মঙ্গলবার, মার্চ ১৩, ২০১২

শত্রুতা করার সময় কই?



শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
অবশেষে ৩০০তম সংখ্যায় পদার্পন করল থেরাপি। কিন্তু কিভাবে করল, এর পেছনে অনেক কাহিনী।
সব কথা প্রকাশ করতে চাই না। তাতে সোহেল অটলের (থেরাপির বিভাগীয় সম্পাদক) সাথে শত্রুতা বেড়ে যেতে পারে। হাজার হোক আমরা প্রতিবেশি। একে অপরের শত্রু হলেও পাশাপাশি দু’টি ডেস্কে বসি। প্রতিবেশির সাথে সদ্ভাব রাখা উচিত। না হয় যে কোন সময় নাশকতা ঘটতে পারে।
এবার নিশ্চয়ই বলবেন- সোহেল অটল এমন লোক নন।
মুখ দেখে কি লোক চেনা যায়? থেরাপির বিভাগীয় সম্পাদককে চিনতে হলে অবকাশের ২৫০তম এবং ৩০০তম সংখ্যা দুটি পড়তে হবে। আর যারা পুরনো সংখ্যা খোঁজাখুঁজির ঝক্কি নিতে রাজি নন, তাদের জন্য হালকাপাতলা বিবরণ দিচ্ছি-
আমরা দু’জন একই সাথে দু’টি ম্যগাজিনের দায়িত্ব পেলাম। কথা ছিল মিলেমিশে কাজ করব। কিন্তু কে রাখে কার কথা। শুরু হলো শত্রুতা।
কিভাবে শুরু হলো?
শুনুন তাহলে সে কথা- আমি শান্তশিস্ট ভদ্র লোক। নীরবে পড়ে থাকি অবকাশ নিয়ে। কৌতুহল হলে উঁকিঝুঁকি মারি থেরাপির ডেস্কে। মাঝে মাঝে টুকটাক নিন্দা করি। শত্রুতা করার সময় কই?
কিন্তু একদিন আমাকে নড়েচড়ে বসতেই হলো। খেয়াল করলাম, শাহাবুদ্দীন ভাই (আহমেদ শাহাবুদ্দীন, নয়া দিগন্ত’র ফিচার এডিটর) এর রহস্যজন আচরন। তিনি আমার হাতে ঘন ঘন নোটিশ ধরিয়ে দিচ্ছেন। নোটিশে লেখা থাকে ‘আগামি সপ্তাহে অনিবার্য কারনে অবকাশ বন্ধ থাকবে’ ধরনের কথা। অন্যদিকে থেরাপির সংখ্যাগুলো তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। লোক দেখানোর জন্য সোহেল অটলকেও নোটিশ দিচ্ছেন, তবে আমার তুলনায় নিতান্তই কম।
ঘটনা কী! এর পেছনে নিশ্চয়-ই কারো হাত থাকতে পারে। লম্বা হাত। সন্দেহের তীর ছুটলো অটলের দিকে। শুধু সন্দেহই নয়, গোপন সূত্রে খবর পেলাম তিনি রীতিমত উঠেপড়ে লেগেছেন আমার বিরুদ্ধে। অবকাশের সংখ্যা বন্ধ রাখার জন্য যতরকম চেস্টা-তদবির প্রয়োজন সবই করছেন অটল।
পরের ঘটনা ঘুরে দাঁড়ানোর। মাঝে মাঝেই রান আউন হতে লাগলো থেরাপি। কখনো ক্রিজের অর্ধেকটা দৌড়ে, কখনো কাছাকাছি পৌঁছে। অন্যদিকে সোহেল অটলের চোখের সামনেই থেরাপির আগে ত্রিপল সেঞ্চুরি পূর্ণ করল অবকাশ। জয় হলো আমার।
কিভাবে ছিনিয়ে আনলাম জয়!
বিস্তারিত রণকৌশল ব্যখ্যা করা যাবে না। তবে এতটুকু বলে রাখি- দাবার ঘুঁটি পাল্টে গেলো নতুন মোটর সাইকেল কেনার পর। অর্থাৎ সোহেল অটল যেদিন ওই বাহনটি কিনলেন, সেদিন থেকেই উড়ে বেড়াচ্ছেন। এগজস্ট পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে মনের আনন্দে চলাফেরা করছেন। আর আমি শাহাবুদ্দীন ভাই এর সাথে চা খাই। মাঝে মাঝে এক কাপের যায়গায় দুই কাপও খাওয়া হয়।

রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১২

পাতালপুরে

যেইনা রানি পা ডুবালো
দুধের তলে
অমনি হঠাৎ দুধের সাগর
ওঠলো টলে।
লাটিম যেমন বেহুঁশ হয়ে
ঘোরতে থাকে,
তেমনি ঘোরে সাগর যেন
ওড়তে থাকে।
পাতারানি পাতার নায়ে
ঠাঁয় তখনো
ঘূর্ণিপাকে ঠিক থাকা কি
যায় কখনো?
যায় না বলেই নৌকা থেকে
অযূত দূরে
ছিটকে গেলো দ্বীপের রানি
পাতালপুরে ।

পাতার নাও

পাতাদ্বীপের রানী পাতা।
কোথায় তবে
রানীর নাও?
কোথায় সেটা নোঙর করে
কোথায় আবার
ভাসায় গাও?

আচ্ছা, একি বলছো যা তা!
পাতা রানীর
পাতার নাও
পাতাদ্বীপে নোঙর করে
দুধ-সাগরে
ভাসায় গাও।

গা ভাসিয়ে দিব্যি চলে
পাতালপুরীর গল্প বলে
পাতার নাও।
পাতারানী নাওয়ে ভেসে
দুধ-সাগরের অতল দেশে
ভেজায় পাও।

শুক্রবার, জানুয়ারি ২৭, ২০১২

মেঘে ঢাকা তারা


শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

ফাহমিদা নবীর গান কখনো ঝিলিমিলি স্বপ্নাবেশ। কখনো এক বিকেল রোদ অথবা ভরা জোসনা। তার জীবনও কিন্তু সরলরেখা নয়। এঁকেবেকে চলা নদীর মতোই। এই জীবন-যৌবনের ভাঁজে ভাঁজে আছে অনেক অন্ধকারও। ঠিক মেঘে ঢাকা তারার মতো।
৪ জানুয়ারি এই শিল্পীর জন্মদিন। এ উপলে তার প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা

হাসি আর ফুল। এ দুটো অনুষঙ্গ এক করলে যে ছবিটি দাঁড়ায়, সেটা হলো ফাহমিদা নবীর। ফাহমিদা নবী মানে হাসি, ফাহমিদা নবী মানেই ‘চুলে তাহার সাদা ফুল’। অর্থাৎ তিনি সুন্দর- ভেতরে ও বাইরে। জীবনকেও সাজাতে চান সুন্দর করে, ঠিক ফুলের মতোই।
একখন্ড ছাদ। পাশে ধানমন্ডি লেক- শ্যঁওলা পড়া জল, ঢালে বিছানো ঘাসের কার্পেট, গাছের ছায়া, ফুল, পাখি, প্রজাপতির ওড়াওড়ি। মোটকথা শান্ত প্রকৃতি ঘিড়ে রেখেছে ছাদটিকে। আর এ ছাদের তলায়-ই ফাহমিদা নবীর ছিমছাম একটি ফ্যাট। ড্রয়িংরুমে সাজানো গাছের গুঁড়ি, লতা-পাতাসহ প্রকৃতির নানান অনুষঙ্গ।
কি কারণ?
‘কারণতো একটাই। আমি প্রকৃতির মেয়ে, প্রকৃতিকে ভালোবাসি। ঘর সাজানো আমার শখ। মানুষের মনের সৌন্দর্য্যটাকে ঘরের মধ্যে প্রকাশ করা উচিত। তাছাড়া ফুলের মাঝে আমি আমার অস্তিত্ব দেখি। কেন জানি না, ছোটবেলা থেকেই ফুল দেখে আনন্দে চিতকার করে ওঠতাম। ফুলের জন্যই সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের প্রতি আমার মোহ ছিলো, এখনো আছে। জাপানের সবাই ফুল ভালোবাসে। চেরি ফুল তাদের খুব প্রিয়।’
ফাহমিদা নবী ফুলের মাঝে খুঁজে পান মানবিকতা, অনুভব করেন পৃথিবীকে। তাই মাঝে মাঝে তাকে সাজতে দেখা যায় তাজা ফুলের অলঙ্কারে। তিনি ফুলের মাঝে জীবনের সৌন্দর্য্য খুঁজে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে- ‘আমি মনে করি, প্রতিটি ভালোর মাঝেই সৌন্দর্য্য লুকিয়ে আছে। কেবল সুন্দরটাকে উপলব্ধি করতে পারলেই হয়। আমি ভীষণভাবে এ উপলব্ধিটা করি রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি গানে। এই যেমন- আমারো পরানো যাহা চায়, গানটি সবার-ই পছন্দের। এর ভেতরও ফুলের অস্তিত্ব। গানটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে প্রকৃতি, বৃস্টি ও ফুল। এ ফুলের সৌরভেই রবীন্দ্রনাথ মনন আর চেতনার দরজা খুলে দিয়েছেন।’
ফাহমিদা নবীর প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ। দার্শনিক সক্রেটিস তার চিন্তা, চেতনা ও বোধ। আর ইতিহাসের চরিত্রগুলোর মাঝে ভালো লাগে রাজা অশোক ও চেঙ্গিস খানের মতো চরিত্রগুলোকে। তাই বলে এদের নৃশংসতাকে তিনি পছন্দ করেন এমন নয়। ইতিহাসের এই চরিত্রগুলোর নৃশংসতার আগে ও পরে এবং জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে প্রেম, ভালোবাসা। রাজা অশোক রাজ্য জয় করতে করতে একসময় কান্ত হয়ে নিজের মাঝে বোধ জাগ্রত করেছিলেন। তারপর রাজ্য জয় ছেড়ে দিয়ে মনের জয়ের উদ্দেশ্যে নেমে যান পথে। খুঁজে ফেরেন আত্মার শান্তি। ফাহমিদা নবীও জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে দেখতে চান কেবল প্রশান্তির জন্য।

কণ্ঠশীলন
শুধু নিজের প্রশান্তি নয়, অন্যের মাঝে প্রশান্তির বীজ বুনে দেয়ার কাজটিও তিনি করেন। কিভাবে করেন? জানা যাক ফ্যন্সি’র কাছ থেকে। ফ্যন্সি চাকরি করেন বেসরকারি একটি ব্যংকে। টুক-টাক গান করেন, নিজের জন্য বা কারো অনুরোধে। ফাহমিদা নবীর গান তার খুব ভালো লাগে। টেলিভিশনে ফাহমিদা নবীর একটি সাাতকার দেখে তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। কি ছিলো সেই সাাতকারে? ‘সাাতকারে ফাহমিদা নবী বলেছিলেন, তিনি সপ্তাহে দু’দিন ভয়েস গ্র“মিং কাস করান। যারা গান করেন, তাদেরকে কণ্ঠশীলন করান। পাশাপাশি গলার সাথে গানের ম্যচিং করার বিষয়েও প্রশিণ দেন। শুধু তাই নয়, তিনি বলেছিলেন সেখানে নাকি প্রতিটি ছাত্র’র চিন্তা, মেধা, মননসহ ব্যক্তিগত বিষয়গুলো ধরে ধরে আলোচনা করা হয়।’
তারপর মোহগ্রস্তের মতো ফাহমিদা নবীর কাছে ছুটে গেলেন ফ্যন্সি। ভর্তি হলেন একটি ব্যচে। ফলাফল কী হলো? আগের ফ্যন্সি ও পরের ফ্যন্সির মাঝে পার্থক্য দি দাঁড়ালো? ‘আগের চেয়ে আমার মনোবল বেড়ে গেলো। এখন মঞ্চে যখন দাঁড়াই, ভাবি আমিই দুনিয়ার রাজা। আমার ওপর কেউ নেই। মঞ্চের বাইরের আবেগ-অনুভূতি আমাকে স্পর্শ করতে পারে না। মাইক্রোফোনের সামনে কিভাবে দাঁড়াতে হয়, গান গাইতে হলে কখন কেমন এক্সপ্রেশন প্রয়োজন সবকিছু শিখেছি কাস থেকে।’
ফাহমিদা নবীর ভয়েস গ্র“মিং কাস শুরু হয়েছে ২০০৭ সালে। প্রতি শুক্র ও শনিবার তিনি কাস নেন মুহাম্মদপুরের একটি স্কুলে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশাজীবিরা তার শিার্থী। দর্শনে পড়ালেখা করেছেন বলেই কি তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের দর্শন শেখান? ‘মোটেও না। আমি মূলত দর্শনের ওপর গুরুত্ব দেই নিজেকে নিজে চেনার জন্য। নিজের কাছে নিজে পরিস্কার থাকলেই কোন কাজে ঝামেলা নেই, মানসিক বিপর্যস্ততারতো প্রশ্নই ওঠে না। আমি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে জাগতিক বিষয় নিয়ে কথা বলি। কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে তার বোধের জায়গাগুলো জাগ্রত করে দেয়ার চেস্টা করি। আমি একটি কাস নেই মননের ওপর। এর মূল বিষয় হচ্ছে - স্বপ্ন শুধু দেখলাম বসে বসে, মাঠে নামলাম না। অর্থাৎ স্বপ্ন যদি দেখতে চাও, তবে স্বপ্নের পথে হাটো।’
তিনি মনে করেন সার্বিক সৌন্দর্য্য নিয়েই মানুসের সৌন্দর্য্য। সততার চোখ বা নিষ্পাপ ভেতরকে কেউ বাহ্যিক সেজেগুঁজে তৈরি করতে পারে না।
১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সাত বছর দুটি স্কুলে শিকতা করেছিলেন তিনি। তাই শিকতার নেশাটা একেবারে ছাড়তে পারেননি। তার স্বপ্ন একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। যেখানে গানের লাইব্রেরি থেকে শুরু করে বাদ্যযন্ত্রসহ সব আয়োজনই থাকবে।

