জানুয়ারি ০৭, ২০১১

ঠান্ডা লড়াই


আমাকে আর সোহেল অটলকে একসাথে নয়া দিগন্তে দুটি সাপ্তাহিক প্রকাশনা অবকাশ ও থেরাপির দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে থেরাপি সম্পাদক নানাভাবে চেস্টা করেছেন অবকাশকে পেছনে ফেলতে। এর জন্য ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্রেও মেতেছেন তিনি। এমনকি অবকাশের কয়েকটি সংখ্যা বন্ধ করে দেয়ার পায়তারা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। আমার মতো সোজাসাপটা মানুষের বিরুদ্ধে অটলের এই ষড়যন্ত্রকে আমিও সহজভাবে নিতে পারিনি।
তারপর লেগে যায় তুমুল লড়াই। সে এক ভয়ঙ্কর ঠান্ডা লড়াই।
আর সে লড়াইয়ের দৃশ্যই চিত্রিত করেছেন শিল্পী হামিদুল ইসলাম।

রবিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০১০

প্রকৃতিপাগল ওরা


শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
গাছের নাম ‘পান্থপাদপ’। এর আগে দেখেছি অনেক, নাম জানা ছিল না। এমন অদ্ভুত নাম শেখর রায়ের মুখেই শুনলাম প্রথম। ভাবলাম তিনি ছাড়া বাকি সবার বুঝি আমার মতোই দশা। একবার দৃষ্টি ঘোরালাম নটর ডেম কলেজের ছাত্রদের দিকে। হতাশ হতে হলো। ২০ থেকে ২৫ জোড়া উজ্জ্বল চোখই বলে দিচ্ছে যে ওরা মোটেও এ ব্যাপারে অজ্ঞ নয়। আর অন্তর্ভেদী এ চোখগুলোর কাছেই ধরা পড়তে হলো আমাকে। অর্থাৎ হেলাফেলার পাত্র হয়ে গেলাম আর কি। ওরা যেন বলছে ‘এখনো এটাও জান না? এসব তো আমাদের কাছে পানির মতো সোজা।’
হ্যাঁ গাছ, পাখি, ফুলসহ প্রকৃতির সব ব্যাপার-স্যাপার ওদের কাছে পানির মতোই। কারণ ওরা নটর ডেম নেচার স্টাডি কাবের সদস্য। ওরা প্রকৃতিপাগল। প্রকৃতিকে জানতে বুঝতে ফিল্ড ট্রিপে বেরিয়েছে (২৬ নভেম্বর ২০১০) নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটর ডেমের আঙিনায়। ঘুরে ঘুরে দেখছে এ গাছ ও গাছ। আর ওদেরকে এটা-ওটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন কাবের আজীবন সদস্য শেখর রায়। আমার কৌতূহল মেটানোর জন্যই পান্থপাদপ সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিতে হলো তাকেÑ এর ইংরেজি নাম ঞৎধাবষষবৎ’ং। বাংলা ‘পান্থ’ শব্দটির অর্থ হলো পথিক। আর ‘পাদপ’ হলো গাছ। অর্থাৎ ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই ‘পান্থপাদপ’ অর্থ দাঁড়ায় পথিকের জন্য গাছ। কৌতূহল বেড়ে গেল আরো। গাছটি কি কেবল পথিকের জন্যই? তাহলে এটি নটর ডেম আঙিনায় কেন? আরামবাগ মোড়ে রোপণ করলেই হতো, প্রতিদিন অসংখ্য পথিক যাওয়া-আসা করে এ পথ ধরে। জটিলতা ভেঙে দিলো কাবের ইন্টারমিডিয়েট পড়–য়া সদস্যরাই। গাছটির পাতা দেখতে কলাপাতার মতো। কিন্তু কান্ডের ভেতরটা ফাঁপা, যেখানে পানি জমে থাকে। আগেকার দিনে এ পানিতে তিয়াস মেটাতো অনেক পথিক। কেবল আগেকার দিনেই কেন, এখনো এর কান্ডে তিয়াস মেটানোর মতো পানি পাওয়া যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে। জলবায়ুর উষ্ণতা আর বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের পরিবেশ এখন ভীষণভাবে বিপন্ন। এখন পৃথিবীতে গাছের বড়ই প্রয়োজন। আর যেখানে গাছের প্রয়োজন সেখানে কেবল তিয়াস মেটানোর জন্য গাছটিকে কেটে ফেলবেন, এমনটি হওয়ার নয়। আর আপনি চাইলেও কাটতে দেবে না প্রকৃতিপ্রেমিকরা। ভাবতে পারেন এ গাছটি না হয় কাটতে মানা, অন্য কোথাও কি এমন গাছ পাওয়া যাবে না? হ্যাঁ, পাওয়া যাবে বটে, তবে সহজে নয়। কারণ এটি বিরল প্রজাতির। বাংলাদেশে নটর ডেম কলেজেই গাছটি প্রথম লাগানো হয় এবং এ ব্যাপারে নটর ডেম ছিল পাইওনিয়র। অনেক মানুষ গাছটিকে দেখতে নটর ডেম কলেজে আসেন।
পান্থপাদপের পর প্রকৃতিপাগল ওরা যে গাছের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো, তাতে আমার পিলে চমকে যাওয়ার অবস্থা। শুনেছিলাম পৃথিবীতে সে গাছ একটিই মাত্র আছে। আর সেটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তাহলে নটরডেমে এলো কিভাবে?
বলছি সে কাহিনীইÑ গাছটির নাম ‘তালিপাম’। এর বৈশিষ্ট্য হলো একবার ফল দিয়ে মারা যায়। দেখতে একেবারেই সাধারণ তাল গাছের মতো, কেউ বলে না দিলে বোঝা প্রায় অসম্ভব যে, এটি তাল গাছ নয়। তাই একে ‘বন্যতাল’ বলেও ডাকা হয়। এ গাছ ফল দেয়ার পর সর্বোচ্চ এক বছর বাঁচে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছটিতে গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ফল পাকা শেষ হয়েছে। ফলে ধারণা করা হয় কিছু দিনের মধ্যেই গাছটি মারা যাবে। তাই এ গাছটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগী হয় রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেড। এরা বীজ থেকে নতুন চারা উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালায় এবং সফল হয়। গত ১ বৈশাখ, ১৪১৭ সালে এর অঙ্কুরোদগম ঘটে। বীজ থেকে চারা বের হতে দেড় থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। এ পর্যন্ত প্রায় দু’হাজার চারা তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে রোপণ করে। আর এরই একটি হলো নটর ডেম আঙিনার ‘তালিপাম’।
প্রকৃতিপাগলদের সাথে প্রকৃতিকথন চলছিলো বেশ। হঠাৎ না বলে না কয়ে আমাদের দলে এসে ভিড়লেন নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা। সম্ভবত পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন কোথাও। প্রিয় ছাত্রদের দেখে খোঁজ নিতে দাঁড়িয়ে গেলেন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন কাবের। উপদেশ দিলেন ছাত্রদের। তারপর আরো কথা-বার্তা হলো। বিদায় নিলেন তিনি এবং আলোচনা মোড় নিলো গাছ থেকে পাখিতে। বিপুল উৎসাহে ছাত্ররা দেখালো পাখিদের জন্য তাদের উদ্যোগ। আঙিনার গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে কৃত্রিম পাখির বাসা। এগুলো টানিয়েছে ওরাই। মাঝে মাঝে পাখিরা উড়ে এসে বসে, ডিম দেয়, বাচ্চা ফুটায়।
প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করার জন্য ওদের চেষ্টার শেষ নেই। ওরা প্রকৃতিকে সময় দেয় তিনটি আঙ্গিক থেকেÑ ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও কাবের মাধ্যমে। রাকিব হাসান খান আবির। বর্তমানে নেচার স্টাডি কাবে ওর সদস্য নং ১১হ১২। নটর ডেম কলেজে ভর্তির ফরম তুলতে এসে কাবের একটি ক্যাটালগ হাতে পায় সে। আর এ ক্যাটালগের মাধ্যমেই কাবের সাথে ওর পরিচয়। সেই থেকেই শুরু। তারপর নটর ডেম কলেজে ভর্তি এবং নেচার কাবের সদস্য হওয়া। এ কাব তাকে শিখিয়েছে- প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে, প্রকৃতিকে শিখতে হবে, জানতে হবে। অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না। পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যখন ভালো লাগবে পড়বে, যখন ভালো লাগবে না পড়বে না। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এক ঝাঁক প্রকৃতিপ্রেমীর সাথে আড্ডা জমে গেল আরো। খোলা আঙিনায় গাছের কোমল ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমরা। বলছি-শুনছি, জানছি-জানাচ্ছি। কখনো বা উদ্বেগ প্রকাশ করছি সেসব কিশোরদের জন্য, যারা এই বয়সেই জড়িয়ে যায় নানা অপরাধে। হাতের সময়টুকু ব্যয় করে অনর্থক কাজে। কেউ কেউ বখাটেপনা আর মাদকাসক্ত হয়ে প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই শেষ করে দিচ্ছে নিজেকে। অথচ এ আড্ডার সবাই কিশোর। তাদের মাঝে এমন কেউ নেই যার হাতে অনর্থক কাজ করার মতো সময় রয়েছে।