এক যে ছিলো রাজা
এখন যিনি গানের মাস্টার, তিনি প্রথম গান শিখেছিলেন কোথায়?
পানির মতো সহজ জবাব- তার বাবার নাম মাহমুদুন্নবী। আর মাহমুদুন্নবী মানেই হলো গান, উপমহাদেশের নামকরা শিল্পী। সুতরাং তার মেয়ের ভেতর গান বাসা বেঁধেছিলো কিভাবে, এমন প্রশ্ন অবান্তর। মাহমুদুন্নবীর দুই কণ্যাই (ফাহমিদা নবী ও তার ছোট বোন সামিনা চৌধুরি) এখন খ্যতিমান শিল্পী।
মাহমুদুন্নবী ছিলেন গানের রাজা। সেই রাজার ছিলো তিন কন্যা নুমা (ফাহমিদা নবী), নোভা (সামিনা চৌধুরি) ও অন্তরা (তানজিদা নবী)। আর ছিলো এক পুত্র পঞ্চম (রেদয়ান চৌধুরী)। তাদের প্রাসাদ ছিলো ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে, ছায়া সুনিবীর শান্তির নীড়। প্রাসাদে ছিলো দারুন এক আম গাছ। তিন কন্যাকে নিয়ে রাজার ছিলো এক দু:খ, সুযোগ পেলেই ওরা আম চুরি করে খেয়ে ফেলতো। কি আর করা, কণ্যা বলে কথা। চুরি করেও বার বার পার পেয়ে যেতো।
এ তো গেলো এক দু:েখর কথা। রাজ্য চালান রাজা, তবুও যে তার দু:েখর সীমা নেই। কারণ রাণীর ভয়ে তাকে তটস্ত থাকতে হতো। রাণী সবসময় রাজার খাবারদাবারের ওপর খবরদারি করতেন। এটা খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না। বিশেষ করে মিস্টি খাওয়ার ওপর কড়াকড়িটা ছিলো বেশি। কি তাজ্জব কথা, রাজার ওপর খবরদারি! না না এ হতেই পারে না। যে কোন ওপায়ে মিস্টি খেতেই হবে। কি করা যায়, কি করা যায়। ছলে বলে কলা কৌশলে রাণীর চোখ এড়িয়ে তিন কন্যা আর এক পুত্রকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে যেতেন প্রাসাদ থেকে। ছল করতেন- যেন হাটতে বেরিয়েছেন। কিন্তু তলে তলে ছিলো অন্য ফন্দি। বাসা থেকে কয়েক কদম হাটলেই মরণ চাঁদের মিস্টির দোকান। চারজনকে নিয়ে রাজা ঢোকে যেতেন সেখানে। মিস্টির অর্ডার দিতেন। তার পর প্লেটের পর প্লেট মিস্টি আসতো আর শেষ হয়ে যেতো। রাজকন্যারা খেয়ে দেয়ে কান্ত হয়ে গেলে তাদের প্লেটের মিস্টিও সাবার করে দিতেন রাজা।
আগেকার সেই রাজা এখন আর নেই। এমনকি রাজকন্যা-রাজপুত্ররাও সেই প্রাসাদে নেই। তবে আম গাছটি দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই। এ প্রাসাদে একসময় যাতায়াত ছিলো পার্শ্ববর্তী রাজ্যের অনেক রাজা ও রাণীদের। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে বসতো সুরের আসর। কারণ সেই রাজা ছিলেন সুরের রাজা। তার সুরের প্রাসাদ এলিফ্যন্ট রোডে থাকলেও আসল প্রাসাদ ছিলো খুলনায়। ফুলতলা বাসস্ট্যন্ডের সাথেই ছিমছাম একটি প্রাসাদ। আর রাজার বাবার মূল প্রাসাদ ছিলো ভারতের বর্ধমানে।
সেই রাজার রাণীর আসল প্রাসাদ ছিলো দিনাজপুরের গনেশতলায়। রাজকন্যা ও রাজপুত্ররা ঢাকায় পড়াশোনা করলেও বছরের প্রায় ছয় মাস কাটাতো নানাবাড়িতে। নানা-নানী, মামা, খালা, পাড়া-প্রতিবেশি, সিনেমা হল এসব নিয়েই ছিলো তাদের উচ্ছল জীবন। সেখানে ছিলো লাল রঙের সিমেন্টে বাঁধানো কলতলা, সিমেন্টের সোফা। মামারা নাটক তৈরি করতেন। কলতলাতে পারিবারিক নাটক মঞ্চস্ত হতো। বড় মামার (বাদল মামা) একটি নাটকের দলও ছিলো- নবরূপী নাট্যদল। সব মিলিয়ে নানাবাড়িতে ছিলো অসাধারন এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ। তাদের পরিবারের শিাটাই ছিলো মূলত গান-বাজনা নিয়ে। তিন রাজকণ্যা আর এক রাজপুত্র’র খেলার সাথির কোন অভাব ছিলো না। ছয় খালা ও মামাদের মাঝে বেশ কয়েকজন ছিলো তাদের বয়সি। নানী মেহেরুন্নেসা ছিলেন তাদের বন্ধুর মতো। নাটক-রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লতা মুঙ্গেশকর এদের নিয়েই সারান মেতে থাকতো তারা। তারা একে অপরের সাথে কোন খেলনা জিনিস নিয়ে খুনসুটি করতো না। সুরের রাজ্যের রাজকন্যা ও রাজপুত্রদের খুনসুটি হতো গান, নাটক ও সাহিত্য নিয়ে। বুঝে ওঠার আগে থেকেই তারা রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার চরিত্রগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিলো। ভাই-বোনদের মাঝে কেউ কেতকি চরিত্রকে সমর্থর্ন করতো, কেউ লাবন্যকে। তবে নায়ক অমিত রায়ের ব্যপারে সবারই এক কথা ‘অমিত হলো ভেজা বেড়াল’। ছোটবেলায় সংসারের কোন ঝুট-ঝামেলা তাদের স্পর্শ করতে পারতো না।

অত:পর বড় কণ্যা
সেই সুরের রাজার বড় কণ্যা নুমা একদিন বড় হয়ে ওঠলো। রাজার মতো সাহস নিয়ে সেও রাজত্ব করতে লাগলো। কিন্তু কিভাবে সে বড় হলো?
বড় হতে হলে পড়ালেখা করতে হয়। তাই সে ছোট থাকতেই পড়ালেখায় মন বসালো। ভর্তি হলো গ্রীণরোডের সান ফাওয়ার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। ওখানে একবছর পড়ার পর মুহাম্মদপুর অগ্রণী গার্লস হাই স্কুলে চলে এলো। থাকলো একেবারে দশম শ্রেণী পর্যন্ত। মাঝখানে কি ঘটলো?
ঘটলো অনেক কিছুই, বিশ্বস্ত ও কাছের বান্ধবি অর্চনা, শম্পা ও মুনসহ কয়েকজনকে নিয়ে গঠন করলো ভয়ঙ্কর এক বিচ্ছুবাহিনী। এ বাহিনীর কাজ ছিলো স্কুলজুড়ে দস্যিপনা করে বেড়ানো। এর ওর ব্যপারে নাক গলানো, কান গলানো ছিলো নৈমেত্তিক ব্যপার। গাছের লটকন চুরি করায় বিচ্ছু বাহিনী ছিলো সিদ্ধহস্ত। আর মাঝে মাঝে রোমাঞ্চের জন্য কাসে ফাঁকি দেয়ার পদ্ধতিও আবিষ্কার করতো- বিচ্ছুবাহিনীর সদস্যরা গবেষণা করে আবিষ্কার করে ফেলেছিলো যে, ইসলামিয়াত স্যর কাসে এসে একজনকে সূরা এখলাস জিজ্ঞেস করলে, তার পরের জনকে সূরা নাস জিজ্ঞেস করবে। তাই বিচ্ছুবাহিনীর সবাই সব সূরা না পড়ে ভাগাভাগি করে সূরা মুখস্ত করে আসতো।
এ তো গেলো দশম শ্রেণীর কথা। কিন্তু রাজার বড় কণ্যা এস.এস.সি পাশ করলো কোন স্কুল থেকে? ‘মুহাম্মদপুর গার্লস হাই স্কুল থেকে। আমাদের বাসা পরিবর্তন করার কারণে সেখানে চলে যেতে হয়েছিলো। এইচ.এসসি পাশ করি হলিক্রস কলেজ থেকে। তারপর দর্শনে অনার্স-মাস্টার্স করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।’

পথের ছবি
বড় কন্যা বড় হলো। গানে গানে যশ কুড়োলো। কিন্তু কোন পথে হেঁটে?
সে পথের ছবি আঁকতে গেলে শুরু করতে হয় প্রাসাদ থেকে। অর্থাৎ এলিফ্যন্ট রোডের সেই প্রাসাদ থেকেই পথের উৎপত্তি। তারপর সেই পথ বাঁক নিলো ওস্তাদ আমানুল্লাহ খানের (মারা যান ২০০৩ সালে) ভাঙা বাড়িতে। ১৯৭৫ সালের দিকের কথা- রাজকন্যা নুমা তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। তাকে তালিম নিতে যেতে হতো আমানুল্লাহ খানের কাছে। মুহাম্মদপুরের একটি ভাঙা বাড়িতে থাকতেন তিনি। সেকি করুণ অবস্থা- একটিমাত্র ঘরে তিনটি খাট পাতা ছিলো। খুব কস্টে-সিস্টে সংসার চালাতেন।
পথের বাকি ছবিটা আঁকা যাক সরাসরি বড়কন্যার বর্ণনায়-
‘আমি প্রথম গান গেয়েছিলাম সত্তরের দশকের শেষের দিকে, তথা ১৯৭৭ সালে। বিটিভিতে আবদুল্লাহ আবু সাঈদের উপস্থাপনায় চতুরঙ্গ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলাম কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ও হ্যাপি আখন্দের সুরে এই অন্ধ করায় বসে।
গান গেয়ে আমার প্রথম উপার্জন ছিলো রেডিও থেকে। ১৯৭৭ সালে রেডিওর কলকাকলি অনুষ্ঠানে গেয়ে ২৫ টাকা পেয়েছিলাম। কিভাবে খরচ করেছিলাম সেটাও মনে আছে। ২৫ টাকা দিয়ে একটি বেতের র‌্যাক এবং ছয়টি গ্লাস কিনেছিলাম। তখন আমি মাত্র ৭ম শ্রেণীতে পড়ি। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় একেবারে ছোটবেলা থেকেই ছোট ভাই-বোনদের প্রতি যতœশীল ছিলাম আমি। তাছাড়া সংসার ও সংসারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রতি আমার অন্যরকম নেশা ছিলো।’
১৯৭৭ সালের শেষের দিকেই আমি টেলিভিশন থেকে উপার্জন করি ১০০ টাকা। তখন বাবার সাথে ডুয়েট গেয়েছিলাম ‘আয় খুকু আয়’ গানটি। এই একশ’ টাকা দিয়ে মা আমার নামে একটি একাউন্ট খুলে দেন পূবালী ব্যাংকে।
প্রথম সলো এলবাম তুমি তুলনাহীনা প্রকাশ হয় ১৯৭৯ সালে। আর চলচ্চিত্রে প্রথম গাই ১৯৮৩ সালে ‘দূরদেশ’ ছবিতে। গানটি ছিলো- ভাইটি আমার তুমি কেঁদোনা, বোনটি আমার তুমি কেঁদো না। এর সুরকার ঊষা খান। এটি মূলত ছিলো একটি হিন্দী গানের সুর। গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকার ও ঊষা খান। আর বাংলা ভার্সন গেয়েছিলেন আমি ও সামিনা।’
পেশাগত প্রয়োজনের বাইরেও ফাহমিদা নবী কেবল নিজের আনন্দের জন্য গুনগুন করেন। আবার কারো অনুরোধেও গেয়ে শোনান। কিন্তু কোন গান গাইবেন, কেমন গান গাইবেন তা অধিকাংশ েেত্র নির্ভর করে পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর। তবে সাধারণত মেলোডি গানই তার বেশি পছন্দ। যেমন- ‘তুমি কি সেই তুমি’ , রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’। সর্বোপরী গান গাওয়ার ব্যাপারে মনকেই প্রাধান দেয়ার চেস্টা করেন তিনি ‘মেলোডি গান আমার আত্মার গান। মেলোডিগুলো আমার ভেতর থেকে আসে। এছাড়া অন্যগুলোতে আমি অনুভবে প্রবেশ করতে পারি না।’ তবে কোন কোন সময় মনের চেয়ে শ্রোতার পছন্দটাকেই প্রাধান্য দিতে হয়।

মেঘ-জোসনার লুকোচুরি
ফাহমিদা নবী মনে করেন, প্রতিটি মানুষের জীবন প্রতি দশ বছর পর পর একেক দিকে বাঁক নেয়। অর্থাৎ মানুষের জীবনকে ভাগ করলে প্রতি দশ বছর করে আলাদা করতে হবে। এক অংশের জীবন অন্য অংশের সাথে মিলবে না। প্রতিটি অংশই আলাদা আলাদা। এমনকি পূর্ববর্তী অংশগুলোর দুঃখবোধ পরবর্তী অংশের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলবে না। আবার পূর্ববর্তী অংশের সুখবোধগুলোও পরবর্তী অংশে আন্দোলিত হবে না।
‘আমার জীবনও প্রতি দশ বছরে একটি করে অংশ হয়ে গেছে। যেমন জন্ম থেকে প্রথম দশ বছর পর্যন্ত এক রকম ছিলো, আবার পরবর্তী দশ বছর ছিলো অন্যরকম। সেটা কেটেছে কৈশোরের দূরন্তপনায়। জীবনের কৈশোরত্তীর্ণ ভাগটিতে এসে প্রচণ্ডভাবে মানুষকে ভয় পেতে আরম্ভ করি আমি। পরবর্তীতে ভেবে দেখলাম, সবাই-ইতো মানুষ। সবার ভেতরে বিশুদ্ধতা-অশুদ্ধতা দুই-ই আছে। সব মানুষের মাঝে হাসি আছে, কান্না আছে। তাহলে মানুষ কতটাই বা খারাপ হতে পারে! সুতরাং সিদ্ধান্ত নিলাম মানুষকে ভয় না করে জয় করতে হবে। তারপর আমার জীবনের পরবর্তী অংশটি কাটে মানুষ জয়ের অভিযানে।’
তবে তিনি তার জীবনের টার্নিং পয়েন্টগুলোর মাঝে বাবার মৃত্যুর সময়টাকে যেভাবে দেখেছেন, এখন তার মেয়ের বাবার মৃত্যুর সময়টাকেও মেয়ের জন্য সেভাবেই দেখছেন। ফাহমিদা নবীর স্বামী ছিলেন জয়নুল আলম বাবু। তিনি মারা যান গত সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখে। তিনি একসময় এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও মূলত ছিলেন একজন সৌখিন ফটোগ্রাফার। ১৯৮৭ সালে তাদের বিয়ে হয়েছিলো। ১৮ই সেপ্টেম্বর সারাদেশে ভ’মিকম্প হয়। এতে ভয় পেয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান।
বাবার মৃত্যু ও স্বামীর মৃত্যু এ দুটোই তার জীবনের বড় টার্নিং পয়েন্ট। পার্থক্য হলো একটির প্রভাব ছিলো সরাসরি তার ওপর। আর আরেকটির প্রভাব মেয়ের ওপর হয়ে তার নিজের ওপর পড়ছে। ফাহমিদা নবীর একমাত্র মেয়ের নাম আনমোল। বর্তমানে পড়ছেন আইন বিষয়ে। তার বিয়ের আংটি পরানো হয় আগস্টের ৯ তারিখ। বর তানভীর হাসনাত রোমান ভারতের ব্যাঙ্গালোর থেকে বিবিএ শেষ করে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করছেন।

বোধ
জাকিয়া জেনিফার। ফাহমিদা নবীর এক অন্ধ ভক্ত। প্রায়-ই তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির একটি অংশ তিনি ফাহমিদার নামে লিখে দিতে চান। কি কারণ? ‘ম্যম-এর (ফাহমিদা নবীর) গাণ আমাকে পাগল করে দেয়। লুকোচুরি গল্প শুনে আমি যোগাযোগ করতে চাই ম্যম-এর সাথে। তারপর প্রথম যেদিন তার সাথে ফোনে কথা বললাম, সেদিন থেকেই মোহগ্রস্ত হয়ে গেলাম।’
জাকিয়া জেনিফারের বাবার বাড়ি হাজারীবাগে। ২০০৮ সালে বিয়ে হয় চকবাজারের ব্যবসায়ীর সাথে। বিয়ের পর স্বামী ও স্বামীর পরিবার তার পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়। এ থেকেই সূত্রপাত হয় পারিবারিক কলহের। ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে দু’জনের। তাই জেনিফার একসময় আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন- ‘ভাবলাম আত্মহত্যা করার আগে ম্যম-এর সাথে শেষবারের মতো কথা বলে নেই। ফোন দিলাম ম্যমকে। আমি যে আত্মহত্যা করবো এ কথা বলার ইচ্ছা ছিলো না, কিন্তু কিভাবে যেন বেরিয়ে এলো মুখ থেকে। সাথে সাথেই ম্যাম ফোন কেটে দিলেন। মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু কিছুন পরই তিনি ফোন দিলেন আমাকে।’
তারপর দীর্ঘ আলাপ জীবন ও জীবনের বোধ নিয়ে। অবশেষে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন। জেনিফার মনে করেন ফাহমিদা নবী-ই তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। তার কারনেই পরবর্তীতে তিনি আবার সংসারি হতে পেরেছেন। জীবন সম্পর্কে নিজের বোধকে জাগ্রত করা এবং পরিবারের অন্যদের মাঝে জাগ্রত করানোর কাজটি তিনি ফাহমিদার কাছ থেকেই শিখেছেন। বর্তমানে তার পড়ালেখা করার েেত্রও স্বামীর পরিবার থেকে কোন বাধা নেই।
জাকিয়া জেনিফার ফাহমিদা নবীর কাছ থেকে শিখেছেন জীবনের কাছে কখনো হেরে যেতে নেই, বরং জীবনকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন মনোবল আর আত্মবিশ্বাস।

ফাহমিদা নবী

ডাক নাম
নুমা

জন্ম
৪ জানুয়ারি

বাবা
মাহমুদুন্নবী

মা
রাশিদা চৌধুরী

স্বামী
মরহুম জয়নুল আলম বাবু

সন্তান
আনমোল

প্রথম এলবাম
তুমি তুলনাহীনা-১৯৭৯

মোট এলবাম
১১টা সলো এবং অসংখ্য মিক্সড ও ডোয়েট।

দাবার রাণী

রাণী হামিদ। দাবার রাজ্যের এক রাণীর নাম। খেলায় তিনি প্রতিপরে মন্ত্রী-সেপাই ধ্বংসের নীলনকশা করে গেলেও তার জীবনের উপলব্ধি ‘যুদ্ধ নয় শান্তি’। এবারের প্রচ্ছদ রচনা রাণী হামিদকে নিয়ে। তৈরি করেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদসোহেল অটল


রাণী হামিদের ড্রয়িং রুমে দাবার বোর্ড থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। শুধু স্বাভাবিক-ই নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টারের বাসায় সেটা না থাকলেই বেমানান হতো। রাজা-মন্ত্রী, হাতি-ঘোড়া, কিস্তি-সেপাইগুলো নির্দিস্ট ঘরে সাজানো। যে কেউ দেখে মুগ্ধ হবেন। আর মুগ্ধ হবেন কজুড়ে সাজানো শিরোপা আর শিরোপা দেখে।
ভেতর ঘর থেকে অনেকটা হঠাৎ-ই এসে হাজির হলেন তিনি। মুখে স্মীত হাসি ‘অনেকন বসিয়ে রাখলাম তোমাদের। আসার আগে আরেকবার ফোন করবে না? তাহলে আগেই তৈরি হয়ে থাকতাম।’
বেলা তখন পড়ে এসেছে। সন্ধ্যা হয় হয়। ঠিক হলো আগে ফটো সেশনের কাজ। চলে যাওয়া হলো আউটডোর তথা তার বাড়ির সামনে। পুরনো ডিওএইচএস-এ ছিমছাম বাড়ি। তিনতলা বাড়ির খোলামেলা বিন্যাস, বিস্তৃত আঙিনা, প্রশস্ত লন সবই আকর্ষণীয়। ছবি তোলা হলো আউটডোরে, অত:পর ইনডোরে। তারপর আবার ড্রয়িং রুম এবং জীবনের ডায়েরি খোলে বসা-

বেড়ে ওঠা
স্মৃতি হাতড়ানোর জন্য একটু সময় ভাবলেন তিনি। তারপর একলাফে চলে গেলেন শৈশবের অধ্যায়ে। যে অধ্যায়টি তিনি পাড়ি দিয়ে এসেছেন নানা দুরন্তপনায়। ‘আমি ছোটবেলা থেকেই ছিলাম দূরন্ত। খেলতাম, ঘুরতাম, ফিরতাম। বলা নেই কওয়া নেই হরহামেশাই এখানে সেখানে উধাও হয়ে যেতাম। হারিয়ে যেতাম গ্রামের মেঠো পথে। ঘুরে বেড়াতাম এ গ্রাম ও গ্রাম।’
শৈশবে যেমন করেছেন দুষ্টুমি তেমনি অনেক বোকামীর কথা মনে হলে আজো তিনি হেসে কুটি কুটি হন। তেমনি এক ঘটনার কথা শোনালেন ‘আমি আর আমার বড় বোন পারু তখন একই স্কুলে পড়তাম। পারু আমার ওপরের কাসে পড়তো। সে ছিলো আমার চেয়ে ফর্সা এবং সবসময় টিপটপ হয়ে থাকতো। আর আমি ছিলাম কালো ও রোদে পোড়া। তাই কাসের মেয়েদের কেউ বিশ্বাসই করতে চাইতো না যে আমরা দু’জন সম্পর্কে আপন বোন হই। তাই একদিন এক মেয়ে জিজ্ঞেস-ই করে বসলো- তোমরা দু’জন কি আপন বোন? আমি তো তখন আপন বলতে কি বোঝায় সেটাই বুঝিনা। বেশ ভড়কে গেলাম, কি জবাব দেব! একটু ভেবে আবিষ্কার করলাম, আপন বলতে ওরা হয়তো বোঝাচ্ছে পর। তাই আমি বললাম- পারু আমার আপন বোন নয়, নিজ বোন। তারপর সবার হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যাওয়ার অবস্থা।’
শৈশবের কতা মনে হতেই রাণীর সামনে যে ছবিটি ভেসে ওঠেÑ তিনি হলেন তার বাবা। বাবার আগ্রহের কারণেই তিনি ছিলেন অনেক প্রাণবন্ত। করতে পেরেছেন খেলাধুলা। বাড়িতে ছিলো টেনিস খেলার চর্চা। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বাবা তার নাম দিয়ে আসতেন।
রাণীর খেলাধুলার ব্যপারে আগ্রহ ছিলো শিকদেরও। তারা চাইতেন সে যেনো দৌড় অব্যহত রাখে। শিকরা স্বপ্ন দেখতেন একদিন জাতীয় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে রাণী। সেই থেকে ছোট্ট রাণীর দৌড় শুরু। এখনো চলছে। তবে অ্যথলেট হিসাবে নয়। সে দৌড় দাবার দৌড়। জাতীয় পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জতিক পর্যায়ে। তিনি দাবাড়– হিসাবে আজকের রাণী হামিদ হয়ে উঠেছেন মূলত বাবার আগ্রহের কারনেই ‘বাবাই আমাকে দাবার বোর্ড কিনে দিয়েছিলেন। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সবসময় পুরস্কার পেতাম আমি। আর এতে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন বাবা। কিন্তু মেয়েদের অ্যথলেট হতে গেলে তো কিছু সমস্যা থাকেই। সে কারণে আমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আউটডোর খেলা থেকে কোজ করে আনতে থাকলেন বাবা। তাই অবসর সময় কাটানোর জন্য দাবা খেলার প্রতি উৎসাহ দিতেন। তবে অবশ্যই পড়ালেখার যেন তি না হয় সে ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। বাবা যখন বাড়িতে থাকতেন না, তখন ছোট ভাইকে নিয়ে দাবার বোর্ডেই মজে থাকতাম।’
বাবা সৈয়দ মমতাজ আলী ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার। চাকরির কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাকে কাটাতে হয়েছে। আর এ কারনেই তার সন্তানদের পরিবর্তন করতে হয়েছে অনেক স্কুল। রাণীর প্রাথমিক শিা শুরু হয় চট্টগ্রাম নন্দনকানন গার্লস হাইস্কুলে। তিনি ১৯৫২ সালে সরাসরি ২য় শ্রেণীতে ভর্তি হন। তখন স্কুলের ওপরের শ্রেণীর শিার্থীরা তাকে ডেকে মিছিলে নিয়ে যেতো। কিসের মিছিল, অতশত তিনি বুঝতেন না। মিছিল হবে, ব্যস। একধরনের থ্রিলতো পাওয়া যাবে। এখন তিনি সে স্মৃতি মনে করে গর্ববোধ করেন। কারণ মিছিলগুলো ছিলো রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে।
১৯৫৪ সালে বাবা বদলি হয়ে যান কুমিল্লায়। রাণীও সেখানকার মিশনারি স্কুলে ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণি পড়েন কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা গার্লস হাই স্কুলে। তারপর বাবার বদলির কারণে আবার তাকে কুমিল্লা ছেড়ে চলে যেতে হয় রাজশাহীতে। ৮ম ও ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন রাজশাহীর একটি স্কুলে। ১০ম শ্রেণীতে পড়েন সিলেট বালিকা বিদ্যালয়ে। এ স্কুল থেকে তিনি মেট্রিক পাশ করেন ১৯৬০ সালে। পরবর্তীতে আর কলেজে ভর্তি হননি। কিন্তু ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে প্রাইভেট পরীা দিয়ে ইন্টারমিডিয়েট এবং ডিগ্রী পাস করেন। একাডেমিক পড়ালেখা তার কাছে ছিলো পানির মতো সহজ। ছাত্র-ছাত্রীরা কেন পরীায় ফেল করে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এর কোন জবাব খোঁজে পান না তিনি।

সংসার
বাংলাদেশের প্রোপটে একজন নারীর জীবনে প্রথম বাবা, তারপর স্বামী এবং সবশেষে সন্তানদের গুরুত্ব বেশি থাকে। রাণী হামিদও এেেত্র ব্যতিক্রম নন। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি শুরু করেন বিবাহিত জীবন। ১৯৫৯ সালে তার বিয়ে হয় সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আব্দুল হামিদের সাথে। তখন তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একজন সাঁতারু হিসেবেও রেকর্ড করেছিলেন। আব্দুল হামিদ বহুল আলোচিত কয়েকটি বইয়েরও লেখক। এর মাঝে রয়েছে 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা'। এছাড়া তিনি আরো চারটি বই লিখেছেন। স্বামীর সহযোগিতায়-ই রাণীর পে এতদুর আসা সম্ভব হয়েছে ‘দাবা খেলায় আমি মনযোগ দিতে পেরেছি কেবল আমার স্বামীর কারণে। খেলার জন্য আমাকে প্রায়-ই দেশ ও দেশের বাইরে যেতে হয়েছে। এসব ব্যাপারে তিনি ছিলেন উদার। তিনি সবসময়-ই আমার বায়োডাটা আপগ্রেড রাখতেন। তাছাড়া আমাকে কখন কী করতে হবে এসব তদারকি তিনিই করতেন।’
রাণী হামিদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে ছাড়া পরিবারের সবাই খেলা-ধুলার সাথে যুক্ত। বড় ছেলে কায়সার হামিদ বাংলাদেশের একজন তারকা ফুটবলার। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলেছেন অনেক দিন। আশি ও নব্বই এর দশকে খেলতেন মোহামেডান স্পোর্টিং-এর হয়ে। কায়সার হামিদ ছিলেন সে আমলের সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের একজন। দীর্ঘদিন মোহামেডানের অধিনায়ক ছিলেন। মেজ ছেলে সোহেল হামিদ স্কোয়াস ফেডারেশনের সম্পাদক ও একজন ক্রিকেটার এবং ছোট ছেলে শাহজাহান হামিদ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। মেয়ে জেবিন হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে কিছুদিন পিআইবিতে কিছু দিন চাকরি করেছেন। বর্তমানে তিনি লেখালেখি করেন।

দাবার বোর্ডে
দাবাকে পেশা হিসাবে নেয়ার জোরালো ইচ্ছা তার কখনো ছিল না। একজন গৃহিনী হিসাবে সময় কাটানো এবং আনন্দের জন্য তিনি দাবা খেলাকেই বেছে নেন ‘আনন্দের জন্যই আমি দাবা খেলি। তাছাড়া দাবা এমন একটি খেলা, যা সব বয়সেই খেলা যায়। আমার ছেলে কায়সার হামিদ ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছে। অথচ তার মা হয়েও আমি এখনো জাতীয় দলে খেলছি। এটাওতো উপভোগ্য বিষয়। আর প্রচলিত অন্যান্য খেলাধুলার জন্য শারিরীক সমতার প্রয়োজন। কিন্তু দাবায় সেটার দরকার হয়না। এখানে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাই মূখ্য।’
দাবা খেলে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করলেও এর জন্য দৈনন্দিন জীবনের অন্য অনুষঙ্গগুলো বাদ দিতে রাজি নন তিনি। ব্যস্ত জীবনের চেয়ে ঘরের জীবন-ই তার বেশি পছন্দ। তবে কোনকিছু অর্জনের জন্য যতটুকু পেশাদারি হতে হয় ততটুকুতো রয়েছেই।
আর সেই পেশাদারিত্বটুকু পাকা হয়েছে বিয়ের পর। খেলাধুলার প্রতি তাঁর স্বামী আব্দুল হামিদের আগ্রহ ও উৎছিলো ব্যাপক। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-এর কোয়ার্টারে থাকতেন তারা। তখন তাদের প্রতিবেশি ছিলেন জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়ন ডঃ আকমল হোসেন। তাঁর কাছ থেকেই শেখেন খেলার আন্তর্জাতিক নিয়ম কানুন। পরবর্তীতে ড: আকমলের সহযোগিতায়-ই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিতে থাকেন। ১৯৭৬ সালে প্রথম মহসিন দাবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন।
জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম অংশ নেন ১৯৭৭সালে। সে খেলায়-ই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যান ‘তখন আমি চার বাচ্চার মা। তখনকার অনুভূতি ছিলো খুবই আনন্দের। দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় আমার ছবি এসেছিলো। জিরো থেকে হিরো হওয়ার মতো আরকি। এরপর আমাকে আর ঠেকায় কে। পরপর ৯ বার জাতীয় পর্যায়ে খেলে প্রতিবারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’
১৯৮১ সালে তিনি ভারতের হায়দারাবাদে এশিয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে কৃতিত্বের স্বার রাখেন। তিনি কমনওয়েলথ এর একজন শীর্ষ দাবাড়–, আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার ও জাতীয় নারী দাবা চ্যাম্পিয়ন। তিনি এ পর্যন্ত তিনবার ব্রিটিশ নারী দাবা চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এখন আর ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে পারেন না। কেন? এ নিয়ে রয়েছে আরেক মজার কাহিনী- ব্রিটিশ মহিলা দাবাড়–রা যখন বাংলাদেশি রাণী হামিদের কাছে বার বার পরাজিত হচ্ছিলেন, তখন বিষয়টি তাদের কাছে অপমানজনক মনে হচ্ছিলো। তারা দাবি তোললেন ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়নশিপে অন্যদেশের নারীরা খেলতে পারবে না এবং কর্তৃপ তা-ই করলো।
রাণী হামিদ দাবা অলিম্পিয়াডে যোগ্যতার ভিত্তিতে জাতীয় পুরুষ দলের হয়েও অংশ নিয়েছেন। পুরুষ দলের হয়ে খেলতে যাওয়ায় রয়েছে তার মজার অভিজ্ঞতা ‘একবার গ্রীসে খেলতে যাই পুরুষ দলের হয়ে। আমার খেলা তখনো শুরু হয়নি। অন্য অনেকেই খেলছে। ভাবলাম বাইরে গিয়ে চা খেয়ে আসি। চা খেয়ে যখন ফিরছিলাম, তখনি বাঁধলো গন্ডগোল। নিরাপত্তারীরা কিছুতেই আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। ওরা বার বার বলছে, মহিলা দলের খেলা ওদিকে হচ্ছে এখানে নয়। কিছুতেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে না যে, আমি পুরুষ দলের হয়ে খেলছি। তার ওপর আরো সমস্যা হলো, ওরা ইংরেজি ভাষা বোঝে না। ভেতরে ঢুকতে দেবে না তো দেবেই না। তারপর অনেক ঝক্কি-ঝামেলা করে ঢুকতে পেরেছিলাম।’
বাংলাদেশের যে মানুষটির কাছে দাবা পরিচিত, তার কাছে রাণী হামিদ নামটিও পরিচিত। শুধু দেশে কেন, দেশের সীমানা ছাড়িয়েও তার রয়েছে অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী ‘একবারের ঘটনা। ২০১০ সালে গ্রীসে গিয়েছিলাম খেলতে। বাসে করে এক যায়গা থেকে অন্য যায়গায় যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি রাস্তার মাঝখানে বাস থেমে গেছে। আরে কী কান্ড! তাকিয়ে দেখি বাস চালক সিটে নেই। কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেছেন। কিছুন পর চালককে আবিষ্কার করলাম আমার সামনে। হাতে একতোড়া ফুল। আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন। আমি তো হতভম্ব! এই লোক আমাকে চিনল কি করে!’