উদ্যমী এ কিশোরদের একজন আবদুর রহিম। থাকে বাসাবোতে। নেচার স্টাডি কাবে সদস্য নং ১২হ৪০। সকাল সাড়ে ৫টায় সে বিছানা ছেড়ে ওঠে। প্রাতঃকাজ সারার পর প্রথম যে দায়িত্বটির কথা তার মাথায় আসে তা হলোÑ সে একজন মুসলমান। আর তাই তাকে ফজরের নামাজ পড়তে হবে। নামাজ শেষে পত্রিকা পড়া, নাশতা করা ইত্যাদি কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করে ঠিক ৭টার মধ্যে বেরিয়ে যায় স্কুলের উদ্দেশে। পৌঁছে সাড়ে ৭টায় এবং কাস শুরু ৮টা থেকে। আর শেষ হয় পৌনে ১টায় এবং বাসায় যেতে আধাঘণ্টা। দুপুরের খাওয়া সেরে বাবার জন্য ভাত নিয়ে যেতে হয় সবুজবাগ থানার পাশে। ফিরতে ফিরতে সাড়ে ৩টা বেজে যায়। কোনো কোনো দিন প্রাইভেট পড়তে যায়। আর যেদিন প্রাইভেট থাকে না সেদিন বিকেলে এবং ছুটির দিনে সে বেরিয়ে যায় প্রকৃতির কাছে দেয়া ওয়াদা রক্ষা করতে। প্রকৃতি যেন দূষিত না হয় সে জন্য কাজ করে। পরিবারের সদস্যদের সচেতন করে। সচেতন করে প্রতিবেশীদের। এই তো সেদিন স্কুলে আসার সময় দেখতে পেল, জবাই করা পশুর বর্জ্য পরে আছে রাস্তার মাঝখানে। নেচার কাবের সদস্য হিসেবে পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ দেখেও না দেখার ভান করে চলে আসতে পারেনি রহিম। একটু সময় দিয়ে নিজেই চলার পথ থেকে সরিয়ে রেখেছে বর্জ্য। তারপর স্থানীয়দের বলে এসেছে যেন মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়।
রহিমের দৈনন্দিন কাজের মাঝে মগ্ন থেকেই আমরা পা বাড়ালাম ৩১২ নম্বর কক্ষের দিকে, যেখানে একটু পরই গঠন হবে নতুন বছরের জন্য কাবের নতুন কমিটি। সদস্যরা কক্ষে প্রবেশ করল। আর শেখর রায় আমাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন নটর ডেম কলেজের সাবেক ছাত্র এবং কাবের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ড. আশরাফুজ্জামন চৌধুরীর মুখোমুখি। বর্তমানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক। তার পাহাড়সম স্বপ্ন নতুন প্রজন্মকে নিয়ে। নেচার স্টাডি কাবের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মাঝে প্রকৃতি সংরক্ষণের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে বলেই তিনি এর সাথে রয়েছেন। ড. চৌধুরী বলেন, এখানকার ছেলেপেলেদের মাঝে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার যে বীজ প্রবেশ করানো হয়, তা ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়। তারপর এ ভালোবাসার বৃক্ষ গজিয়ে উঠতে থাকে স্ব স্ব পরিবেশে। এরই প্রমাণ বর্তমানে এর সদস্যরা প্রকৃতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন দেশ-বিদেশে। এমনই একজন সদস্যের উদাহরণ টানলেন তিনি। নটর ডেম কলেজের সাবেক ছাত্র কাউসার মোস্তফা। সম্প্রতি নিতান্ত শখের বসেই থাইল্যান্ডের একটি বাঘের খাঁচায় ঢুকেছিলেন তিনি। কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড! বাঘ তো বাঘের মতোই ভয়ঙ্কর, মানুষকে কাছে পেলে ছেড়ে কথা বলার প্রাণী নয়। এ কারণেই যুক্তরাজ্যের চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে মুচলেকা দিয়ে ঢুকতে হয়েছিল তাকে। অর্থাৎ খাঁচার বাঘ তার ঘাড় মটকে দিলেও কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। কিন্তু সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে কাউসার মোস্তফা ঠিক ঠিকই খাঁচায় ঢোকেন এবং অক্ষতভাবে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। শুধু কি তাই, ডোরাকাটা শরীরে হাত বুলিযে হিংস্র বাঘকে বশ করেছিলেন তিনি। কাউসারকে দেখে হালুম করা তো দূরের কথা টু শব্দটিও করেনি। বরং জড়াজড়ি করে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে দিয়েছিল তাকে। যেন প্রকৃতিপ্রেমিক হিসেবে কাউসার মোস্তফাকে যথার্থই চিনতে পেরেছিল সে।
আশরাফুজ্জামান চৌধুরীর সাথে কথা বলতে বলতেই ব্যস্তপদে এসে হাজির হলেন কাবের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ভূঁইয়া। পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা। পায়ে পুরো সোলের স্যান্ডেল। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। চোখে চশমা। মাথায় শুভ্র টুপি। আর নিশ্চিত করে বলে দেয়া যায় যে, তার ভেতরটাও ভীষণ শুভ্র। একদম কাশফুলের মতো। কারণ শুভ্র হৃদয় না থাকলে প্রকৃতিকে ভালোবাসা যায় না। এই মিজানুর রহমান ভূঁইয়াই কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতি সংরক্ষণের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৮৪ সালে কাব গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব একটি পৃথিবীর। জলবায়ুগত উষ্ণায়ন, বনাঞ্চল ধ্বংস, বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির বিলুপ্তি পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলছে। রাসায়নিক ও কীটনাশকের অপরিকল্পিত ব্যবহার, পারমাণবিক অস্ত্রের অনৈতিক ব্যবহার, নদী ও সমুদ্রগর্ভে বর্জ্য নিক্ষেপ প্রতিনিয়ত ভাবায় তাকে। তাই এসবের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কাজ করছেন নিভৃতে। পরিবেশের জন্য ঘাম ঝরাতে কোনো পিছুটান নেই তার। তবে এতসব উদ্যমের মাঝেও রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। এককালীন নামেমাত্র অঙ্কের রেজিস্ট্রেশন ফি ছাড়া আর কোনো টাকা তারা সদস্যদের কাছ থেকে নেন না। তাই কাবের কোনো আয়ও নেই। এর সদস্যরা গাঁটের পয়সা খরচ করে স্বেচ্ছাশ্রম দেন। অর্থনৈতিক এ সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের অনেক উদ্যোগই মুখ থুবড়ে পরে। তবে তিনি জানান, ‘মাঝে মাঝে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী সংস্থা আমাদের অর্থ দিতে চায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, ওরা নির্দিষ্ট ছক বেঁধে দেয়। আর সে ছক অনুযায়ী কাজ করতে গেলে আমরা আমাদের মৌলিকত্ব থেকে বিচ্যুত হবো।’ সে কারণে অনাড়ম্বরভাবেই কাজ করছেন তারা। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি বাজানোর পক্ষপাতী তিনি নন । অনেকেই প্রকৃতির জন্য কাজ করতে গিয়ে উল্টো প্রকৃতির ক্ষতি করে বসেন। তারা যতটুকু কাজ করেন তার চেয়ে বেশি ঢোল-পেটরা পেটান, এই মেলা সেই মেলার আয়োজন করে জনসমাগম ঘটাতে বেশি পছন্দ করেন। এতে করে প্রাণীদের অভয়াশ্রম বিনষ্ট হয়। এতটুকু বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শুভ্র হৃদয়ের এই মানুষটি। তারপর উদাস দৃষ্টি ফেললেন নটর ডেম আঙিনায়।