সময় কাটে
রাণী হামিদ তার জীবনকে তিনভাগে ভাগ করেন- বাল্যকাল, মাধ্যবয়স এবং সর্বশেষ বৃদ্ধ বয়স। এ তিনভাগকে তিনি তিন রকম করে উপভোগ করেছেন। তিনটি ভাগই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের দিকে তাকালে যখন সন্তানের মা হলেন সে সময়টাকে তিনি গুরুত্ব দেন। আবার দাবা খেলার দিকে তাকালে এ বয়সটাকে গুরুত্ব দেন। তিনি মনে করেন মানুষের জীবনের কোন সময়-ই গুরুত্বহীন নয়।
দাবার বোর্ডে তিনি প্রতিপরে মন্ত্রী- সেপাই ধ্বংসের নীলনকশা করে গেলেও তার জীবনের উপলব্ধি ‘যুদ্ধ নয় শান্তি। সুখে থাকো, শান্তিতে থাকো। মানুষকে কষ্ট দিয়ো না। পারলে উপকার করো। না পারলে কারো অপকার করো না।’
খাওয়া, ঘুম আর টিভি দেখেই বেশিরভাগ সময় কাটে তার। তিনি মনে করেন স্বামী জীবিত না থাকলে মহিলাদের তেমন কোন দায়িত্ব থাকে না। তিনিও এখন দায়িত্বমুক্ত। সারাদিন নাতি-নাতনীদেরকে নিয়ে হই-চই করে কাটিয়ে দেন ‘এখন নাতিরাই আমার সঙ্গি। এই যে এখানে দেখছ তিনজনকে, (ড্রয়িংরুমে উপস্থিত নাতিদের দেখিয়ে) লম্বাটা হলো সাদাত, ওটা আয়মান। আর এটা হলো মোস্তফা। আমি ডাকি সনু, মনু, মস্তু। নামগুলো লিখে দিয়ো কিন্তু। সনুকে আমি দাবাড়– বানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রথমেই একটি ভুল করে ফেলেছি। বড় একটি টুর্নামেন্টে খেলতে পাঠিয়েছিলাম। সেখান থেকে হেরে এসে দাবার প্রতি ভীতি তৈরি হয়েছে ওর। তারপর আর ইনডোর খেলার প্রতি আগ্রহ নেই। বাপের মতো (কায়সার হামিদের) ফুটবল খেলার নেশা।’

অত:পর
আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত এক মাত্র বাংলাদেশী মহিলা দাবাড়– রাণী হামিদ তার সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পাননি সরকারের কাছ থেকে ‘বাংলাদেশে দাবা খেলার পৃষ্ঠপোষকতা নেই। একটি পর্যায়ের পর খেলোয়ারদের বড় ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সাপোর্ট আমরা পাই না। নিয়মিত টুর্নামেন্ট খেলার জন্য স্পন্সর যোগার করাও এদেশে দুস্কর। দাবাতে স্পন্সররা বেশি আগ্রহী হন না। কারণ মিডিয়া এ খেলাটি সেভাবে প্রচার করে না। দাবার চলতি খবরগলো গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় না। ফলে মানুষও জানে না বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কে হচ্ছে। অন্যান্য খেলার মতো দাবার বড় বড় টুর্নামেন্টগুলোর খবর পত্রিকায় আসা উচিত।’

অত:পর রাণী হামিদের ডায়েরির পাতা প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। ঠিক তখনি হাস্যবদনে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন তার বড় ছেলে কায়সার হামিদ। যথারীতি কুশলাদী বিনিময় এবং ফটো সেশন। অবশ্যই মায়ের সাথে।

ছবিগুলো তুলেছেন ইমশিয়াত শরীফ

এক টুকরো রাণী হামিদ

পুরো নাম: সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুন
জন্ম: ১৯৪৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি
ববা: সৈয়দ মমতাজ আলী (পুলিশ কর্মকর্তা)
মা: মোসাম্মাত্“ন্নেসা খাতুন
ভাই-বোন: সৈয়দ আমীর আলী (অবসরপ্রাপ্ত এসপি), এয়ার কমান্ডার শমসের আলী, সৈয়দ দেলোয়ার আলী, সৈয়দ মোতাহের আলী, জমীরুন্নেসা খাতুন (পারু), সৈয়দা লুত্ন্নেসা খাতুন, মিনু মমতাজ।
বিয়ে: ১৫ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে
স্বামী: মোহাম্মাদ আব্দুল হামিদ (সাবেক সেনা কর্মকর্তা)
সন্তান: কায়সার হামিদ (ফুটবলার), সোহেল হামিদ (স্কোয়াস ফেডারেশনের সম্পাদক), শাহজাহান হামিদ (টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার), জেবিন হামিদ (লেখক)।
শিাগত যোগ্যতা: ডিগ্রি
প্রকাশিত বই: মজার খেলা দাবা, দাবা খেলার আইন কানুন।

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২০, ২০১১

সারা আঁখি পাতা


সেই মেয়েটি দস্যি মেয়ে
পাতায়, ফলে, ফুলে
দোদোল দোদোল দোলে

পাতাদ্বীপ ঝাড়ু দেয়
দীঘল দীঘল চুলে

সেই মেয়েটি গেছো মেয়ে
গাছে গাছে ঘোরে,
কিম্বা হাওয়ায় ওড়ে

সারা আঁখি পাতা
তার পাতাদ্বীপ জুড়ে

শুক্রবার, অক্টোবর ০৭, ২০১১

জন্ম ধোলাই


শোনা যাচ্ছে আগামী ৮ অক্টোবর ছড়াকার জগলুল হায়দারের জন্মদিন। ব্যাপারটার সত্যতা নিরূপন করার জন্য আরেক ছড়াকার শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ গিয়েছিলেন তার কাছে। ছড়ায় ছড়ায় তাদের কথোপকথন এখানে তুলে ধরা হলো-



প্রশ্ন-১
জগলুল হায়দার,
যুৎসই কায়দার
ছন্দ ও মাত্রা
মিল দিয়ে লিখে যান
ছড়া আর কবিতা।

আপনার ছন্দ
আর সব মন্দ
লেখনীর যাত্রা
কিভাবে শুরু হয়
বলে দিন সবি তা।

উত্তর :
থ্যাঙ্কস ভাই আপনাকে
লেগে গেছে তাপ নাকে
সাক্ষাতে আইসা;
ঠিক আছে এই আমি
সারা দিন নিশি-যামি
ছড়া লিখি ঠাইসা।

তবে লাগে ধন্দ
ছড়া লেখা মন্দ
এই কথা শুইনা
দেখান তো মন্দ কী
আঙ্গুলে গুইনা!

প্রশ্ন : ২
ছড়াকাররা মন্দ না তো
মন্দ বলি কাকে
খোঁচা মারে আলাভোলা
শান্ত মানুষটাকে।

ছড়া হলো শাণদার
ভীতিকর অস্ত্র
আলাভোলা বানদার
খুলে নেয় বস্ত্র।

ছড়াকারের ছড়ায় থাকে
নাশকতার বন্দনা
তবুও বলেন, আপনি মশাই
ছড়া লেখা মন্দ না?

উত্তর :
আলাভোলা পরান খোলা
মানুষগুলার দোষ নাই
ছড়াকারও কাড়েন না তো
তাদের মুখের রোশনাই।
কিন্তু যারা মুখোশ পরা
মুখে যাদের পলেস্তরা
তাদের কথা অন্য
ছড়াকারের অস্ত্র ঘোরে
কেবল তাদের জন্য।

বিপ্লব আর নাশকতার
মাঝেও ফারাক অল্প না
ছড়া নিয়ে তাই অহেতুক
আজগুবি এই গল্প না!

প্রশ্ন-৩
আপনি তো এক প্রকৌশলী
কুশল করেন পেশায়
তবুও দেখি সুযোগ হলেই
আড্ডাবাজির নেশায়;
বুঁদ হয়ে যান কিসের টানে
বলুন দেখি কানে কানে।

উত্তর :
পেশায় আমি যা-ই হই না
ছড়া আমার নেশায়
আমায় যেন সর্বদা কে
ছড়ার সাথে মেশায়!

মিশতে মিশতে মিশ্যা গেলাম
এখন জানে প্রাণে
বুঁদ হই তাই ছড়াতে ভাই
বলছি কানে কানে।

প্রশ্ন-৪
লজ্জা নাকি নারীর ভূষণ
আপনি তো নন নারী
গোপন বলার সাহস আছে
উদোম করে হাঁড়ি?

সবার আগে বলুন দেখি
টান করে বুক-সিনা
অক্টোবরের আট তারিখে
জন্মেছিলেন কি না?

এখন বয়স কত চলে
বল্লে আরো ভালো
প্রমাণসহ বলতে হবে
জন্ম নেয়ার সালও।

উত্তর :
সাহস বেচা পুরুষ আমি
সাহস বেচেই খাই
আমার ছড়ায় মিনমিনে ভাব
তাই তো মোটেও নাই।
সাহস নিয়ে বলছি শুনুন
অক্টোবরের আটে
ওঁয়াও ওঁয়াও এসেছিলাম
এই পৃথিবীর হাটে।

আমগো দেশে বয়স মানে
এসএসসি যা বলে
সেই বয়সের মালাই নাকি
প্রায় সবারই গলে।

পয়ষট্টিতে জন্মে বয়স
দুই কুড়ি ছয় পূর্ণ
অনেক আগেই করেছি তাই
এই ট্র্যাডিশন চূর্ণ।
মারফতিতে আবার বলি
না যদি ভাই কমান;
বয়স আমার সত্যি তবে
এ সভ্যতার সমান!

প্রশ্ন -৫
সাহস আছে জানি সেটা
ছড়ার ভাষা পড়ে
জন্মেছিলেন বলুন দেখি
কোন সে আতুড় ঘরে?

উত্তর :
এই শহরের মালিবাগে
মায়ের পেটে এসে
পাক ভারতের যুদ্ধ দিনে
গিয়েছিলাম ফেঁসে।
মাকে বাবা পাঠিয়ে দিলে
জামালপুরের গাঁয়ে
দেশের বাড়ি জন্মেছিলাম
ফুল-প্রকৃতির ছায়ে।

প্রশ্ন ৬ :
আপনি নাকি ফান ম্যাগাজিন
একাই নিলেন দখল
দিলেন নাকি পাগল করে
যত্তো পাঠক সকল?

উত্তর :
একটা মোটে পাগলা গারদ
পাবনা যদি ভরে
এই সওয়ালের জবাব দিতে
তাই কাঁপি ভাই ডরে!
পাগল করার ইচ্ছে মোটে
নাইকো আমার ভায়া
ছড়া লিখে চাইছি সবার
আদর স্নেহ মায়া।

দখল টখল প্রসঙ্গ নয়
প্রসঙ্গটা এই;
চাইছি কেবল সব জাগাতে
ছড়াই ছড়াতেই।

প্রশ্ন-৭
ছড়া লিখেন ভালো কথা
আর কি করেন শুনি
কখনও কি ইচ্ছে করে
করতে খুনোখুনি!

উত্তর :
মশায় যখন ভন ভন ভন
হামলে পড়ে বাড়িতে
তখন কিন্তু চাপড় দিয়ে
চাই সে মশা মারিতে।

পিঁপড়া যদি কামড়ে ধরে
ইভেন ঋষি মুনি
তারাও তখন যায়না হয়ে
হঠাৎ করেই খুনি?

খুনের রেকর্ড খারাপ না খুব
মারছি মশা-মাছি
এই শহরে আমরা যে ভাই
এসব নিয়েই আছি।

প্রশ্ন-৮
কখনও কি হাসতে গিয়ে
কান্না করেছেন
আবার সোজা চলতে গিয়ে
উল্টে পড়েছেন?

উত্তর :
হাসতে গিয়ে হাসলে বেশি
আসতে পারে কান্না
এই কথা তো বলে গ্যাছেন
কবেই রাজেশ খান্না!
হাসি তবে হিসাব করে
হিসাব করেই কাঁদি
দুটোই কিন্তু এই জীবনে
স্বর্ণ এবং চাঁদি!

সোজার মধ্যে উল্টো হওয়া
এতো ইজি নয়তো
তাই জীবনে উল্টে যেতে
মানুষ বিজি নয়তো।
কিন্তু আয়না দেখলে পরে
বুঝতে পারি ভুলটা
সোজা থেকেও তখন কেমন
লাগতে থাকে উল্টা।
ডান হাতটা বাম হয়ে যায়
বাম হাতটা ডান
বদলে ফেলে নিজ পজিশন
তেমনি চোখ ও কান!

প্রশ্ন-৯
আচ্ছা বাবু এবার বলুন
ছড়া লেখার মন্ত্র কি
লিখতে হলে লাগবে কোনো
খটর-মটর যন্ত্র কি?