সোমবার, নভেম্বর ২৯, ২০১০

পাখিরা আত্মহত্যা করে যেখানে



শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
নিকষ অন্ধকার। টিপটিপে বৃষ্টি। সেই সাথে গাঢ় কুয়াশা। আর মৃদু বাতাসের প্রবাহ শুরু হলেই ঘটতে থাকে ঘটনাটা। অর্থাৎ সন্ধ্যা ৭ টা থেকেই পাখিগুলো ব্যস্ত হয়ে যায় আগুনে ঝাপ দিতে। উদ্দেশ্য আত্মহত্যা!
হ্যা, পাখিরা আগুনে ঝাপিয়ে আত্মহত্যা করে জাটিঙ্গা গ্রামে। আর গ্রামের নামেই নাম এ পাখিদের ‘জাটিঙ্গা’। ভারতের আসাম রাজ্যের গৌহাটি থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে উত্তর কাছাড় জেলার একটি গ্রাম এটি, হাফলং থেকে ৯ কি.মি. দক্ষিনে। প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্য আর পাখি রহস্যের কারণেই আসামের এ গ্রাম সারা বিশ্বে পরিচিত। এখানে মৌসুমী মাসগুলোর শেষের দিকে শুরু হয় পাখিদের আত্মহত্যার হিড়িক। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত।
অমাবস্যার রাত, টিপটিপে বৃষ্টি, গাঢ় কুয়াশা আর বাতাসের প্রবাহ এ কয়টির সমন্বয় ঘটলেই আলোর উৎসের দিকে ছুটে যাওয়া এদের অভ্যাস। জাটিঙ্গার লোকজনের এতে বেশ সুবিধাই হয়েছে। তাদের মাংসের প্রয়োজন হলে রাতে আগুন জ্বেলে বসে। ব্যস, পাখিগুলো ডানা ঝাপটিয়ে আসতে থাকে আত্মাহুতি দিতে। আলোর উৎসের ঠিক উপরে এসে পাখা আর পা ছেড়ে দিয়ে ধপ করে মাটিতে পড়ে যায় যেন ‘কান্ত প্রাণ এক’। মায়াবি চোখের এ পাখিগুলোকে তখন দেখে মনে হতে পারে অর্ধমৃত। জীবণের প্রতি বুঝি ভীষণ বিরক্ত। আর তাই এ জীবণ এরা রাখতে চায়না। আকাশ থেকে লুটিয়ে পড়ার সময় সব পাখিই যে আগুনের উপর পড়ে এমন নয়। বরং কিছু ইতস্তত ছড়িয়ে যায় আগুনের পাশে। কিন্তু এরা বেঁচে থাকলেও মরার মতো পড়ে থাকে এবং সহজেই ধরা দেয়। পাখি শিকারের জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর কি হতে পারে গ্রামবাসিদের কাছে? অনেক সময় আলোর দিকে উড়ে আসতে থাকা পাখিদের বাঁশের লাঠি কিংবা গুলতি দিয়েও সহজে শিকার করে স্থানীয় লোকজন।
এসব পাখিদের কি কোন দুঃখ তাড়া করে? নয়তো কেন তারা আত্মহত্যা করতে আসে? এর জবাব কারো কাছে নেই। বহু বছর ধরে এমনটাই চলে আসছে। হৃদয়ে দুঃখ থাক আর নাই থাক এদের চোখে সব সময় বুনো ভাব আর দুঃখের ছায়া দেখা যায়। জাটিঙ্গা পাখি কখনো পোষ মেনেছে বলে কারো জানা নেই। আর পাখিবিষারদ ও গবেষকরা হলফ করে বলেছেন, পাখিরা কখনো মানসিক রোগে ভোগে না। তাহলে কেন আগুন ও আলোর প্রতি এদের অমোঘ টান?
এ রহস্যের জট আজ পর্যন্ত কেউ খুলতে পারেনি। এটাকে কেউ বলে আত্মহত্যা, কেউ বলে ভুতুড়ে ব্যাপার। কেননা জাটিঙ্গার পাশেই হাফলং। সেখানে এই পাখি কখনো যায় না অথচ জাটিংগা আর হাফলংয়ের আকাশের দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। স্থানীয় ‘জাইনতিয়া’ জনগোষ্ঠীর ধারণা, এমন ঘটনার পেছনে অশুভ আত্মার ভ’মিকা রয়েছে।
অনেক গবেষকরাই আপ্রাণ চেস্টা করেছেন জাটিঙ্গা পাখিরহস্যের কিনারা করতে। কিন্তু পারেন নি। তবে অধিকাংশের বিশ্বাস বৈরি আবহাওয়াই এর প্রধান কারণ। চাঁদহীন কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে টিপটিপে বৃষ্টির সাথে বাতাসের প্রবাহ প্রকৃতিতে একটি গোলমেলে অবস্থা তৈরি করে। যে কারণে পাখিরা আর স্বাভাবিক থাকতে পারে না, বাধ্য হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু কি কারণে আলোর উৎস এদেরকে আকর্ষণ করে? এর কোন সদুত্তর না থাকলেও পাখিদের নিষ্ক্রিয় হওয়ার ব্যাপারে আরেকটি ধারণা রয়েছে, আলোর আকর্ষণে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এরা ছুটতে থাকে উৎস লক্ষ্য করে। পথে গাছগাছালিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আর আহত অবস্থায় উৎসে এসেই নিঃশ্বেস হয়ে যায় শরীরের শক্তি। তবে এ ধারণার পেছনে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ মেলেনি। তাছাড়া মাটিতে লুটিয়ে পড়া পাখিদের গায়ে কোন আঘাতের চিহ্নও পাওয়া যায়নি।
পাখি বিশারদ ড. এস সেনগুপ্ত, এ. রউফ এবং সলিম আলির গবেষণায় ৪৪ প্রজাতির পাখির আলোক উৎসের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু দেখা গেছে, জাটিঙ্গা গ্রামের দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও দুইশ’ মিটার প্রস্তের নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া অন্যান্য এলাকায় আলোর প্রতি তাদের আকর্ষণ নেই। আবার আরো একটি অ™ভ’ত ব্যাপার হলো এ আত্ম্যহত্যার প্রবণতা কেবল স্থানীয় জাটিঙ্গা পাখিদের মাঝেই দেখা যায়, কোন অতিথি পাখি এমন আচরণ করে না। কাজেই পাখি বিশারদ আর তাবড় তাবড় গবেষকদের মাথা গুলিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তারা ব্যাপারটিকে ভ’তুরে বলে মানতেও রাজি নন, আবার রহস্যের জাল ভেদ করে বেরিয়েও আসতে পারছেন না।
ড. সুধীর সেনগুপ্ত ধারণা করছেন জটিল আবহাওয়ার কারণে হয়তো সেখানকার ভ’চুম্বকত্বের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর অত্যধিক ভ’চুম্বকত্ব এবং আলো একসাথে পাখিদের ওপর মারাত্মক কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফলে সাইকোলজিকেলভাবে পাখিরা উদভ্রান্ত হয়ে যায় এবং অস্বাভাবিকভাবে আলোর উৎসের দিকে ছুটে চলে। তারপর অবশ হয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তবে এসব কথাও প্রমাণিত হয়নি। মূলত বৈরী আবহাওয়ায় গাঢ় কুয়াশা আর টিপটিপে বৃষ্টিতে উড়ে যাবার সময় গ্রামবাসীদের আলোর ফাঁদে আকৃষ্ট হয়ে পাখিরা এ কান্ড ঘটায়, এটিই সব গবেষণার উপসংহার। এছাড়া ঐ এলাকায় পাখির ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। এ জন্য সংখ্যাগত সাম্যাবস্থা বজায় রাখতে এটি হয়তো প্রকৃতিরই কোন না জানা খেলা।

রবিবার, অক্টোবর ০৩, ২০১০

চুলাচুলি সমাচার

কোমরে কাপড় বেঁধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছে আঙ্গুরির মা। পিছিয়ে নেই আছিয়ার মাও। এতক্ষন কেবল অন্দর থেকে অন্দরেই ছুটাছুটি করছিলো গ্রাম্য গালাগালের তীর। এখন পরিস্থিতি এগুচ্ছে সম্মুখ সমরের দিকে। প্রথমে দেউড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো দুজনের মাথা। তারপর পুরো অবয়ব। ঝাড়– উঁচিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করতে করতে এগিয়ে আসছে আঙ্গুরির মা। সসস্ত্র প্রতিপক্ষের বিপরীতে একমুহুর্ত থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হলো আছিয়ার মা, তবে হতাশ হতে হলোনা। তাৎক্ষনিক প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলো তার ছোট মেয়ে নুরেছা। চোখের পলকেই মায়ের হাতে চালান করে দিলো শক্ত-সামর্থ একটি ঝাড়–। এবার সমানে সমান। ক্রমশ কমে আসছে দুজনের মাঝের দুরত্ব। উত্তপ্ত হচ্ছে রণাঙ্গন। বাড়ছে দর্শকদের উত্তেজনা।
চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে ময়না। কী নিয়ে এ লড়াইয়ের সূত্রপাত এর কিছুই তার জানা নেই। এমনকি কথার তীরের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ শুনেও কোন সূত্র উদ্ধার করতে পারলো না সে। তবে পাশাপাশি বাড়ির এ দুই মহিলার মাঝে এমন বাক বিতন্ডা আজই নতুন নয়। কম করে হলেও সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন গালাগালি, চুলাচুলি না করলে সম্ভবত তাদের পেটের ভাতই হজম হয়না। আর এ কারনেই দর্শকরা নিরব দাঁড়িয়ে। কেউ এগিয়ে যাচ্ছেনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।
- কিরে ময়না, খারইয়া খারইয়া বেইট্টাইন্তের (মহিলাদের) কাইজ্জা দেহস? খারঅ তর বাপের কাছে কইয়া লই।
সবুজের কথাতে লজ্জা পেল ময়না, ভয়ও হলো কিছুটা। এত দর্শকদের ভীরে সবুজ ভাই যে তাকে দেখে ফেলবে, ভাবতে পারেনি সে। কথার কোন জবাব না দিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে চলে যেতে উদ্যত হচ্ছিলো। কিন্তু তখনি ঘটে গেলো ঘটনাটা!
আছিয়ার মাকে চুলের মুঠি ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে এলো আঙ্গুরির মা। হাতের ঝাড়– ফেলে দিয়ে নিচ থেকে প্রতিপক্ষের চুলের মুঠিটিও ধরার চেস্টা করলো আছিয়ার মা। খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও চুলের নাগাল পেল ঠিকই। কিছুক্ষনের মাঝেই দুজন সমানে সমান। একজন আরেকজনের চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে লাগলো। এবার কথার তীরের পরিবর্তে শুরু হলো যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদের প্রতিযোগিতা। তারপর হাউমাউ কান্না। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়তে রাজি নয়, যেন বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদেনি। চুলাচুলির তুমুল পর্যায়ে দু’জনেই লুটিয়ে পরলো মাটিতে। তারপর গড়িয়ে পড়তে লাগলো বাড়ির ঢাল বেয়ে।
ঘটনার শেষটা দেখে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো ময়নার। কিন্তু আড়চোখে সবুজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আর দাঁড়াতে সাহস হলোনা। হাঁটা শুরু করলো বাড়ির দিকে। পেছন পেছন আসতে দেখলো সবুজ ভাইকেও।
- বেইট্টাইন্তের কাইজ্জা দেহুন বালা না বুজছস? এইগুলা অইল অশিক্ষিত মানুষের কাম। তুই তো ইস্কুলে পরস। তোর এইসবের দিকে মনযোগ দেওন উচিত না।
- আইচ্ছা ভুল অইয়া গেছে। আর এমুন অইত না।
- দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শেষ করছস ভালোয়, ভালোয়। অহন সমাপনী পরীক্ষা ভালো কইরা দেওয়ার প্রস্তুতি নে। শিক্ষিত অইয়া মানুষের মতো মানুষ অওয়ার চেস্টা কর। শিক্ষার আলো মানুষের সব মূর্খতা দূর কইরা দেয়। মানুষরে বিচার-বিবেচনা শিখায়। আঙ্গুরির মা আর আছিয়ার মা পড়ালেহা করে নাই বইলা এরার কোনো বিচার-বিবেচনা নাই। আর এর লাইগ্যাই অতো লোকজনের সামনে চুলাচুলি করতেও এরার শরম লাগে না।
- আইচ্ছা সবুজ ভাই, শিক্ষাই কি মানুষরে মানুষের মতো মানুষ বানায়?
- হ-অ
- অহন আমার একটা কতার জবাব দেও দেহি। হেদিন পত্রিকার মইদ্যে ছবি দেখলাম, ঢাহা শহরে কলেজের ছাত্রীরা রাস্তার মাইদ্যে চুলাচুলি করতাছে! হেরা কি শিক্ষিত না?
‘শিক্ষিত’ শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়েও করতে পারলো না সবুজ। এই ছোট্ট মেয়েটির প্রশ্নে এমন বেকায়দায় পড়ে যাবে, ভাবতে পারেনি সে। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালন করার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের ছাত্রলীগ নেতৃদের চুলাচুলির ছবি সেও দেখেছে পত্রিকায়। মিছিলের সামনে থাকাকে কেন্দ্র করে তাদের এই চুলাচুলির সূত্রপাত। তখন প্রধানমন্ত্রীর ছবি পর্যন্ত দলিত হয় তাদের পায়ের নিচে।
একেবারেই চুপসে গেল সবুজ। বুদ্ধিমতি মেয়ে ময়নাও আর ঘাটাতে চাইলো না তাকে। তবে এ-ই প্রথমবারের মতো সবুজ ভাইকে ধরাশায়ি করতে পেরে তার চোখেমুখে আনন্দ ফুটে উঠল।