উত্তর :
ডাক নামটা বাবু আমার
সেটাও গেছেন জেনে
প্রশ্ন দিলেন অবশেষে
সেই নামটাও এনে!
জানেন যখন বলছি শুনুন
এসব কথা বাজে,
ছড়া লেখায় যন্ত্র-টন্ত্র
লাগবে না তো কাজে।

লাগবে প্রথম প্রতিভা আর
চেষ্টা তারই পরে
লিখবে তারাই বুকে ছড়ার
তেষ্টা যারই-ধরে।

৫ অক্টোবর’২০১১ নয়া দিগন্ত’র সাপ্তাহিক ফান ম্যাগাজিন থেরাপিতে প্রকাশিত

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১১

নিচে জমিন

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১১

সুখের বাসর



পাতাদের পাতারাণি শুকনো পাতায়
পাতাদ্বীপ পায়েলের ছন্দে মাতায়

রুনুঝুনু রুমুঝুম নাচন ওঠায়
গোটা দ্বীপ জুড়ে এক আসর জোটায়

এলোমেলো সুকোমল সবুজ আসর
আহা-হা পাতাদের সুখের বাসর

সুখগুলো জ্বলে ওঠে তারায় তারায়
উচাটন মন যেনো কোথায় হারায়


বুধবার, আগস্ট ২৪, ২০১১

মিথ্যা ধরার মেশিন


তোতামিয়াকে চমকে দিয়ে হঠাৎ উদয় হলো নিরুদ্দেশ মন্তাজউদ্দিন কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই হেটে যাচ্ছিলো দোকানের সামনে দিয়ে প্রায় একবছর পর অ™ভ’ত এ লোকটার দেখা মিলল ডেকে দু’চার কথা জিজ্ঞেস না করলেই নয়-
-এতদিন আছিলা কই?
-আমার কি আর ঠিক-ঠিকানা আছে? ওপরে আসমান, নিচে জমিন, মাঝখানে আমি সেইখানেই থাকি, যেইখানে রাখেন অন্তর্যামী
- আ রে ধূর, মারফতি কথা বাদ দেও বও দেহি, দুই-চাইরডা আলাপ করি
অনিচ্ছা সত্বেও বেঞ্চের এক কোনায় বসলো মন্তাজ উদ্দিন বসতে বসতেই চোখ পড়লো উইল্লা চোরার দিকে, অপর কোনায় বসে আছে মাথায় টুপি, পরনে পাঞ্জাবি, শুকনো মুখ কিন্তু চেহারায় পবিত্রতার ছাপ বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে নিজের চোখকে একদম বিশ্বাস করাতে পারছে না মন্তাজউদ্দিন
- কিমুন আছুইন বাইছা (ভাইসাহেব)?
- বালা তোমার এই পরিবর্তন কেমনে?
কপালের চোখ মাথায় তোলে জিজ্ঞেস করলো মন্তাজ উদ্দিন
উইল্লা চোরা জবাব দেয়ার আগেই কথা কেড়ে নিলো তোতা মিয়া
- উইল্লা চোরা তো চুরি-চামারি করে না একবছর ধরে গত বছর রমজান মাসে তওবা কাটছিল
লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিলো উইল্লা চোরা গোঁফের নিচে হাসি লুকিয়ে রাখলো তোতা মিয়া আর একটু নড়েচড়ে বসে লজ্জাবনত উইল্লা চোরার চোখে সরাসরি চোখ রাখলো মন্তাজ উদ্দিন-
- তুমি হাছা কইতাছ নাকি, চুরি-চামারি একেবারে ছাইরা দিছ?
- এইসব লইয়া কেউ মিছা কয় নাকি? বলেই দাঁত কেলিয়ে সরল হাসি দিলো সে তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল বাকি দুইজন তবে দু’জনের হাসির আওয়াজ প্রায় সমান হলেও অর্থ একেবারে ভিন্ন তোতা মিয়া হেসেছে উইল্লা চোরার দাঁত কেলানো হাসি দেখে আর মন্তাজ উদ্দিন হেসেছে যে কারণে তা তাৎক্ষনিকভাবে অন্যদের বোঝার কথা নয় দু’জনের হাসির মাঝে আরেকটি পার্থক্য হলো- দু’জন হাসি শুরু করেছে একই সাথে কিন্তু তোতা মিয়ার হাসির রেশ শেষ হয়েছে অনেকে আগেই আর মন্তাজ উদ্দিন এখনো হেসে চলেছে হেসে চলেছে হেসেই চলেছে হাসতে হাসতে উইল্লা চোরাকে জিজ্ঞেস করলো-
এইসব লইয়া কেউ মিছা কয় না, না? তারপর আবারো হাসতে লাগল
মন্তাজ উদ্দিনের হাসি দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলো অন্যরা হাসতে হাসতে একবার কুঁজো হয়ে যায়, আবার পেছনে কাত হয়ে উল্টে যায় তবুও হাসি বন্ধ হওয়ার নাম নেই
- রোজা রাইখা এতো হাসো কেমনে?
তোতা মিয়ার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে দ্বিরুক্তি করল মন্তাজ উদ্দিন- এইসব লইয়া কেউ মিছা কয় না, না?
তারপর একমুহুর্ত থামল এবং বলল, চুরি-চামারি কইরা কিছু হর্তা-কর্তারা দেশের মাটিসুদ্ধ গায়েব করতাছে আর মুখে কইতাছে দেশ প্রেমের কথা গোরস্থান, মসজিদ, ইস্কুলের টাকা মাইরা প্রকাশ্যে মিছা কইতাছে
- আ রে হাসি থামাইয়া কথা কও মন্তাজউদ্দিনের বেগতিক অবস্থা দেখে অনুরোধ করলো সন্ত্রস্ত উইল্লা চোরা
- কেরে, হাসি থামাইয়া কথা কইতাম কেরে? পাল্টা প্রশ্ন করলো মন্তাজ উদ্দিন কিন্তু পরক্ষণেই একরকম বেখাপ্পাভাবে দীর্ঘক্ষন চলতে থাকা হাসিটা থামিয়ে দিলো সে তারপর বললো, আমিতো তোর হাসির কথা হুইন্না হাসতাছি কিন্তু কেউ কেউ যে মানুষের বিপদে হাসে, মানুষরে বিপদে ফালাইয়া হাসে?
- মানুষের বিপদে হাসে? এমন মানুষও আছে নাকি?
- আছে রে আছে কেউ কেউ আছে সুখে-দুখে হাসে কারণে-অকারণে হাসে পথে-ঘাটে হাসে সড়ক দূর্ঘটনায় মানুষ মারা যায়, খবর শুনে হাসে রাস্তা খাল হয়ে বাস বন্ধ হয়ে যায়, তখনও হাসে ঈদে ঘরমুখি মানুষের ভোগান্তি দেখে হাসে খালি হাসে আর হাসে হাসে আর মিছা কথা কয়
- এত হাসে!
-হ্যা এত হাসে হাসে আর আকাশ পথ-পাতাল পথের স্বপ্ন দেখায় আর মানুষ স্বপ্ন দেখতে দেখতে তিনঘন্টার পথ ছয় ঘন্টা লাগিয়ে বাড়ি ফেরে অথচ গত তিন বছরে সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষনাবেক্ষনে কুড়ি হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হইছে
চমকে ওঠে তোতা মিয়া কিছু একটা বলতে যায় কিন্তু ইশারা দিয়ে থামিয়ে দেয় মন্তাজ উদ্দিন
-কিছুদিন আগে ভারতের এক টেলিভিশন চ্যানেলে আজব একখানা মেশিন দেখছিলাম মিথ্যা ধরার মেশিন’
- মিথ্যা ধরার মেশিন! এইটা আবার কী?
- আছে, মিথ্যা ধরার মেশিন আছে এইটার আসল নাম হইলো ‘পলিগ্রাফ মেশিন’ এইটা মানুষের বুকে লাগাইতে অয় তারপর হৃদয়ের ধুকপুকানি গুইনা মেশিনটা কইয়া দিতে পারে কার কথা হাছা, আর কার কথা মিছা কার হাসি কালা, আর কার হাসি বালা (ভালো)
ওমা, ওমা! এমন মেশিন আছে নাকি! একেবারে রে-রে করে দোকানের সামনে চলে এলো ময়না এতক্ষণ কোথায় ছিলো কে জানে? হয়তো আড়ালে থেকে কথা শুনেছে এমন মেশিন ুথাকলে তো এবারের ঈদে জামা কেনার পরিবর্তে ওর একটা মিথ্যা ধরার মেশিনই দরকার কারণ এ দেশের হর্তা-কর্তাদের হাসি সাদা না কালো তার একটা পরীক্ষাতো নিতেই হয় তবে মিধ্যা ধরার মেশিন যে একেবারে সত্যি সত্যিই আছে তা কোনভাবে বিশ্বাস করলো না ময়না মন্তাজ উদ্দিন বোঝানোর চেস্টা করলো, তারপরও না

সোমবার, আগস্ট ১৫, ২০১১

আম্রকাননে






বৃহস্পতিবার, জুন ৩০, ২০১১

রাজশাহী চিড়িয়াখানায়







ছবিগুলো রাজশাহী চিড়িয়াখানায় তোলা। বলে রাখা প্রয়োজন- আমরা (আমি, সোহেল অটল ও রাসেল) কিন্তু চিড়িয়া নই।

`নানা হে..'


শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ, রাজশাহী থেকে ফিরে
নাতি মঞ্চে গিয়ে কয়েকবার ‘নানা’ বলে হাঁক ছাড়ে। গায়ে গেঞ্জি, কোমরে গামছা।
নেপথ্য থেকে একজন চেঁচিয়ে ওঠে, তুই এখেনে চিল্লেচিল্লি করছিস কেনে?
নাতি- তোমরা হাঁর নানাকে কেহু দেখ্যাছো নি আমি সেই সক্কাল থেইকা বোইলে রাখলাম এখেনে এক অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু হাঁর নানার কোন দেখা নাই।
হঠাত মঞ্চে উদয় হন নানা। তারপর আচমকা লাঠি মারেন নাতির পেছনে এবং বলেন, শালাকে দিব পাইনঠ্যার বাড়ি।
নানার মুখে পাকা দাঁড়ি, মাথায় মাথাল, পরনে লুঙ্গি, হাতে লাঠি। হাতের লাঠিটি ঘুরাতে ঘুরাতে নাতিকে শুধায়, আগে বোল কিসের অনুষ্ঠানের লেগি আমাকে বোলেছিস?
- আজকে এখেনে আম, সিল্ক প্রদর্শনী ও লোকউতসব চলছে যে।
এভাবে নানা-নাতির রসালো আলাপচারিতা চলতে থাকে কিছুন। এর পর গানের ধুয়া তোলে দু’জন-
‘হে নানা, শান্তির শহর এই রাজশাহী
তার গুণগান হামরা গাহি
এই রাজশাহীর নাই যে কোথাও তুলনা
হে নানা, শিার শহর এই রাজশাহী
মানুষ গরার কারখানা।’
ধুয়ার পর সংলাপ। সংলাপের পর ধুয়া। এভাবেই গীত হতে থাকে গম্ভীরা।
গম্ভীরা পরিবেশনের এ চিত্রটি আম, সিল্ক প্রদর্শনী ও লোক উৎসব মঞ্চের। রাজশাহী নগরভবন প্রাঙ্গনে তিন দিনব্যাপী এ উতসব শুরু হয় গত ২২ জুন এবং শেষ হয় ২৪ জুন।
বরেন্দ্রনগরী রাজশাহীর বিখ্যাত আম, সিল্ক এবং গম্ভীরাকে উপজীব্য করে ‘আমরা রাজশাহীবাসী’ নামে একটি আঞ্চলিক সংগঠন বাৎসরিকভাবে এর আয়োজন করে। বরাবরের মতো এবারের উৎসবেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছে বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংক। এবার নিয়ে পরপর চারবার এই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। গত বুধবার নগরভবন প্রাঙ্গনে তিনদিনব্যাপি অনুষ্ঠানটি শুরু হয় বিকেল পাঁচটায়। শেষ হয় রাত দশটায়। বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও ফিতা কাটার মধ্য দিয়ে এটি উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র-১ সরিফুল ইসলাম বাবু। সভাপতিত্ব করেন আমরা রাজশাহীবাসীর সভাপতি মো. আবু বাক্কার আলী। উদ্বোধনের পর মেলামঞ্চে একে একে বক্তৃতা করেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের চেয়ারম্যান ড.আবুল আহসান চৌধুরী, বাংলাদেশ সিল্ক বোর্ড রাজশাহীর চেয়ারম্যান সুনীল চন্দ্র পাল এবং বাংলালিংকের সহকারি ম্যানেজার শিবলী সাদিকসহ আরো অনেকেই ।
নগরভবন আঙিনায় বসেছিল আম ও সিল্কের পসরা। উদ্বোধনের সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা কম থাকলেও সন্ধ্যার পর সরগরম হয়ে উঠতে থাকে মেলাপ্রাঙ্গন।
রাজশাহীর কৃষকদের অনেকেই আমের ওপর নির্ভরশী। বাংলাদেশেতো নয়ই বরং পৃথিবীর কোথাও এমন সুস্বাদু ও সুগঠিত আম নেই। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ও তৃতিয় দিনও সকাল ১০টা থেকে রাত দশটা পর্যন্তভিন্ন ভিন্ন জাতের রকমারি স্বাদের আম প্রদর্শিত হয়।
রাজশাহীকে বলা হয় রেশমনগরী। এখানকার সিল্কের গুটি থেকে তৈরি হয় অভিজাত ও মসৃন কাপড়। রাজশাহী সিল্কের শাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের চাহিদা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পরেছে। মেলার স্টলগুলোতে সিল্কের তৈরি পোশাক প্রদর্শিত হয়েছে।
রাজশাহী অঞ্চলের আরেক ঐতিহ্য গম্ভীরা। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এলাকায় এ গানের সূচনা হয়। পরবর্তীতে তা রাজশাহী অঞ্চলের গান হয়ে ওঠে। এ ধারার গানে প্রধানত দু’টি কেন্দ্রীয় চরিত্র মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এদের একজন হচ্ছেন নানা, যিনি পেশায় কৃষক এবং অন্যজন নাতি, যে একজন রাখাল। গম্ভীরায় সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি উঠে আসলেও সময়ের সাথে সাথে এর স্বরুপ পাল্টাচ্ছে। এবারের উতসবে পরিবেশিত গম্ভীরার মূল বিষয়বস্তু ছিল রাজশাহীর শিা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরনে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। গম্ভীরায় নানার ভূমিকায় ছিলেন খুরশিদ আল মাহমুদ ও নাতির ভূমিকায় মো: মনি আক্তারুল ইসলাম সনি। দু’জনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন যায়গায় গম্ভীরা পরিবেশন করছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে রাজশাহী থিয়েটারের মাধ্যমে গম্ভীরার সাথে আস্টেপৃস্টে জড়িয়ে যান ‘ খুরশিদ।
মো: মনি আক্তারুল ইসলাম সনি নাতির ভূমিকায় মঞ্চে আছেন ছয় বছর হলো। নিজের মনের তাগিদেই আনন্দের সাথে কাজটি করে যাচ্ছেন তিনি ‘লোকজ সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য আমরা গম্ভীরা শুরু করি। আমাদের পরিবারের কেউ সংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে জড়িত না থাকলেও নিজের চেস্টায় আমি উঠে এসেছি।’ খুরশিদের মতো তিনিও রাজশাহী থিয়েটার থেকেই উঠে এসেছেন। তিনি মনে করেন ম্যাসেজ পৌঁছানোর একটি ভালো মাধ্যম হলো গম্ভীরা ‘ নানা নাতির হাস্যরসের মাধ্যমে সহযেই মানুষের কাছে মেসেজ পৌঁছে দিতে পারি আমরা। তাই গম্ভীরা সমাজসচেতনতা তৈরি করতে সহায়ক।’
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করার পর অন্য কোন পেশায় না গিয়ে গম্ভীরাকেই তারা পেশা হিসাবে নিয়েছেন। তবে তিনি বলেন ‘এখন পর্যন্ত গম্ভীরা তেমনভাবে পেশাদারিত্বের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু এর প্রসার যেভাবে হচ্ছে, সেই ধারাবাহিকতা অব্যহত থাকলে গম্ভীরাকে পরিপূর্ণ পেশা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য খুব বেশি দিন অপো করতে হবে না আমাদের।’