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১০

খেলার নাম ভাটিয়া

যে কেউ ভেবে বসতে পারে মধ্যবয়স্ক এ লোকগুলো বুঝি দাঁড়িয়াবান্ধা খেলছে। নুমানের ছোট চাচার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি শহরে থাকেন। স্বপরিবারে গ্রামে এসেছিলেন দু’দিনের জন্য। এখন আবার চলে যাচ্ছেন। ফিরতি পথে নৌকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন বাজারের কান্দায় (উন্মুক্ত উঁচু জায়গা)। এই আশিন মাসেও যে হাওর পানিতে টইটম্বুর থাকবে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। অবশ্য এতে ভালোই হয়েছে, দু’দিন বেশ উপভোগ করার সুযোগ হয়েছে তার। বাড়ির সবাইকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন নৌকা বাইসালিতে। দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের জলে ঝরা ঝর ঝর বৃষ্টিতে মোহগ্রস্ত হয়েছিলেন তিনি; বাঁধভাঙা আনন্দে বৃষ্টিকে বরণ করেছিলেন। তারপর যখন উঁকি দিয়েছিলো বৃষ্টিধোয়া রোদ, তখন আকাশ নীলা অতিক্রম করেছিলো নীলের গণ্ডি। গোটা পৃথিবী যেন মেখেছিলো রঙধনুর সাত রঙ। আকাশের রঙের বাহার প্রতিফলিত হচ্ছিলো হাওরের শান্ত জলে। ছপাত ছপাত ডিঙি নৌকার বাইসালিতে তখন হাওরটাকে মনে হয়েছিলো রঙের ক্যানভাস। কিন্তু এখন এই যাবার সময় নৌকা না পেয়ে অনিন্দ্য সুন্দর হাওরের উপরই মহা বিরক্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। কোনো রকমে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই হলো- ব্যস, আর যাত্রীবাহী নৌকার টিকিটিও পাওয়া যায়না।
কী আর করা! বাধ্য হয়েই তাকে মনযোগ দিতে হয়েছিলো মধ্যবয়স্ক লোকগুলোর ধুপধাপ দৌড়াদৌড়িতে। প্রথমে তো একে দাঁড়িয়াবন্ধা খেলা ভেবেই বসেছিলেন তিনি। কিন্তু এ খেলায় তো এতবড় কোট (খেলার বৃত্তবিশেষ) হওয়ার কথা নয়! ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দিলো ময়না। তারপর থেকেই গভীর আগ্রহে তিনি ডুবে গেলেন খেলার ভেতর। খেলার নাম ভাটিয়া। বিশাল বড় করে চারকোনা একটি কোট আঁকা রয়েছে। আর চারটি কোনায় পাহারায় রয়েছে চারজন। কোটের বাইরে থেকে আরো চারজন ছলাকলা করছে ভেতরে ঢোকার জন্য। চার পাহারাদারের স্পর্শমুক্ত থেকে একবার ভেতরে ঢোকে, তারপর আবার বেরিয়ে আসতে পারাই নাকি তাদের লক্ষ্য। এভাবে একে একে চারজন যদি বেরিয়ে আসতে পারে, তবেই গোল্লা। এ ধরনের নিয়মই তাকে বুঝালো ময়না। কিন্তু এতকিছু ওনার মাথায় ঢোকছে না। তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখছেন লুঙ্গি-ন্যাংটি কেঁচে কত অবলীলায়-ই না লোকগুলো খেলে যাচ্ছে! ওরা প্রত্যেকেই তাঁর সমবয়সী হবে। অথচ এখন তাকে খেলতে বললে কি তিনি রাজি হবেন? না, হওয়ার কথা নয়। আর ওদের মতো এতো পরিশ্রমও তিনি করতে পারবেন না। বাচ্চা ছেলেদের মতো বাতাস কেটে-কুটে এঁকেবেঁকে দৌড়াদৌড়ি করছে ওরা। সারা গায়ে ধুলি। দর দর করে ঝরতে থাকা ঘামে ধুলিগুলো ভিজে কাঁদা হওয়ার আগেই আবার মাটিতে গড়াগড়ি খেতে হচ্ছে ওদের। তারপর আবার তাজা ধুলি-মাটি মেখে শুরু করছে হুটিপুটি। হুস্-হাস্ শব্দ তুলে একেকজনের শ্বাস প্রশ্বাস বেরোচ্ছে যেন যন্ত্রের গতিতে। তবুও চেহারা থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে নির্মল আনন্দ। সে আনন্দ ভর করছে দর্শকদের মাঝেও। ভাটিয়ার কোটকে ঘিরে অগুণতি দর্শক। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে। আবার কেউ বা দূর্বাঘাসে কাত হয়ে শুয়েও আছে। খেলোয়াড়দের সাথে সাথে উত্তেজনায় টানটান ওরাও। দেউড়ির আড়াল সরিয়ে বাড়ির অন্দরমহল থেকেও উপভোগ করছে মহিলারা। সবার মাঝে বিপুল এক আনন্দ। এ আনন্দের ভাগ অন্যরা যতটুকু পাচ্ছে নুমানের ছোট চাচা হয়তো ততটা পাচ্ছেন না। কারণ ভাটিয়া খেলার নিয়ম-কানুন তার জানা নেই। তারপরও প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের এ খেলাটি উপভোগ করতে পেরে অন্যরকম এক উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত তিনি। সময়ের সাথে সাথে মানুষগুলোও সব যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। তিনিও এর বাইরে নন। একসময় বৌচি, চি কুৎ কুৎ, গোল্লাছুটসহ কত খেলাই না দেখা যেত বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে। এখন দেখা যায় বটে, তবে তা খুবই কম। লাঠিখেলা দেখতে গিয়ে কত্তবার মায়ের বকুনি খেতে হয়েছিলো তাকে! ঢোল-কাঁসরের শব্দ আর লাঠির সাজ সাজ আয়োজন একত্রিত করতো গ্রামবাসীকে। রঙবেরঙের যোদ্ধার পোশাক পড়ে হাতে মেকি তরবারি, ছোড়া ও বড় থালা সাইজের ঢাল নিয়ে লাঠিয়ালরা বাজিয়ে দিতো যুদ্ধের দামামা। মাথায় থাকতো লাল কাপড়ের পট্টি। তাদের ঘুঙুরের উচ্চ শব্দেও মোহগ্রস্ত হতেন তিনি। উপভোগ করতেন লাঠির ভেলকি।
‘জল্লা-জল্লা....’ শব্দে চিৎকার করে উঠলো খেলোয়াড়দের একপক্ষসহ উপস্থিত দর্শকরা। সম্বিত ফিরে পেলেন নুমানের ছোট চাচা। বুঝতে পারলেন কোনো খেলোয়াড় খেলার নিয়ম ভঙ্গ করেছে। একটু আড়মোড়া ভেঙে আবার খেলায় মনযোগ দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু পারলেন না ময়নার ডাক শুনে ‘চাচা আমহেরে (আপনাকে) চাচী ডাকতাছে।’
ঘাঢ় ঘুরিয়ে নৌকার জন্য অপেক্ষমান স্ত্রী-সন্তানের দিকে তাকালেন তিনি। তারপর তাকালেন হাওরের জলে ডুব দিতে উন্মোখ সূর্যের দিকে এবং বললেন, ‘ময়না, তোর চাচিরে কঅ বাড়িত যাইতগা। সইন্ধা অইয়া গেছেগা। আউজ্জা আর যাইতামনা।’
26.09.10

মঙ্গলবার, আগস্ট ৩১, ২০১০

ছুটির বিড়ম্বনা

হুরমুর করে আরো একগাদা লোক আছড়ে পড়ল বাসের উপর। তিল ধারণের জায়গাটুকু পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। কিন্তু তবুও ঠেলে-ঠুলে ঠিকই ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে লোকগুলো। কেউ ঝুলে আছে দরজায়। আবার কেউবা উঠে যাচ্ছে ছাদে। ছাদ থেকে কয়েকজনের পা জানালার দিকে ঝুলে থাকতে দেখলো ময়না। ভাগ্যিস আগে আগে ওরা টিকেট কেটে সিটে বসতে পেরেছিলো। নাহয় ওদেরকেও হয়তো এভাবেই যেতে হতো। অবশ্য সিট না পেলে দাঁড়িয়ে যেতে রাজি হতেন না বাবা। শহরে যাবার পথেই যে এত ঝামেলা পোহাতে হবে তা ধারণাও করতে পারেনি সে। এমন জানলে কেনাকাটা করার জন্য বাবার সাথে আসার বায়না ধরতো না ময়না।
মুড়ির টিনের মতো বাসটি ঘট ঘট ঘট শব্দ তুলে এগুচ্ছে গরুর গাড়ির গতিতে। বেশি প্যাসেঞ্জার বোঝাই করেছে বলে নয়, এ বাসগুলোর প্রকৃতিই এমন। মাত্র ষোল কিলোমিটার দূরত্বের এ পথটুকু পাড়ি দিতে এক থেকে দেড় ঘন্টার মতো লেগে যায়। কারণ একটু পর পর থামরে, প্যাসেঞ্জার তোলরে, স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেলে ঠেলে ঠুলে স্টার্ট তুলরে ইত্যাদি আরকি। এখন মনে হচ্ছে রিকসায় গেলেই ভালো হতো। কিন্তু রিকসা যা ভাড়া চাইল তা শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো ওদের। ঈদের মৌসুমে ভাড়া তিন থেকে চারগুন হয়ে যায় কেন তা বুঝে আসছে না ময়নার।
ওহ্, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। বাসের গোমোট পরিবেশে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বাবা অবশ্য জানালার পাশের সিটেই বসিয়েছেন তাকে। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন বাবার গায়ের উপর যেভাবে হেলে পরছে, তাতে বাবাও খানিকটা চেপে বসেছেন ময়নার দিকে। লোকজনের ঘামের বোঁটকা গন্ধে পেট গুলিয়ে আসছে। ক্ষনে ক্ষনে উথলিয়ে উঠতে চাচ্ছে বমি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জানালার কাঁচ খুলে দিয়েছেন বাবা। এতে বাইরে থেকে বাতাস ঢোকছে বটে, সেই সাথে ঢোকছে ধুলো। মুহুর্তের মাঝেই ধুলোময় হয়ে গেল ময়না। ভেতর থেকে খ্যাট খ্যাট করে উঠলো কয়েকজন লোক
- এ্যাই ভাই জানালা খুলছুইন কেরে? বালু (ধুলি) আইতাছে।
- ছেরিডা বুমি করবঅ দেকতাছুইন না? মেয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলল তোতা মিয়া।
লোকজনের কটুক্তি আর ধুলির ঝড়ে বমি করতে ভুলে গেল ময়না। বন্ধ করে দিলো জানালার কাঁচ। চুপচাপ বসে রইলো জনারন্যের ভেতর।
- আহাইরে জানডা বাইরইয়া যাইতাছেগা। বিরক্তি প্রকাশ করল এক যাত্রী। তার কথাতে ধরলো অন্য আরেকজন
- জান বাইরইতনা, বাসের মইদ্যে মানুষ কট্টি (কতগুলো) লইছে দেখছনি। দুইন্নাইডার মাইদ্যে (দুনিয়াতে) যে কত মানুষ আছে ঈদের সময় অইলে দেহুন যায়।
- আরে অহনঅই মানুষের দেখছঅ কি, ঈদ তঅ আরো কয়দিন দেরি আছে।
- হেই কতা আর কইয়েননা ভাই। সারা দেশের মইদ্যে আউলাডাতঅ লাগবঅ ঈদের আগের দিন। অফিস আদালতে ছুটি থাহে মাত্র তিন দিনের। ঈদের আগের দিন সবাই শহর ছাইরা ছুডে গেরামের দিকে। কিন্তু কেউ ঠিক সময়ের মাইদ্যে যাইতে পারেনা। কেউ যায় ঈদের দিন। আবার রাস্তায় এক্সিডেন্ট কইরা কেউ পৌঁছতেই পারেনা।
- একবার না হুনছিলাম, সরকার নাকি এইবার থেইকা ঈদের ছুটি পাঁচদিনের করবঅ? হের পরেতো আর কোনঅ খবর-টবর হুনলামনা
- রোজার ঈদ অইল গিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসবের লাইগ্যা পাঁচদিনের ছুটি দিলে মানুষ ইকটু শান্তিতে গেরামের বাড়িতে গিয়া ঈদ করতঅ পারব।
- হুনছি অইন্য অনেক দেশে নাকি বড় উৎসবে বেশি দিনের ছুটি থাহে।
- অইন্য অনেক দেশে থাকলেই যে আমার দেশে থাকতে অইব, এমুন কোন কথা না। পাঁচদিনের ছুটি অইলে আমরার লাগি সুবিধা অয়, হেইডা অইল গিয়া বড় কতা।
যাত্রীদের একেকজনের একেক কথায় কান ঝালাপালা হয়ে উঠল ময়নার। গরম, বোটকা গন্ধ, বমির উদ্রেক সব মিলিয়ে চরম এক অস্থির সময় কাটছে ওর। আর এ অস্থিরতা নিয়েই সিটে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে ময়না। এগিয়ে চলছে বাস। বাড়ছে মানুষের কোলাহল
29.08.10

রবিবার, আগস্ট ১৫, ২০১০

উইল্লা চোরার উপলব্ধি

- তোতা মিয়া এক কেজি ছোলা দ্যাও।
বলে ধীরে-সুস্তে বেঞ্চিটায় বসল উইল্লা চোরা। শুনতে অশোভন এ শব্দটি ছাড়া তার সত্যি কোন নাম আছে কি না এ তথ্য ময়নার জানা নেই। এ নামেই সবাই তাকে চেনে। ‘উইল্লা চোরা’ অবশ্য তার নাম নয় বরং পরিচয়। ‘নামে নয় গুণেই পরিচয়’ আরকি। উইল্লা বিলাইয়ের (হুলো বিড়ালের) মত ছেঁচড়া চুরির অভ্যাস নাকি তার ছোটকাল থেকেই। অমুকের গাছের লাউটা, গাছ পাকা কাঁঠালটা, সব্জি ক্ষেত থেকে মুলাটা প্রায়ই উধাও হয়ে যেতো আগে। আর এসবের দায়ভার উইল্লা চোরার উপরই বর্তাতো। তার আতঙ্কে নাকি ঘর খালি রেখে গ্রামের মহিলারা পাড়া বেড়াতে পর্যন্ত পারত না। পাছে কোন জিনিসটা চুরি হয়ে যায়!
সেই হিসাবে এখন বেশ শান্তিতেই আছে গ্রামের মানুষ। কারণ আগের সেই ছ্যাঁচরা চুরির অভ্যাসটা ছেড়ে দিয়েছে উইল্লা চোরা। তাই বলে যে চুরি-চামারি থেকে অবসর নিয়েছে এমনটি নয়। এখনও দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে তার নামে দরবার আসে মাসে তিন কি চারবার।
- তুমি ছোলা দিয়া কি করবা? জিজ্ঞেস করল তোতা মিয়া
- কি করাম মানে, রোজা রমজানের দিন ছোলা ছাড়া ইফতার অয় নাকি?
- আসার্য্য কারবার! তুমি অইলা গিয়া চুর (চোর) মানুষ, তুমি হিবার রোজা রাখছ নাকি?
একটু যেন লজ্জ্বাই পেল উইল্লা চোরা। তারপর ঘাঢ় নুইয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল, আরে বেশতি কতা কইঅ না। আমি চোর অইতাম ফারি, কিন্তুক স্বভাব বালা আছে।
- তাইলে তুমি হাছাহাছি রোজা রাকছ! যেন আকাশ থেকে পড়ে প্রশ্নটি করল তোতা মিয়া।
- রোজা লইয়া কেউ মিছামিছি কতা কয় নাকি? চিন্তা করছি এইবার থেইকা রোজা থাহুনের অভ্যাস করাম।
- বেশ বালা চিন্তা। কিন্তুক রোজা থাইক্কা চুরি-চামারি করলে কি আর রোজা অইব?
- চিন্তা করছি এইসব ছাইরা দিয়াম। এই মাসটা দেহি ইকটু পাক-পবিত্র অইয়া আল্লা-বিল্লা কইরা কাডায়া দিতারি কিনা।
- তাইলে এইমাসে তোমার কুকাম বন্দ থাকব?
- হ
- খালি এই মাসে থাকবঅ নাকি সারা বছর? ঈদের পরেই হিবার পাপ কামানি শুরু করবা!
- আরে নাহ, কইলামনা বালা অইয়া গেছি।
- বালা অইয়া গেলে বালা কতা। হুনঅ একটা কতা কই, রমজান মাস অইল গিয়া সংযমের মাস। এই মাসে সংযমের অভ্যাস করনের লাই¹া আল্লায় কইছে। কারণ এই অভ্যাসের গতি যাতে সারা বছর থাহে। তুমি যুদি একমাস চুরি-চামারি ছাইরা বাঁচতে পার, তে সারা বছর পারতানা কেরে?
বাবার কথাটি বেশ ভালো লাগলো ময়নার। সাত্যিইতো একমাস ভাল হয়ে থাকতে পারলে সারাবছরইতো ভালো হয়ে থাকা যায়। দাদির কাছে সে শুনেছে রমজান মাস হলো অনুশীলনের মাস। রাতে সেহরি খাওয়া, ফজরের নামাজ পড়া, সকালে ঘুম থেকে উঠা, কাজে যাওয়া, ইফতার করা, তারাবির নামাজ পড়ার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সময় কাটে অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। রমজান মাসে শয়তানকে নিয়ন্ত্রন করে রাখা হয় বলে মানুষের মাঝে খারাপ কাজ করার প্রবণতা কমে যায়। উইল্লা চোরাই এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
ততক্ষনে এক কেজি ছোলার প্যাকেট তোতা মিয়ার কাছ থেকে বুঝে নিলো উইল্লা চোরা। তারপর হাত বাড়িয়ে দশ টাকার চারটি কড়কড়ে নোট এগিয়ে দিলো।
- আরও পাঁচ টেহা দেওঅন লাগবঅ। দাম অহন বাড়তি, তোতা মিয়ার এ কথাতে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো উইল্লা চোরা।
- আরে কি কও, ছোলার দাম অত বাইড়া গেছেগা!
- খালি ছোলার দাম কেরে, রোজা উপলক্ষে অনেক কিছুর দামঅই অহন বাড়তি।
- রোযা অইলঅ গিয়া সংযমের মাস। আর বাংলাদেশের ব্যবসায়িরা এই মাসে সংযম করবতো দুরের কতা, লুটপাটের উৎসব লাগাইয়া দেয়। রোজার মাইদ্যে আমি উইল্লা চোরা গেলাম বালা অইয়া, আর ব্যবসায়ীরা শুরু করল ডেহাইতি (ডাকাতি)। হায় আফসোস!