সোমবার, জুন ২৭, ২০১১

ছবিটা ডাইনোসর যুগের


ছবিটা ডাইনোসর যুগের। চলে এসেছে টাইম মেশিনে চড়ে। সেই যুগের কোন একদিনে (২৩ জুন) আমরা তিনজন ( বা থেকে আমি, বিশিস্ট আম্রখাদক সোহেল অটল ও জোবায়ের) গিয়েছিলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে।
সাথে অবশ্য আরো অনেকে ছিলেন কিন্তু টাইম মেশিনের চোখে তারা আপাতত ধরা পড়েননি।

শনিবার, মে ২৮, ২০১১

ইশকুল পালিয়ে


‘আজকালকার কিশোরদের ওপর পড়া লেখার যে চাপ, তা অনেকটা রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার মতো’
ওমা, এমন কথা আবার কে বললো?
নিশ্চয়ই মহা ফাঁকিবাজ ধরনের কেউ হবে। পড়ালেখার চাপ আর রিমান্ড কি এক জিনিস হলো?
পড়ালেখাতো তুমিও করছো। তুমি কি রিমান্ডে আছো বলে মনে হয়?
কই নাতো দিব্যি স্বাধীন-ই আছো। সকালে আম্মুর ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠছো। তারপর তড়িঘড়ি করে প্রাত কাজ সারছো, নাস্তা করছো এবং আম্মু কিংবা আব্বুর সাথে ইশকুলে যাচ্ছো। কাস শেষে আবার ঠিক ঠিকই বাসায় ফিরে আসছো। তারপর কয়েকজন টিচার আসছেন তোমাকে পড়াতে। ব্যস, এভাবেইতো দিন কেটে যাচ্ছে। একে কি রিমান্ড বলা যায়?
কে সেই বোকা লোকটা, যে কিনা এমন কথা বললো?
উহু, সেই লোকটা কিন্তু মোটেও বোকা নন। তাঁর নাম রকিব হাসান।
তিন গোয়েন্দা সিরিজের লেখক?
হ্যা, রকিব হাসান বলতে তো তাকেই বোঝায়।
এই সেরেছে রে। তাহলেতো বিশ্বাস না করে উপায় নেই। তিনিতো আর মিথ্যে বলার লোক নন। তাছাড়া কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ডের মতো বিচ্ছুরা যার কলমের ইশারায় উঠবস করে, তাকে আর যাই হোক বোকা বলা যাবে না।
রকিব হাসানের কাছে তোমাদের এই অতিপড়াপড়ির রুটিনটা রীতিমত রিমান্ডের মতোই মনে হয়। এই যে আম্মুর ডাকে ঘুম থেকে উঠছো, ইশকুলে যাচ্ছো, টিউটরের কাছে পড়ছো এসবকেই তিনি রিমান্ড বলেছেন। অর্থাৎ তোমাদের জীবনে এখন পড়া লেখার রিমান্ড চলছে আরকি। এবার নিশ্চয়ই ভাবছো, রকিব হাসানের কাছে হয়তো ইশকুল মানেই ছিলো আতঙ্ক? মোটেই তা নয়। তার কাছে ইশকুল ছিলো স্বপ্ন, আনন্দ আর যত দূরন্তপনার স্বর্গরাজ্য। সেইসময়ের ইশকুলগুলো এখনকার মতো ছিলো না। তোমরাতো পড়াপড়ির চাপে না সময় পাও খেলতে যেতে, না পারো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে। তখনকার ইশকুল যদি এমন হতো, তবে হয়তো কিশোর রকিব হাসানের পড়ালেখাই করা হতো না। তাইতো এই বয়সে এসে পড়ালেখার রিমান্ডবন্দি তোমাদের জন্য বড় মায়া হয় তার। তোমরা কি এখন ইচ্ছে করলেই বেরোতে পারবে ডোংরা গাছের পাতার ভেতর টুনটুনির বাসা খোঁজার অভিযানে? একদমই পারবে না। এবার হয়তো মানবে যে, তোমাদের এখনকার অতিপড়াপড়িকে রিমান্ডের সাথে তুলনা করে ভুল করেন নি রকিব হাসান। শুনলে লোভ হতে পারে- রকিব হাসানদের ইশকুলবেলাটা ছিলো স্বপ্নের মতো। তিনি কেবল টুনটুনির বাসা-ই খুঁজেছেন এমন নয়, রীতিমত গুলতি নিয়ে পাখি শিকারেও বেড়িয়েছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছেন ডুব সাাঁতার দিয়ে। তাই বলে আবার ভেবো না, রোজ রোজ ইশকুল পালিয়ে কেবল হইরই করে বেড়াতেন। ইশকুল পালানোর রেকর্ড বলতে গেলে তার একদমই নাই। গুটিকয়েক যাও আছে তাও পড়ালেখার ভয়ে নয়। ইশকুলের পড়া তার কাছে কোন ব্যপারই ছিলো না। কারণ বছরের শুরুতে নতুন বই পাওয়ার পর পরই প্রায় সব পড়া শেষ হয়ে যেতো। তাই পিটুনির ভয়ে ইশকুল পালানোর প্রশ্নই উঠে না। তবে হ্যা, ইশকুল থেকে জানালা দিয়ে পালিয়ে আসার একটি ঘটনা আছে বটে- একবার কাসে বসেই তিনি খবর পেলেন বিরাট বিরাট গামলা ভরে মিষ্টি আসছে ইশকুলে। কি যেন কি উপলক্ষ্যে তাদেরকে মিষ্টি খাওয়ানো হবে। খবর শুনেতো কাসে শুরু হয়ে গেলো প্রচন্ড হট্টগোল। টেবিল চাপড়ানো, জোরে-জোরে কথা বলা, চেঁচানো ইত্যাদি আরকি। কিছুক্ষন পর ঠিকই দেখা গেল দফতরি মিষ্টি নিয়ে চলে এসেছে। সবাইকে বলল, যার যার খাতা থেকে একটা করে পাতা ছিঁড়ে নিতে। ফড়াত ফড়াত পাতা ছিঁড়তে লাগলো সবাই। কিন্তু রকিব হাসানের আর তর সইছিলো না। কিসের আবার ছেঁড়াছেড়ি, হাতে নিয়েই খেয়ে ফেলা যায়। আম্মাতো আর কাসে নেই যে হাত ময়লা কি না দেখতে আসবে। শুরু হলো মিষ্টি বিতরণ। সাথে করে একটা পিরিচ আর ছুরি নিয়ে এসেছে দফতরি। পিরিেিচ একটি করে রসগোল্লা তুলে রাখে, ছুরি দিয়ে কেটে দুই ভাগ করে, তারপর অর্ধেকটা রসগোল্লা আলগোছে তুলে এনে ফেলে দেয় ছেলেদের বাড়িয়ে দেয়া কাগজে। এই অর্ধেকটা করে রসগোল্লা বিতরণ করছে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো রকিব হাসানের। তাকে যখন দিতে এলো, সাফ মানা করে দিলেন, খাবেন না।
হয়তো ভাবছো মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ির সাথে আবার ইশকুল পালানোর সম্পর্ক কী? হ্যা সম্পর্কতো একটা আছেই। তাহলে পরের ঘটনা শোন- মিষ্টি খাওয়ার হইচইতো শেষ হলো। কিছুক্ষন পর পাশের ঘরে আবার শুরু হলো হট্টগােল। কী ব্যাপার? একটি ছেলে বলল, ‘আবার মিষ্টি নাকি?’। হলেও হতে পারে। তখন কম হয়ে গিয়েছিলো বলে আবার এনেছে। পরক্ষনেই গলা ফাটিয়ে চেঁচানোর শব্দ পেলেন। ঘটনা কী? কিছুক্ষন পরই খবর এলো ইশকুলের সব ছাত্রদেরকে কলেরার ইনজেকশন দেয়া হবে। এই ছিল তবে মিষ্টি খাওয়ানোর পেছনের কারণ! যথারীতি ভারিক্কি চালে কাসরুমে ঢোকল মেডিকেল টিম। ঢোকেই দরজা বন্ধ করে দিলো। প্রথম বেঞ্চের প্রথম ছেলেটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো তারা। গাঁইগুঁই করতে লাগল ছেলেটি। কিন্তু এতে কোন কানই দিলোনা ওরা। চামড়ায় সুচ ঠেকতেই আঁউ করে উঠল ছেলেটা। তারপর ভ্য্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। সিরিয়ালে দুই নম্বর ছেলেটাকে ধরতে যেতেই সে ঢুকে গেল বেঞ্চের তলায়।
এসব দেখে কি আর স্থির থাকা যায়? তার বুকেও তখন কাঁপুনি ওঠেছে। স্যার তাদেরকে অভয় দেয়ার জন্য বার বার বলছিলেন ‘কিছু না, কিছু না, পিঁপড়ের কামড়। টেরই পাবে না।’ কথার সত্যতা প্রমাণ করার জন্য নিজেই শার্টের হাতা গুটিয়ে এগিয়ে গেলেন ইনজেকশন নিতে। সুচ ফোটানোর সাথে সাথে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তাঁর চেহারা বিকৃত করে ফেলার ভঙ্গি দেখেই সবাই আন্দাজ করে ফেলেছিলো, পিঁপড়ের কামড়টা বড় শক্ত কামড়।
ভয়টা আরো বেড়ে গেল তার। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, তিনি যেখানে বসে আছেন এর পাশের জানালাতে শিক নেই। জানালাটা অনেক বড় হলেও বেশ উঁচুতে। ওটা ডিঙাতে হলে বেঞ্চের ওপর উঠতে হবে। স্যার দেখে ফেলতে পারেন। সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার যেটি তা হলো, ওখান থেকে নিচে লাফিযে নামা। জানালার ঠিক নিচে রয়েছে একটি চওড়া ড্রেন। আর কাঁটাঝোপে ভরা। তবুও সেটা ইনজেকশনের চেয়ে ভালো মনে হলো। হঠাৎ তিনি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়ালেন। একলাফে জানালায় উঠে যা থাকে কপালে ভেবে দিলেন লাফ। নর্দমা ডিঙিয়ে পড়লেন ওপাশে। কাঁটার আঁচড় লাগল দু-এক জায়গায়। তবুও দিলেন ঝেড়ে দৌড়। বইখাতা সব কাসেই ফেলে এসেছেন। জানেন, এগুলো হারাবে না। দফতরি হয়তো অফিসঘরে রেখে দেবে।
এই হলো রকিব হাসানের ইশকুল পালানোর গল্প। আর যেদিন তিনি স্থির করতেন ইশকুলে যাবেন না, ব্যাস জোর করেও কেউ তাকে পাঠাতে পারতো না। কারণ সবাই জানতো একগুঁয়ে এ ছেলের ওপর জোর খাটবে না। ইশকুলে না গিয়ে কি করতেন সে সময়টুকু? চলে যেতেন পুকুরে মাছ ধরতে কিংবা টই টই করে ঘুরে বেড়াতে।
এতক্ষনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে, তিনি টই টই করে ঘুরে বেড়িয়েছেন, মাছ ধরেছেন, গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করেছেন সবই মানলাম। তবে গোয়েন্দাগিরি করেছেন কখন?
খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন। যেহেতু তিনি তিনগোয়েন্দা সিরিজের লেখক, সেহেতো তার কিশোরবেলাটা গোয়েন্দাদের পালের গোদা হিসাবে কেটেছে এমন ধারণা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর নিশ্চয়ই বেশ কয়েকজন চৌকষ চেলাপেলা তাকে ছায়ার মতো অনুকরণ করতো। সবার কাজ ছিলো কোথায় কার মুরগি চুরি গেছে, কবে কার ছাগল হারিয়ে ফেলেছে ইত্যাদি নানান ঘটনার খোঁজখবর রাখা। আবার নিজেদের তাগিদেই রহস্য উদঘাটনে আদাজল খেয়ে লাগতো সবাই। রকিব হাসানের নামের সাথে এমন ধরনের কল্পনাইতো মানানসই, তাই না?
হ্যা, তাই। তিনিও গোয়েন্দা ছিলেন। তবে মনে মনে গোয়েন্দা আরকি। দস্যু বাহরাম, শার্লক হোমস এগুলো নিয়মিত পড়তেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অনেকটা নিঃসঙ্গ। তাই কিশোরগোয়েন্দা দল গঠন করাও তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য এমন কোন ইচ্ছেও ছিলো না তার।
কি সাঙ্ঘাতিক কথারে বাবা, ছোটবেলায় গোয়েন্দাগিরি করার সামান্যতম অভিজ্ঞতা নেই, অথচ বড় হয়ে কিনা লিখে ফেললেন গাদাগাদা রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা কাহিনী!
এতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। সব শিক্ষার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়না। বই পড়ে পড়ে পৃথিবী ঘুরে আসা যায়। কাজেই তিনিও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বই পড়ে। তাকে বাস্তবে গোয়েন্দাগিরি করে গোয়েন্দাসিরিজ লিখতে হয়নি।
রকি বীচের লোহালক্করের জঞ্জালের ভেতর থাকে গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর পাশা। বাংলাদেশী বংশো™ভ’ত। ুদ্র জিনিসও বুদ্ধিদীপ্ত এ ছেলেটির দৃষ্টি এড়ায় না। যে জিনিস একবার দেখে সেটা মনে থাকে দীর্ঘদিন। তার মুদ্রাদোষ হলো গভীর চিন্তামগ্ন থাকলে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটা। গোয়েন্দা সিরিজের দ্বিতীয় চরিত্র মুসা আমান। তাকে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, লনের ঘাস ছাটা এসব কাজ প্রায়ই করতে হয়। শত্রুর পেটে আঘাত করতে তার জুড়ি নেই। তার মুদ্রাদোষ হলো কথায় কথায় ‘খাইছে’ কিংবা ‘ইয়াল্লা’ বলা। ভ’তে তার যত ভয়। তবে বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে সাহসী হয়ে উঠে মুসা। আর তিন গোয়েন্দার নথি গবেষক হিসেবে পরিচিত রবিন মিলফোর্ড। আয়ারল্যান্ডের বংশোদ্ভোত। তার কাজ হচ্ছে তিন গোয়েন্দার সকল কেসের রেকর্ড ব্যখ্যা বা নথি সংরক্ষণ করা। সে তিন গোয়েন্দার সবার মধ্যে সবচেয়ে কেতাদুরস্ত।
এ তিনটি চরিত্রের রোমাঞ্চকর গোয়েন্দাগিরিই তার লেখার উপজীব্য। এ তিনটি চরিত্রকে অনুসরণ করে তোমাদের মতো অনেকেই গোয়েন্দা দল গঠন করে ফেলেছে। কেউ হাতে অস্ত্র নিয়ে গোপন আস্তানাও গড়েছে। দূর্ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য এলাকার মুরব্বিদের ফুসলিয়েছে এমন কিশোরেরও অভাব নেই। কেউ কেউ আবার শখের গোয়েন্দা হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতো। আবার অনেকেই প্রচন্ড আবেগ নিয়ে রহস্যের জট খোলার নতুন কৌশল শেখার আশায় দেখা করেছে স্বয়ং রকিব হাসানের সাথেও। তারপর তিনি ওদেরকে কি উপদেশ দিয়েছেন জানো?
তিনি বলেছেন ‘কল্পনাকে সবসময় বাস্তবের সাথে মেলাতে নেই।’