বুধবার, আগস্ট ১১, ২০১০

বিউটি বোর্ডিংয়ে এক দুপুর

আমি ও সোহেল অটল

মঙ্গলবার, আগস্ট ১০, ২০১০

বাতাস লাগছে বাতাস

মা সন্তানকে খুন করতে সহযোগিতা করে- কথাটা একদম বিশ্বাস করতে পারল না ময়না।
- আহা, কী ফুটফুটে চেহারা রে। বলতে বলতে পত্রিকাটা তোতা মিয়ার দিকে এগিয়ে দিল মন্তাজ উদ্দিন। ময়নারও কৌতুহল হলো তিন বছরের তানহাকে দেখতে। উঁকি দিলো পত্রিকার পাতায়। ইস, ডাগর চোখের কী মায়াবি চাহনি! ফোঁকলা দাঁত। কপালে কাজলের টিপ। মেয়েটাকে আদর করে এ টিপ কে পড়িয়ে দিয়েছিলো? ‘আয় আয় চাঁদ মামা/টিপ দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ/টিপ দিয়ে যা...’ ছড়া কাটতে কাটতে মায়েরাইতো এ কাজটি করে থাকে। তানহার ক্ষেত্রেও নিশ্চয়-ই এর ব্যতিক্রম হয়নি। হয়তো ছড়ার ছন্দে ছন্দে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওকে কাজল কালো করেছিলো মা-ই। তারপর চুমুতে চুমুতে কপাল ভরিয়ে ভনিতা করে বলেছিলো, এইতো আমার চাঁদের (তানহার) কপালে চাঁদ এসে টিপ দিয়ে গেলো। হ্যা, তখন তো মায়ের কাছে চাঁদের মতোই ছিলো তানহা। অমাবশ্যার অন্ধকার দূর করে মায়ের কোল জুড়ে সে এসেছিলো পূর্ণিমার চাঁদ হয়েই। দ্যুতি ছড়িয়েছিলো মায়ের মনে। সত্যিই কি তাই? এমনটিই তো হওয়ার কথা। ময়নার দেখা সব মায়েরাইতো এমন । মায়ের উষ্ণতাই সন্তানের প্রথম আশ্রয়। মাকে ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারে না ময়না। কিন্তু কী এমন ঘটনা ঘটল যে, তিন বছরের ছোট্ট শিশুর মৃত্যু হলো নিজের মায়ের কারণে! অপরাধটা ছিলো কার, শিশুর নাকি ওর মায়ের? অপরাধ যার-ই হোক। কী কারণে একজন মা নিজের কোল থেকে পূর্ণিমার চাঁদ দূরে ঠেলে দিতে চাইবে? কোন অমোঘ টানে? তাহলে কি এখন মায়েরাও বদলে যাচ্ছে। সন্তানরা কি এখন মায়ের কোলেও নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারবে না!
- ও পুতু (চাচা) পুতুগো, তানহা কি মা’রে (মাকে) ত্যক্ত (বিরক্ত) করতঅ?
- নাহ্। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক কথায় জবাব দিলো মন্তাজ উদ্দিন। কিন্তু মন্তাজ চাচার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারটা মোটেই আঁচ করতে পারলো না ময়না।
- তে (তাহলে) ছেরিডা কী দুষ করছিন (করেছিলো) যে একবারে মাইরালান লাগব (মেরে ফেলতে হবে)!
- এই ছেরি চুপ র্ক। মুরুব্বিরার কতার মইদ্যে কতা কওঅন (বলা) বালানা। ধমকে উঠল তোতা মিয়া।
বাবার ধমকে একেবারে চুপসে গেলো সে। আর কথা বলার সাহস হলোনা। তারপরও ক্ষীণ একটি আশা ধরে রেখেছিলো যে, অন্তত: ভদ্রতার জন্য হলেও মন্তাজ চাচা বুঝি তার কৌতুহল নিবৃত্ত করবে। কিন্তু ওদিক থেকেও কোন সাড়া না পেয়ে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো ময়নার। চুপচাপ বসে রইল বাবার পাশে। মনযোগ দিলো অন্য কাজে। ভাব দেখালো যেনো এদিকের কোনো কথাতেই তার কান নেই।
- কী কইবা তোতা মিয়া, খালি পরকিয়া আর খুন না, আমরার দেশটা অহন নানা অপরাধে ভইরা যাইতাছে। ‘সামাজিক মূল্যবোধ’ কইতে (বলতে) একটা কতা আছে। হেই মূল্যবোধ কইম্মা যাইতাছে। কইম্যা যাইতাছে মানুষের নীতি-নৈতিকতা।
- হ, বাইছা (ভাই সাহেব)। তুমি উচিত কতা কইছঅ। আমরার সমাজ কিমুন জানি বদলাইয়া যাইতাছে। সবচে আপন বন্ধনগুলাও অহন ভাইঙ্গা চুরমার অইয়া যাইতাছে।
- বাতাস লাগছে বাতাস। একটা কতা কই হুনঅ, তুমি যুদি কোনো জাতিরে ধ্বংস করতা চাও, পইলা (প্রথমে) হেই জাতির সংস্কৃতি আর মূল্যবোধগুলা ধ্বংস কর। হেরপরে দেখবা আপনা-আপনি হেই জাতি এক অমোঘ নেশায় বুঁদ অইয়া যাইব। মেরুদণ্ড খাড়া কইরা দুইডা কতাও কইতে পারবনা।
- আমরারেও এমুন নেশার বাতাসে পাইছে নাকি?
- লক্ষণ খারাপ। জিরজিরায়া (ঝির ঝির করে) আজইরা (অশুভ) বাতাস ঘিইরা ধরতাছে আমরারে। আমরা ঠ্যাঙ্গের উপরে ঠ্যাঙ্গ তুইল্লা ঝিমাইতাছি। আমরার সরকারের তঅ এইদিকে কোন মনযোগঅই নাই। হেরা অহন ব্যস্ত নানান আজাইরা কামে। আর হেই সুযোগে খুন, রাহাজানি, ডাকাইতি, পরকিয়ায় ভইরা যাইতাছে দেশ। আর মানুষের কাছেও এউগুলা গা সওয়া অইয়া গেছে।
- হঅ, আজাইরা কামে মানুষের টেহা (টাকা) খরচ করতাছে। আমরার চিন্তাভাবনা থেইকা নীতি-টিতি একবারে উইট্টা গেছেগা দেহি!
-নীতিটিতির কতা আর কী কও তুমি! হেদিন পত্রিকার মইদ্যে দেকলাম গত এক মাসে সারা দেশে খুনঅই অইছে ২৮০ জন! অইন্য কতা নাঅয় বাদ অই দিলাম।
- পাবলিক এক্কেবারে ত্যক্ত বিরক্ত অইয়া গেছেগা। হুনলাম আওমী লীগের (আওয়ামী লীগের) এক নেতাও নাকি ত্যক্ত-বিরক্ত অইয়া কইছে যে দেশ বিপদের দিকে আউ¹াইতাছে?
- হ, তুমি ঠিকঅই হুনছঅ। কতা তঅ হাছা। পুরা তাইজ্জব কাণ্ডকারখানা শুরু অইয়া গেছে। প্রধান বিচারপতির মুখ দিয়া পর্যন্ত বাইরঅইছে যে, দেশঅ অহন ন্যায্য কতাডা পর্যন্ত কওনের স্বাধীনতা নাই।
এতক্ষণে ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠলো ময়না। ভেবেছিলো কান খাড়া রাখলে হয়তো তানহা হত্যার রহস্য কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারবে সে। কিন্তু বাবা আর মন্তাজ চাচার কথাগুলো এমন দিকে মোড় নিয়েছে, যা ওর বোঝার কথা নয়। কিন্তু তবুও যে বোঝার চেষ্টা করে নি এমনটি নয়। আর চেষ্টা করলে কিছুনা কিছু তো সফল হওয়াই যায়।

রবিবার, আগস্ট ০১, ২০১০

জামাই আইছে আনন্দে

আজ ময়নার মেয়ের বিয়ে। আয়োজন নিয়ে মহা ব্যস্ত সে। এক মুহূর্ত অবসর নেই। মেয়েটাকে কিনে এনেছিল বৈশাখী মেলা থেকে। সেই থেকে ওর সংসারেরই সদস্য সে। নিজের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছে গয়না। তারপর চিকচিকে জরির একটি গয়না পরিয়েও দিয়েছিল গলায়। কিন্তু সেটা যে কবে উধাও হয়ে গেল, তা বলতেই পারছে না ময়না। এমনকি মেয়েটাও মুখ ফুটে বলছে না যে কেউ গলা থেকে খুলে নিয়েছে, নাকি খেয়ালের বশে নিজেই হারিয়ে ফেলেছে। না না, গয়না কথা বলতে পারে না এমনটি নয়। প্রতিদিনই ময়নার সাথে কত্ত কথা হয়। অবশ্য শব্দ করে কিছুই বলতে পারে না সে। শত হলেও পুতুল তো! তাই ওর মনের ভাষা বুঝে নিতে হয় ময়নাকেই। এর জন্য কোনো দুঃখ নেই ময়নার। কারণ সে জানে পুতুলরা কখনো কথা বলতে পারে না। তবে মায়ের কাছে তাদের থাকে হাজারো আবদার। এই যেমন খাইয়ে দাও, পরিয়ে দাও, আদর করো, ঘুম পাড়িয়ে দাও। এসবের কোনো কাজই বাকি রাখে না ময়না। একেবারে খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম পাড়ানো পর্যন্ত সবকিছু সে-ই দেখাশোনা করে।
এমন আদুরে মেয়েকে বিয়ে দিতে কিছু তো খারাপ লাগছেই ময়নার। খারাপ লাগলেই আর কী? মেয়ে যেহেতু আছে আজ নয় কাল বিয়ে তো দিতেই হবে। তবে এত বিচ্ছেদ-বিরহের মাঝেও বেশ আনন্দই হচ্ছে ওর। কারণ পাত্র হিসেবে পারভিনের ছেলেটা একেবারে রাজপুত্র। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো পারভিনের সাথে একটা সম্বন্ধ তৈরি হোক, এমনটাই চাইছিল সে। হঠাৎ সে দিন বলা নেই, কওয়া নেই পারভিনই প্রস্তাব করে বসল ময়নার সাথে সই পাতবে। আর যায় কোথায়, দু’জনে মিলে ঠিক করল দিনক্ষণ। আরো ঠিক করল এই দিনেই হবে ওদের পুতুল বিয়ে। এতে নিজেদের মাঝে সম্পর্কটা আরো গাঢ় হবে। ব্যস, যেই কথা সেই কাজ।
আজ সেই কাক্সিত দিন। মহা ধুমধামে চলছে আয়োজন। ময়নার সখীরা সবাই উপস্থিত। উপস্থিত এক দঙ্গল ছেলেমেয়েও। বাঁশের কঞ্চি আর পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্যান্ডেল। একে ঘিরেই সবার ব্যস্ততা। এই বাটনা বাটরে, কুটনা কুটরে...। একটু বড়সড় টোপায় (খেলনা পাতিলে) ভাত চড়িয়েছে ময়না। টোপার ভেতরে যে ভাতের বদলে বালি ভর্তি, এ খবর কারো অজানা নয়। কিন্তু তবুও সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে কখন রান্না শেষ হবে, তারপর বর আসবে। আর ক্বল-অ, ক্বল-অ ধরনের অদ্ভুত শব্দ করে খাওয়ার ভান করবে সবাই। সেই সাথে হবে ময়না-পারভিনের সই পাতাপাতি। দু’জনের মাঝে তৈরি হবে নতুন একটি সম্পর্ক। প্রতিজ্ঞা করবে পরস্পরের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্নার অংশীদার হওয়ার। বন্ধুত্ব গড়ার সেই আনুষ্ঠানিক মুহূর্তটিকে ত্বরান্বিত করতেই এত ব্যস্ততা। আশপাশের ঝোপে বাজার করছে কয়েকজন। এরই মাঝে কাল্পনিক নানা কেনাকাটা করে ফিরেও এসেছে দুলাল। ওর ঝুলি ভর্তি ইটের সুড়কির মাংস, পাতার মাছ আর নানা ধরনের তরকারি। মেলা থেকে কিনে আনা টিনের বঁটি দিয়ে তরকারি কাটায় ব্যস্ত হয়ে গেল একজন। তারপর চুলায় ফুঁ দাওরে, আগুন জ্বালরে...। অবশেষে রান্নাবান্না শেষ হলো ময়নাদের। এরই মাঝে খবর এলো বরযাত্রা শুরু গেছে। এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠল সবার চোখ। এবার ওরা ব্যস্ত হয়ে উঠল গয়নাকে নিয়ে। ইস্ লাল টুকটুকে শাড়ি পরে আছে ও। একদম চুপ মেরে বসে আছে। ময়নাও দৃষ্টি ঘুরালো ওর দিকে। ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
এলোমেলো বাদ্যের শব্দে কানে তালা লাগার মতো অবস্থা। বরযাত্রীদের মাঝে বেশ কয়েকটি ছেলের গলায় ঝুলানো রয়েছে ঢোল। কোরবানির গরুর পর্দা ভাঙা কলসের মুখে সেঁটে প্রতি বছরই ওরা এগুলো তৈরি করে। তারপর যখন ইচ্ছা তখন বাজায়। আজ কচুর ডাঁটা দিয়ে এমনভাবে বাজাচ্ছে যেন ঢোল এবং কানের পর্দা ফাটিয়েই ছাড়বে। কাছাকাছি চলে আসতেই পারভিনের ছেলেটাকে দেখতে পেল ময়না। ইস্ কি সাজে সেজেছে ও! রাজপুত্র যে একেবারে রাজপুত্রের মতোই। মাথায় টোপর, গলায় পুঁথির মালা। আসছে ঘোড়ায় চড়ে। আর ঘোড়াটা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বিয়ারিংয়ের গাড়িতে। সবাই বিপুল উৎসাহে টেনে নিয়ে আসছে গাড়িটাকে। কনে পক্ষের তৈরি পাট শোলার তোরণের সামনে এসে থামতেই হলো ওদের। তারপর দরকষাকষি। অবশেষে কাঁঠালপাতার টাকা বিনিময়ের মাধ্যমে সমঝোতা।
তোরণ উন্মুক্ত করে দাঁড়ালো ময়নারা। রাজপুত্রের মতো বর প্রবেশ করল পাতার ছাউনিতে। কোরাস তুলল এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে ‘চম্পা ফুলের গন্ধে/জামাই আইছে আনন্দে/চম্পা ফুলের সুবাসে/জামাই আইছে আহাসে...’

রবিবার, জুলাই ২৫, ২০১০

আলী আক্কাসের অবস্থা ভালো নয়

আলী আক্কাস একজন রিকশা চালক। গ্রামগঞ্জে নয়, একেবারে রাজধানীর অলি-গলি চষে বেড়ায় তার বাহন। দুইদিন হলো বাড়িতে এসেছে সে। এখন আড্ডা মারছে তোতা মিয়ার দোকানের সামনে। হাতে প্রায় শেষ হয়ে আসা একটি বিড়ি। মুখ থেকে গল গল করে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে ধোঁয়ার গুলতি। যথেস্ট মনযোগ দিয়ে টানছে। কারণ শেষের দিকে যে কোন সময় আগুন খসে পড়তে পারে। আর শেষ টান মানে সুখ টান। সতর্ক আলী আক্কাস সুখ টান থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাত্র নয়। অবশ্য আরও অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হতে চায়না সে, তবুও হতে হয়। এই যেমন তিনবেলা খেয়ে-পরে থাকতে পারা আর রোগ বালাইয়ে ঠিক-ঠাকমতো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রাখে সে। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে এসব মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে হয় তাকে, আর বাকিগুলো নাহয় বাদ-ই থাকলো। কেবল বিড়ির উপরই তার যত অধিকার খাটে, অন্য কোথাও নয়। অবশ্য ধোঁয়ার একেকটি গুলতির সাথে যে একটু একটু করে জীবনীশক্তিও বাতাসে ভেসে যাচ্ছে-এ তথ্যও তার অজানা নয়। সেই ছোটবেলায় শুনেছিলো ‘আই এম এ ডিস্কু ড্যান্সার/বিড়ি খাইলে হয় ক্যান্সার’। বিড়ি খেলে ক্যান্সার হয় এটা শুনতে শুনতেই বিড়ির প্রতি আগ্রহ জন্মে। আর তখন থেকেই শুরু, এখন পর্যন্ত ছাড়তে পারেনি। কোনো দিন পারবে কি না জানা নেই।
- কীগো আলী আক্কাস, এমুন চুপচাপ বইয়া রইছ কেরে? ডাহার (ঢাকার) কিছু খবর-টবর হুনাও আমরারে। দেশের অবস্তা (পরিস্থিতি) কবে বালা অইব?
তোতা মিয়ার কথার জবাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু কাশির দমকে ভেতরেই আটকে থাকলো কথা। খুক্ খুক্ করে নয়, কাশির শব্দটা হলো খন্ খন্ ধরনের, একেবারে খনখনে বুড়োদের মতো। অথচ তার বয়স খুব হলে চল্লিশ কী বিয়াল্লিশ হবে।
- আরে, আরে থাউক। দেশের অবস্তা কউন লাগদনা। তোমার নিজের অবস্তাই দেহি বালা না। বিড়ি খাইতে খাইতে শইলডারে আঙরা বানায়া দিছ।
প্রচন্ড শ্বাসকষ্টের মাঝেও না হেসে পারলনা আলী আক্কাস। খা.....ক্ করে একদলা কফ নিক্ষেপ করল দূরে। কথা বলার আগে ছুঁড়ে ফেললো বিড়ির শেষ অংশটুকু।
- দেশের অবস্তাও আমার মতোই। আমি যেমুন কবে বিড়ি খাওয়া ছারতারাম (ছাড়তে পারব) জানিনা। আমরার দেশের অবস্তাও কবে বালা অইব জানি না।
- এইডা হিবার কিমুন ঢঙের কতা হুনাইলা?
- ঢঙের কতা না গো ঢঙের কতা না। ডাহা শহর অইল বাংলাদেশের রাজধানী। অইহানে বইয়া থাইক্কা পুরা দেশের ছবি দেহুন যায়। দেশের অবস্তা অহন বালা না। মানুষে মানুষে ভাগ অইয়া যাইতাছে। মানুষের পইসা খরচ অইতাছে নানান আজাইরা কামে। আর এইসব কামের ভোগান্তিও যাইতাছে মানুষের ওপরে দিয়াই।
- হঅ, সব কিছু কিমুন জানি আউলা-ঝাউলা (এলোমেলো) অইয়া যাইতাছে। সায় দিলো তোতা মিয়া।
- আউলা-ঝাউলার কতা আরঅ কও তুমি! নিজের মতঅ চলন-ফিরনেরও অহন স্বাধীনতা নাই। তোমার মুহঅ দাড়ি থাকলে পুলিশে তোমার দিকে বেকা অইয়া চাইবঅ। মাথার মইদ্যে টুপি থাকলে মাথা নুয়াইয়া চলুন লাগবঅ!
- হঅ, এইডা কইছঅ ঠিক কতা। পুরা আসায্য (আশ্চর্য) কারবার শুরু অইয়া গেছে। খালি তোমরার ডাহা শহরঅই না, আমরার গাঁও গেরামের মাইদ্যেও এইরহম অইতাছে। শান্তি কি পুরাপুরি আরায়া (হারিয়ে) যাইবগা নাকি?
- শান্তির আশা আর কইর না। শান্তির মা মইরা গেছে। দেশঅ অহন মানুষ গুম অইয়া যাইতাছে, খুন অইতাছে, আর জিনিসপত্রের দামতঅ বারছেই।
- দিন যাইতাছে আর আমরা দেহি অনিরাপদ আর কঠিন জীবনের দিকে আউ¹াইতাছি (এগিয়ে যাচ্ছি)! দীর্ঘশ্বাস ফেলল তোতা মিয়া।
- আমি কি আর সাধে কইলাম যে, দেশের অবস্তা আমার মতই!
নিজেকে নিয়ে আলী আক্কাসের হেয়ালি শুনে গলা ছেড়ে হেসে উঠল তোতা মিয়া। হাসল এতক্ষন চুপচাপ বসে থাকা ময়নাও। দেশের অবস্থা কেমন তা ওর বোঝার কথা নয়। তবে আলী আক্কাসের অবস্থা যে খুব একটা ভালো নয়, এটা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে ময়না।
২৫ জুলাই ২০১০

শনিবার, জুলাই ২৪, ২০১০

বর্ষাযাপন!