শুক্রবার, মে ২৭, ২০১১

পাতায় পাতায় গাঁথা


পাতার দ্বীপের পাতার খবর দুধ সাগরে দুলছে
দোদুল দুলে হাওয়ায় ভেসে জনে জনে তুলছে-

হাসলে পাতা মুক্তো ঝরে
কাঁদলে ঝরে পাতা
পাতার দ্বীপের কান্নাগুলো
পাতায় পাতায় গাঁথা।

কেন কেন কাঁদবে কেন
দ্বীপের রাণি পাতা!
এমন খবর মিথ্যে খবর
ধ্যত্তেরি ছাই ছাতা।

মিথ্যেনাগো মিথ্যেনাগো
মিথ্যে নয় এক রত্তি,
পাতারাণি ভীষণ একা
সত্যি খবর সত্যি।

নাম রাখা যাক পাতা



যে মেয়েটি পাতার ঘরে
পাতায় পাতায় ঘুমোয়
চোখের পাতা এক করে যে
চাঁদের চুমোয় চুমোয়

সেই মেয়েটির নাম যেন কী?
তেপান্তরের কেউ জানে না
হয়তো বুঝি সেও জানে না
নাম ছাড়া সে যায় না ডাকা
যায়না মনের ছবি আঁকা
তাই মেয়েটার নাম রাখা যাক
পাতা

সেই মেয়েটির ধাম জেনেছি
দূর কোথাও অচীনপুরে
যেখানটাতে স্বপ্ন ঘুরে
দুধ সাদা এক সাগর তীরে
পাতার দ্বীপে পাতার ভীড়ে
পাতাই হলো সেই মেয়েটির
ছাতা

বুধবার, এপ্রিল ২০, ২০১১

দুইখানা গাভী লইয়া রাজনৈতিক রঙ্গ


ধরা যাক আপনি দু’টি গাভীর মালিক। এ দু’টি গাভীর পরিণতি কোথায় কেমন হবে তা নিয়েই রাজনৈতিক রঙ্গ

ডেমোক্রেট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। নিজের জন্য একটি রেখে অপরটি প্রতিবেশীকে দিয়ে দিন।

সোসাইলিস্ট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এর মধ্যে একটিকে সরকার নিয়ে নেবে এবং আপনার প্রতিবেশীকে দিয়ে দেবে।

আমেরিকান রিপাবলিকান
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। আর আপনার প্রতিবেশীর কোন গাভীই নেই। তাতে কী আসে যায়?

কমিউনিস্ট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সরকার দুটোর মালিকানা নিযে নেবে এবং আপনাকে দুধ সরবরাহ করবে।

ফ্যাসিস্ট
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সরকার দুটোকেই ক্রোক করে আপনার কাছেই দুধ বিক্রি করবে। আর আপনি গোপন আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়ে ধ্বংসাত্বক প্রচারণা শুরু করবেন।

ডেমোক্রেসি (আমেরিকান স্টাইল)
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। একটি গাভীর মালিক এমন ভিনদেশী কারো সাহায্যার্থে সরকার আপনার কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করবে। যার ধকল সইতে না পেরে দুটো গাভীই বিক্রি করতে বাধ্য হবেন। উল্লেখ্য, ভীনদেশীর আগের গাভীটি ছিলো আপনার সরকারেরই উপহার

পুঁজিবাদ (আমেরিকান স্টাইল)
আপনার দু’টি গাভী রয়েছ্ েএকটি বিক্রি করে একটি ষাঁঢ় কিনেন এবং গরুর পাল তৈরি করেন।

ব্যুরোক্রেসী (আমেরিকান স্টাইল)
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সরকার দুটোকেই নিয়ে নেবে, একটিকে লাথি দেবে, অপরটির দুধ দোহন করবে এবং আপনাকে দুধের দাম পরিশোধ করতে হবে। তারপর সমস্ত দুধ ড্রেনে ফেলে দেবে।

আমেরিকান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। একটিকে বিক্রি করে অন্যটিকে চারটি গরুর সমান দুধ দেয়ার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন করে তুলুন। আপনি তখনি অবাক হবেন, যখন গাভীটি মারা যাবে।

ফ্রান্স করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। আরো একটি গাভীর মালিকানার দাবিতে আপনি ধর্মঘটে যান।

জাপানিজ করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এদেরকে এমনভাবে তৈরি করুন, যেন সাধারণ গরুর দশভাগের একভাগ আকার হয়েও দৈনিক বিশবার দুধ দেয়। তারপর চালাক চতুর গাভীর কার্টুন ইমেজ তৈরি করে বিশ্বের বাজারে ছেড়ে দিন।

জার্মান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এদেরকে এমনভাবে তৈরি করেন, যেন গাভী দুটি ১০০বছর বাঁচে, মাসে একবার খায়, তাও নিজের দুধ।

ব্রিটিশ করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। এরা পাগল, এরা মৃত। এখন এদের জন্য কেবল অনুগ্রহ প্রয়োজন

ইতালিয়ান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। কিন্তু জানেন না এরা এখন কোথায় আছে। এদেরকে খোঁজে বের করার আগে দুপুরের খাবারের বিরতি নিন।

রাশিয়ান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। সত্যিই গাভীর সংখ্যা দুই কিনা তা গুনে দেখুন। প্রথমবার গোনার পর দেখলেন গাভীর সংখ্যা দুইটি নয় পাঁচটি। আবার গুনুন। এবার দেখলেন পাঁচটি থেকে গাভীর সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৪২টিতে। ধৈর্য্য হারাবেন না। আবার চেস্টা চালান। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এবার সংখ্যাটা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ১২টিতে। অবশেষে ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙ্গে গেল আপনার। গাভী গোনা বন্ধ করে আরেক বোতল ভদকার ছিপি খুলুন।

সুইস করপোরেশন
আপনার দু’টি নয় ৫০০০ গাভী রয়েছে। কিন্তু এগুলো আয়ত্ত্বের বাইরে। তাই অন্যদেরকে গাভীগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিন।

ব্রাজিলিয়ান করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। আমেরিকান করপোরেশনের সাথে পার্টনারশীপে আসুন। দ্রুত আপনি ১০০০ গাভীর মালিক হয়ে যাবেন এবং একসময় আমেরিকান করপোরেশন কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হবেন।

ভারতীয় করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। দুটোকেই পরম ভক্তিতে পূজা করুন।

চাইনিজ করপোরেশন
আপনার গাভী রয়েছে মাত্র দু’টি, আর দুধ দোহনের জন্য লোক রয়েছে ৩০০ জন। সবাইকে আরো বেশি দুধ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করুন। এ লোকগুলোর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হবে প্রোডাকশন বৃদ্ধির দিকে। আর এসব নিয়ে যে সাংবাদিক রিপোর্ট করবে, তাকে গ্রেফতার করুন।

ইসরাইলি করপোরেশন
আপনার দু’টি গাভী রয়েছে। গাভী দু’টি আপনার ওপর নির্ভরশীল নয়। এরা নিজেরাই একটি দুধের কারখানা, একটি আইসক্রীম স্টোর খুলে বসলো। তারপর নিজেদের চলচ্চিত্র স্বত্ব বিক্রী করল। আর এদের বাছুরকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পাঠাল এমফিল করার জন্য।
সেখানে আপনার প্রয়োজন আর কতটুকু?

শনিবার, এপ্রিল ০২, ২০১১

রঙ্গব্যঙ্গ পাঁচফোড়ন

আইডিয়াবাজ সম্পাদিত রঙ্গব্যঙ্গ পাঁচফোড়ন এর মোড়ক উন্মোচন।
উন্মোচন করছেন- আনিসুল হক ও আহসান হাবীব। পাশে সোহেল অটল ও তারেক ফিরোজসহ অন্যরা। আর ক্যামেরার আড়ালে আমিতো আছিই।
তারিখ- ২৪ ফেব্রুয়ারি'২০১১
স্থান- একুশে বইমেলা