বলুন তো আজ শ্রাবণের কততম দিন? পারছেন না তাইতো? আজকের নয়া দিগন্ত দেখুন, উত্তর পেয়ে যাবেনবর্ষা তো শেষ হতে চলল, বর্ষাযাপন করেছেন? করেননি! ক্যামনে করবেন? ‘ব্যস্ততা মোরে দেয় না অবসর’।
প্রিয় পাঠক, আপনার বর্ষাযাপন’র দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাপ্তাহিক প্রকাশনা অবকাশ ও থেরাপি। এই দুটি ম্যাগাজিনের সকল লেখক ও আগ্রহী পাঠকদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে বর্ষাযাপনের। বলুনতো কোথায়? কোথায় আবার! কিশোরগঞ্জের দিগন্ত বিস্তৃত হাওরে!
চারিদিকে অথৈ পানি। মাঝখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ওখানেই বড়শি ফেলে বোয়াল মাছ ধরার চেষ্টা করছেন আপনি। ভাবুন তো দৃশ্যটি! হ্যা, সত্যিই এ সুযোগ হবে বর্ষাযাপন এ। আরো থাকবে দিনভর হৈ-চৈ, জলকেলি, বিনোদন কত কিছু!
তাহলে যাচ্ছেন তো বর্ষাযাপন করতে? যেতে চাইলে নাম রেজিষ্ট্রশন করুন ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে। যাচ্ছি কবে? ৫ আগষ্ট রাতে। ঢাকায় ফিরব ৭ আগষ্ট সকালে।
যোগাযোগ- ০১৭১১১১৫১৬৫

রবিবার, জুলাই ১৮, ২০১০

মন্তাজ চাচার কথাই ঠিক

দক্ষিণ দিক থেকে সরু ঢেউ অলস খেলতে খেলতে ভীরছে ঘায়েলে (ভাঙন থেকে বসতভিটা রক্ষার জন্য কচুরিপানা আর খড়ের স্তর)। মৃদু বাতাসের ঠেলায় ঘায়েল ঘেষে কোণঠাসা হয়ে আছে কচুরিপানা, শ্যাওলা-ঝাউলা। এমনভাবে স্থির হয়ে আছে যেন পানির উপর তৈরি করেছে সবুজাভ সর। এ সবুজ সরকেই কেটে কোটে ঠেলা জাল ঠেলছে সবুজ। আর ডাঙায় ডোলা হাতে দাঁড়িয়ে ময়না। সবুজের একেকটি খেউয়ে জাল ভর্তি হয়ে উঠছে শ্যাওলা আর শ্যাওলা। তারপর এগুলো ঝেড়ে ফেলে চিংড়ির খনি আবিষ্কার করার দায়িত্ব ময়নার উপরই। শ্যাওলার ভাঁজ খুলে খুলে একটা-দুটো চিংড়ি ডোলায় ভরতে ভরতেই জালের টোনায় ঝিলিক দিয়ে উঠে ছিট পারতে থাকা এদলা চিংড়ি। এতক্ষনে ডোলা প্রায় অর্ধেক হয়ে এসেছে। আর কয়েকটি খেউ দিয়েই আজকের মতো ক্ষান্ত হবে, ভাবছিলো সবুজ। কিন্তু উঠাৎ উদয় হওয়া কোষা নৌকাটিই ঘটালো যতো বিপত্তি। বলা নেই কওয়া নেই, নি:শব্দে ভেসে এসেছে ঠিক সবুজের পাশেই। পানিতে বৈঠা ফেলার শব্দটি পর্যন্ত তার কানে আসেনি। চরম বিরক্ত হয়েই তাকালো কোষার মাঝির দিকে। তারপর ভ্যাবাচেকা খেলো। মাথা নুইয়ে নিলো সসম্মানে, বৈঠা হাতে বসে আছে স্বয়ং মন্তাজ উদ্দিন!
- কি সবুজ মিয়া, পড়ালেহা থুইয়া দেহি জাল ঠেলায় মনযোগ দিছস! কিশোরগঞ্জেত্তে কবে আইলি?
- পরশুদিন আইছি পুতু (চাচা)
- কলেজ বন্ধ নাকি?
- না বন্ধ না। এইচএসসি পরীক্ষার রিজাল্ট দিছে ত-অ, এর লাইগ্যা কয়দিন ডিলাডালা কাস অইতাছে।
- তরার কলেজের রিজাল্ট কিমুন অইছে?
- বালাই। জিপিএ পাঁচ পাইছে আঠারজন। দুইডা ছেরা খালি ফেইল করছে।
জাল ঠেলা বন্ধ হয়ে গেলো বলে উদ্দম্যে ভাটা পরেছে ময়নার। খানিকটা বিরক্ত হয়ে তাকালো মন্তাজ চাচার দিকে। কিন্তু তার বিরক্তিতে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই দেখে আশাহত হলো সে। এমনিতেই বার বার ডাঙায় উঠে যেতে চাচ্ছিলো সবুজ ভাই, এখনতো আর কথাই নেই। যা ধারণা করেছিলো ঠিক তাই। পরিষ্কার পানিতে এপাশ-ওপাশ করে জাল ধুয়ে নিতে দেখলো সে। অর্থাৎ আজকের মতো মাছ ধরা এখানেই সমাপ্ত। বাধ্য হয়ে কাঠখোট্টা আলাপচারিতায় মনযোগ দিলো ময়না।
- আমার ত-অ খালি ডর করতাছে পুতু। আমরার মত গরিবের বালা রিজাল্ট কইরা কোন দাম নাই।
- আরে ডরের কি আছে বেক্কল। মনযোগ দিয়া পর, বালা রিজাল্ট কর।
- কি অইব বালা রিজাল্ট কইরা। এইবার দেহ সারা দেশ-অ আটাইশ হাজার ছয়শ’ একাত্তর জন জিপিএ পাঁচ পাইছে। এরার মইদ্যে কয়জন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অইতে পারব? টেহাওয়ালারার লাইগ্যাতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছেই। কিন্তু আমরা যায়াম কই?
- কতা তুই মন্দ কইছসনা। আমরার দেশে আছে খালি যত আউলা নিয়ম। এইযে পুলাপাইনগুলা পাস কইরা বাইর অইতাছে, এরা কই ভর্তি অইব, কি পড়ব, এরার ভবিষ্যৎ কি এইসব লইয়া সরকারের বিন্দু মাত্র চিন্তা নাই।
- এর লাইগ্যাইতো মাজে মইদ্যে পড়ালেহা ছাইরা দিতে ইচ্ছা অয় পুতু।
- আরে ধুরু, তুই খালি অলক্ষির মত কতা কছ। সমস্যা অনেক থাকব, হের লাইগ্যা কি ঘরে বইয়া থাহুন লাগব! মনে রাহিস উপরে আল্লাহ আছে। বালা কইরা পড়ালেহা কর, এইসএসসিতেও জিপিএ পাঁচ পাইয়া গেরামের মুখ উজ্জ্বল কর।
কি-সব জিপিএ পাঁচ-টাচ নিয়ে যে ওরা কথা বলে, একদম ভালো লাগেনা ময়নার। জিপিএ পাঁচ, এ প্লাস এসব শব্দ প্রায়ই কানে আসে ওর, কিন্তু কোন কিছুর অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি। তার কাছে সোজা হিসাব, পাস-ফেল। অবশ্য গত এসএসসি পরীক্ষায় রেজাল্টের ব্যাপারটা ছিলো ভিন্ন। তখন সবুজ ভাই জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলো, আর সারা গ্রামের মানুষের সেকি আনন্দ! আনন্দ হয়েছিলো তারও। সেই থেকে সে বুঝে গেছে জিপিএ পাঁচ হলো ভালো ফলাফল। কিন্তু সবুজ ভাইয়ের ভাল ফলাফল সত্ত্বেও তখন ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো শাহজাহান আলী, সারা দেশে নাকি এত ছাত্র জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলো যে তাদের ভিড়ে খেটে খাওয়া সবুজ ভাইয়ের কোন স্থানই হবেনা। শাহজাহান আলী বলেছিলো লেখাপড়া নাকি পয়সা ছাড়া হয়-ইনা। কই লেখাপড়াতো বন্ধ হয়ে যায়নি তার! কিশোরগঞ্জ শহরে লজিং থেকে, টিউশনি করে ঠিকঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে সবুজ ভাই। আসলে মন্তাজ চাচার কথাই ঠিক, উপরে আল্লাহ আছে।
- কিরে ময়না, মাছ কিমুন পাইলি?
জবাবের অপেক্ষা না করেই মারছার (পাটাতনের) নিচে বৈঠাটা চালান করে দিলো মন্তাজ উদ্দিন। তারপর এক লাফে নেমে এলো ডাঙায়। আমগাছের শেকড়ের সাথে কোষাটা বেঁধে ঢোঁ মারলো ডোলার ভেতর। তারপর সবুজের সাথে কথা বলতে বলতে হাটা ধরলো গোপাট (মেঠো পথ) ধরে। ঠেলা জালটা কাঁধে তুলে পেছন পেছন এগুলো সবুজ, গা থেকে নিংড়ে ঝরছে পানি। চিংড়ির ডোলা হাতে পা বাড়ালো ময়নাও, হাওরের জলে কোণঠাসা সবুজ রঙের শ্যাওলা-ঝাউলা পেছনে রেখে এগিয়ে চললো সবুজ এবং মন্তাজ উদ্দিনকে অনুসরণ করে।
১৮ জুলাই ২০১০