শুক্রবার, মার্চ ০৪, ২০১১

গোঁফ বিভ্রাট


শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
গোফরান সাহেব। কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। আপাদমস্তক ভদ্রলোক। অবশ্য তিনি ভদ্র কী অভদ্র সে বিষয়ে আপাতত না গেলেও চলে। কারণ অফিসের সবাই এখন গোফরান সাহেবের গোঁফ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। গোঁফ, সে তো যেকোনো পুরুষেরই থাকে। এ নিয়ে আবার ব্যস্ত হওয়ার কী আছে? হ্যাঁ, ব্যাপার একটা আছে বটেÑ
তবে ব্যাপারটাতে ঢোকার আগে গোঁফ বিষয়ে সবার একটা সাধারণ ধারণা থাকা প্রয়োজন। উইকিপিডিয়া বাংলায় গোঁফের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে ‘গোঁফ বা মোচ হলো ওষ্ঠের ওপরে গজানো চুল। সাধারণত কারো গোঁফ আছে বলা হলে মনে করা হয় তার ওষ্ঠের ওপরের অংশটুকুতেই তা সীমাবদ্ধ আছে, কারণ গাল ও থুতনির অন্যান্য অংশে গজানো চুলকে দাড়ি বলা হয়। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের গোঁফ ওঠা শুরু হয়। নিওলিথিক যুগ থেকেই পাথরের ুর দিয়ে ৗেরি করার চল শুরু হয়, আর এই সুদীর্ঘকালের ব্যবধানে গোঁফের নানারকম ফ্যাশন চালু হয়েছে। যারা গোঁফ রাখে তারা নিয়মিত ছেঁটে ও আঁচডে রীতিমতো এর যতœ করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীর্ঘ ও সযতেœ রতি গোঁফের প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। বিশ্ব দাড়ি ও গোঁফ চ্যাম্পিয়নশিপে ছয়টি উপবিভাগে গোঁফের বিভাজন করা হয়। গোঁফের এমন কদর দেখেই হয়তো বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ননসেন্স ছড়াকার সুকুমার রায় বলেছিলেন : ‘গোঁফকে বলে তোমার আমারÑ গোঁফ কি কারো কেনা?/গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’
উইকিপিডিয়ার বর্ণনা এতটুকুই। সেখানে গোফরান সাহেবের গোঁফের কথা উল্লেখ না থাকলেও সুকুমার রায়ের কবিতার একটি উদ্ধৃতি রয়েছে। হেড অফিসের এক বড়বাবু এ কবিতাটির নায়কের ভূমিকায়। আর আমাদের নায়ক গোফরান সাহেব। সুকুমার রায়ের নায়ক আর আমাদের নায়কের মাঝে পার্থক্য এতটুকু যে, বড়বাবুর সামান্য একটু মাথার ব্যামো থাকলেও এমনিতে বেশ শান্ত স্বভাবেরই। আর গোফরান সাহেবের মাথায় কোনো রকমের ব্যামোট্যামো নেই। কিন্তু তাকে কিঞ্চিত অস্থির স্বভাবের বলা চলে। আরো একটি সাঙ্ঘাতিক ধরনের পার্থক্য রয়েছেÑ একদিন কাউকে না বলে, না কয়েই বড়বাবু আন্দাজ করে বসলেন, তার গোঁফজোড়া বুঝি হারানো গেল, ‘ব্যস্ত সবাই এদিক-ওদিক করছে ঘোরাঘুরি.../বাবু হাঁকেন, ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি!/ গোঁফ হারানো! আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি?/ গোঁফ জোড়া তো তেমনি আছে, কমেনি এক রত্তি/সবাই তারে বুঝিয়ে বলে, সামনে ধরে আয়না।/ মোটেও গোঁফ হয়নি চুরি, কখনো তা হয় না।’ কিন্তু গোফরান সাহেবের গোঁফ কখনো চুরি গিয়েছিল বলে আজ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ মেলেনি। চুরি করা তো দূরের কথা তার ভোলা-ভালা পাতলা গোঁফগুলোতে হাত দেয়ার সাহস পর্যন্ত কেউ রাখে না। পাতলা বলতে একেবারে পাতলা নয়। সামান্য চারা-চারা আর ছাড়া ছাড়া আরকি। উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী এগুলোকে নিঃসন্দেহে গোঁফ বলে স্বীকৃতি দেয়া যায়।
এ তো গেলো গোঁফের কথা। কিন্তু তার দাড়ির রকমটা কী? সে বিষয়েও ধারণা নিয়ে নেয়া জরুরি। হ্যাঁ, পাতলা-টাতলা গোঁফের পাশাপাশি হালকা-সালকা কিছু দাড়িও রয়েছে তার। একবার সময় করে বসলে গুণে ফেলা যাবে সবগুলো। গোফরান সাহেব নিজে বেশ কয়েকবার দাড়ি শুমারিতে মনোনিবেশ করেছিলেন। চুলের জুলফি থেকে গালের নরম অংশটুকু পর্যন্ত সফলভাবেই গুণে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু থুতনির দিকে এসেই সব গোলমেলে হয়ে গেলো। ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’ এ মন্ত্রের শিক্ষা ছোটবেলায়ই পেয়েছিলেন তিনি। তাই জানার অদম্য বাসনায় শতবার পেরিয়ে হাজারবার পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। কিন্তু দাড়ি শুমারির কাজটা শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বার বারই থুতনিতে এসে হিসাব লণ্ডভণ্ড। একজন মানুষের ধৈর্য্য বলতেও তো একটা কথা আছে। একদিন ঠুস করেই তার ধৈর্য্যরে বাঁধটা ভেঙে গেল। সব কিছু ভাঙলে যেমন কম্পন তৈরি হয়, তারপর সেই কম্পন শব্দ হয়ে আঘাত করে মানুষের কানে, গোফরান সাহেবের বেলায়ও তেমনটি ঘটল। অর্থাৎ তার অন্তরের অন্তঃস্থলে একটি মারাত্মক ধরনের কম্পন তৈরি হলো। আর সে কম্পনের বহিঃপ্রকাশ ঘটল মুখে-চোখে। এমনকি ঠোঁটেও। তবে এই কম্পন সেই কম্পন নয়। কম্পনের চোটে তার লজ্জারাঙা মুখে মিষ্টি ধরনের ভাব ফুটে উঠল। সেই সাথে ঠোঁটের ফোকর ভেদ করে ‘হিস হিস’ ধরনের হাসির শব্দও বেরিয়ে এলো।
দেখ দেখি কী কাণ্ড! দাড়ি শুমারিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার হাসতে যাবেন কেন? এই কেনর জবাবটা যে কি তার সবটুকু বলা যাবে না। সে এক লম্বা ইতিহাস। তবে এ হাসির গোপন রহস্য সম্পর্কে অল্প-স্বল্প ধারণা দেয়া যেতে পারে মাত্র। সেদিনের সেই ঘটনার কথাটাই ধরা যাকÑ
অফিসের ক্যান্টিনে রোজকার মতো খেতে বসেছিলেন গোফরান সাহেব। হঠাৎই আবিষ্কার করলেন তিনি কোনোভাবেই ডালে চুমুক দিতে পারছেন না। যতবারই চেষ্টা করছেন ততবারই গোঁফজোড়া ভিজে যাচ্ছে। এমন ফ্যাঁসাদে জীবনে পড়েননি। রবীন্দ্রনাথ তাহলে ডাল খেতেন কিভাবে? নাকি ডাল খাওয়ার জন্য গোঁফওয়ালাদের বিশেষ কোনো পদ্ধতি রয়েছে? একজন নতুন গোঁফওয়ালা হিসেবে এসব প্রশ্নের জবাব গোফরান সাহেবের না জানারই কথা। কিন্তু এর আগেও তো তিনি ডালে চুমুক দিয়েছেন, এমন তো কখনো হয়নি! তাহলে কি ধরে নেয়া যায় আগের চেয়ে গোঁফজোড়া আরো বড় হয়ে গেছে? হলেও হতে পারে, কমপক্ষে পনের দিন তো হবেই তিনি ডাল স্পর্শ করেননি। এবার খুশি হয়ে উঠলেন গোফরান সাহেব। যাক বাবা, ছাড়াছাড়া গোঁফগুলো এবার তাহলে বাড়তে শুরু করেছে। ইচ্ছা থাকলেই যে উপায় হয় এটা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
বিপুল বিক্রমে ডালে চুমুক দিতে লাগলেন তিনি। ফুড়–ৎ-ফাড়–ৎ শব্দে ক্যান্টিন মুখরিত। অনেকটা নিজের ইচ্ছেতেই ঘনঘন গোঁফজোড়া চুবাচ্ছেন। যার গোঁফ আছে সেই তো গোঁফ নিয়ে যেমন খুশি তেমন খেলতে পারে। যার নেই তার পক্ষে তো আর সম্ভব নয়। কাজেই নগদ যা পাও তা উপভোগ করে নাও। ডালে গোঁফ চুবানোতে যে এত আনন্দ এর আগে চিন্তাও করতে পারেননি তিনি। বড্ড মায়া হলো গোঁফহীনদের জন্য। একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন ক্যান্টিনজুড়ে। তিনি ছাড়া আর কারো নাকের নিচে কিচ্ছুটি নেই। গোঁফ না রাখলে সে আবার কিসের পুরুষ মানুষ! তা ছাড়া গোঁফ চুবানো ডালের স্বাদ যে বুঝেনি তার জীবনের চৌদ্দ আনাই মিছা। তাও আবার যেনতেন গোঁফ নয়, সার-গোবর দিয়ে বড় করে তোলা গোফরান সাহেবের নিজের গোঁফ!
আহ। কী তৃপ্তিরে বাবা। হাত ধুয়ে পরপর দুইবার ঢেঁকুর তুললেন গোফরান সাহেব। তারপর ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলেন বিল পরিশোধ করতে। বিল হলো সর্বমোট তেত্রিশ টাকা। তিনি পকেট থেকে একটি কড়কড়ে পঞ্চাশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন ম্যানেজারের দিকে। যথারীতি বিল রেখে একটি দশ টাকা আর একটি পাঁচ টাকার নোট ফেরত দিলো ম্যানেজার। ‘আর দুই টাকা কোথায়?’ এমন ধরনের একটি জিজ্ঞাসা গোফরান সাহেবের চোখেমুখে ফুটে উঠার আগেই ‘ভাঙতি দুই টাকা নেই’ বলে একটি চুইংগাম বাড়িয়ে দিলো ম্যানেজার। হালের দোকানদারদের যা অবস্থা আরকি। অন্য সময় হলে দুই টাকার পরিবর্তে এই জিনিসটা নিতে রাজি হতেন না তিনি। কিন্তু আজ যে বিশেষ দিন। শখের গোঁফজোড়া যে আরো বড় হয়ে উঠছেÑ আজই তো তার প্রমাণ মিলল। তাই একদমই মেজাজ খারাপ করলেন না গোফরান সাহেব। চুপচাপ খোসা ছাড়িয়ে মুখে পুরে দিলেন চুইংগামটি। শিশুদের এ খাবারটিতে যে এত্তো স্বাদ লুকিয়ে রয়েছে, এ বিষয়ে একদম ধারণা ছিল না তার। এত দিন চুইংগাম খায়নি বলে বড় আফসোস হতে লাগল। ছন্দে ছন্দে চুইংগাম চিবাতে লাগলেন তিনি। সেই সাথে লক্ষ করলেন তার গোঁফজোড়াও সমান তালে নেচে যাচ্ছে। একেবারে সোনায় সোহাগা। গোঁফের নাচনে দোলে দোলে নিজের চেয়ারটাতে এসে বসলেন। এবার একটা সুখের ঘুম প্রয়োজন। মাথা কাত করে চেয়ারেই গা এলিয়ে দিলেন গোফরান সাহেব। দুনিয়ার সব আরাম এসে যেন ঘিরে ধরলো তাকে। লেগে গেলো চোখের পাতা। পুরো পৃথিবীটাই যেন শান্ত হয়ে এলো। চুইংগাম চিবাতে চিবাতেই তিনি চলে গেলেন অতীতের অম্লমধুর দিনগুলোতেÑ
আজকের এই গোঁফ একদিনের ফসল নয়। প্রতিটি সফলতার জন্যই প্রয়োজন নিবিড় অধ্যবসায়। গোফরান সাহেবের অধ্যবসায়ের সেই দিনগুলোই বয়ে এনেছে আজকের সাফল্য। তখন কেবল গোফরান সাহেব কৈশোরে পা দিয়েছেন। সমবয়সি অনেকের কাজলকালো গোঁফ ভেসে উঠলেও তার নাকের নিচে গোঁফের কোনো রেখাই দেখা দেয়নি। সেই সুযোগে অনেক বন্ধুরাই নিজেদের বড় ভাই হিসেবে দাবি করে বসলো। সমবয়সি কাউকে ভাই বলে ডাকবে এমন অপমান সহ্য করার মতো লোক গোফরান নয়। কোনো কালেই তার এ অভ্যাস ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে করেই হোক নিজেকে বড় বলে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু এর জন্য কি করা যায়? দ্বারস্ত হলেন শুভাকাক্সিক্ষদের। কেউ কেউ একেবারেই নিরাশ করল তাকে। সাফ সাফ জানিয়ে দিলো কোনো দিনই নাকি তার গোঁফ গজাবে না। আবার একান্ত কাছের অনেকেই পরামর্শ দিলো ‘নাকের নিচে রেজার চালিয়ে দেখতে পারিস’। আইডিয়াটা পছন্দ হয়ে গেলো গোফরানের। কিন্তু বাসায় তো কোনো রেজার নেই। দোকান থেকে কিনতে যাওয়াটাও সমীচীন হবে না। বেরসিক দোকানি যদি জিজ্ঞেস করেই বসে ‘রেজার দিয়ে তোমার কি কাজ খোকাবাবু?’ কী আর করা, বাধ্য হয়েই বিকল্প পথ বেছে নিতে হলো। খাপখোলা চকচকে ব্লেড হাতে নিয়ে চুপি চুপি বাথরুমে ঢুকতে হয়েছিল তাকে। তারপর পানিতে মুখ ভিজিয়ে একচোট সাবান মেখে নিয়েছিলেন। ভাবখানা এমন যেনÑ সাবানের ফেনার নিচে অসংখ্য খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ লুকিয়ে আছে। একেবারে বড়দের মতো আরকি। তারপর কম্পমান হস্তে ব্লেডটা প্রথম চালিয়েছিলেন ঠিক ওষ্ঠ আর নাসিকার মাঝখানেই (ওষ্ঠ ও নাশিকা-উইকিপিডিয়ায় ব্যবহৃত এ দু’টি শব্দের অর্থ দাঁড়ায় যথাক্রমে ঠোঁট ও নাক)। যা হঙয়ার হলোও তাই। ঠোঁট কেটে একাকার। ভাগ্য সহায় ছিল বলে উন্নত নাসিকার কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আধুনিক যুগের ব্লেড ব্যবহার করেও পার পেলেন না গোফরান।
সদ্য কৈশোরপ্রাপ্ত গোফরান যে এমন কাজ করতে পারেন তা কেউ-ই ভাবতে পারেনি। ঘটনাটা প্রথম ফাঁস হয় তার নিজের বাড়িতেই। তারপর বাড়ি থেকে বন্ধু, বন্ধু থেকে স্কুল। এভাবে গড়াতে গড়াতে একেবারে মেয়ে বন্ধুদের কান পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। জলের মতো সহজ বিষয়টা ধীরে ধীরে বরফের মতো সাঙ্ঘাতিক হয়ে উঠতে থাকে। অন্যদের হাসি-তামাশা যেমন তেমন, মেয়েদের টিটকিরি একেবারেই সহ্য হওয়ার মতো নয়। কাসে, প্রাইভেটে, রাস্তায় যেখানে খুশি পেলেই হলো, মেয়েরা সমস্বরে উত্যক্ত করা শুরু করলো গোফরানকে। আধুনিক ভাষায় একে সম্ভবত ‘এডাম টিজিং’ হিসেবেই অভিহীত করা যায়। কেবল এডাম টিজিংয়ের শিকার হওয়াই শেষ ছিল না, মুরব্বিদের কেউ কেউ ইচড়ে পাকা বলেও খোঁচাটোচা দিতো তাকে। সেই থেকেই জেদ ধরে বসল। যে করেই হোক নাকের নিচে গোঁফ চাই-ই চাই। প্রয়োজনে রোপণ করে হলেও। এর জন্য উর্বর মাটি দরকার হলে আফ্রিকার জঙ্গলে পর্যন্ত যেতে রাজি আছে। আর একবার যদি গোঁফের বাগান জেগে ওঠে, তবে তো ছেঁটে-আঁচড়ে নিয়মিত যতœ নেবেই। শুধু গোঁফের জন্য একটি আলাদা চিরুনির বাজেটও করে ফেললেন গোফরান। এভাবে যতœ-আত্তি আর পুষ্টি পেয়ে গোঁফজোড়া যখন বড় হয়ে উঠবে, তখন তাবড় তাবড় গোঁফের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেন। এক সময় বিশ্ব গোঁফ চ্যাম্পিয়নশিপের গৌরব আসবে তার ঘরেই। তখন গিনেস বুকে যদি তার নাম উঠে যায়, এতেও কোনো আপত্তি থাকবে না।
কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল একটিমাত্র অপূর্ণতা। আর সেটা হলো চেষ্টা-তদবির করেও গোঁফের দেখা পাচ্ছেন না। কথায় আছে ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’। তাই একবার-দু’বার, তিনবার, চারবার করে করে শতবার পর্যন্ত দেখলেন তিনি। কিন্তু কোনো ফল হলো না। তার পরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলেন না গোফরান। শতবার পেরিয়ে হাজারবার। এভাবে হাজার হাজারবার রেজর চালাতে হলো তাকে। রেজরের আঁচড়ে আঁচড়ে গালের চামড়া ভারি করে তুললেন। অবশেষে দু-একটি গোঁফ অঙ্কুরিত হতে দেখা গেল। অর্থাৎ সফলতা তিনি পেয়েছেন। এই প্রথমবারের মতো তিনি প্রমাণ করলেন যেÑ ইচ্ছা থাকিলেই উপায় হয়।
গোফরানের নাকের নিচে গোঁফ দেখে তো মুখপোড়া বন্ধুদের মুখে স্কচটেপ লেগে যাওয়ার অবস্থা। যারা বলেছিল, ‘গোফরানের কখনো গোঁফ গজাবে না’ তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে বেড়াতে লাগলেন তিনি। এরপর থেকেই সবকিছুর কেমন জানি আমূল পরিবর্তন হতে থাকল। যেই বাবার কাছে দশ টাকা চাইলে হাজারটি প্রশ্ন করে জর্জরিত করেন, সেই বাবাই তাকে রেজর কেনার জন্য পুরো ষাট টাকা দিয়ে দিলেন!
সেই থেকে তার গোঁফের যতœ-আত্তিতে মনোযোগ আরো বেড়ে গেল। আরো বেড়ে গেল আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর শঙ্কার দোলা। শঙ্কাটা তখন হয়েছিল দাড়ি নিয়ে। গোঁফের দেখা মিললেও দাড়ির কোনো চিহ্নও ছিল না গোফরানের গালে। আবার সেই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা। অর্থাৎ সার-গোবর, পানি-জল দিয়ে নিড়ানি পদ্ধতি অবলম্বন এবং অবশেষে সফল। এভাবেই চলছিল গোফরানের সংগ্রাম।
একদিন গোফরান বড় হলেন। একটি ভালো চাকরি পেলেন। সেই সাথে পেলেন মুষ্টিমেয় কিছু দাড়ি। এই গোফরান আর সেই গোফরান রইলেন না। তার ওষ্ঠ এবং নাসিকার মধ্যবর্তী স্থানে এখন ছাড়া ছাড়া গোঁফ। আর নিজে বেশ কয়েকবার শুমারি করে ব্যর্থ হয়ে নিশ্চিত হলেন যতেœ লালিত থুতনির দাড়িগুলো এখন শুমারিসীমা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে আজকের ডাল অনুভূতির কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। আহ্ বড়ই তৃপ্তির অনুভূতি। অম্লমধুর স্মৃতি রোমন্থন করতে করতেই আরো একটি মিষ্টি হাসি দিলেন তিনি।
কি অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড! গোফরান সাহেব সামান্য একটি হাসি দিয়েছেন মাত্র, তাও নিঃশব্দে। কিন্তু তার কানে এসে প্রবেশ করল অসংখ্য হাসির কলরোল। পুকুরের মাঝখানে ঢিল ছুড়লে একটি ঢেউ থেকে যেমন পুকুরজুড়ে অসংখ্য ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, ঘটনাটা ঠিক তেমনি ঘটল। ভূতটুত ভর করেনি তো তার ওপর? আধোঘুমে ডুবে থেকেই নিজের গায়ে চিমটি কাটলেন। পরক্ষণেই ককিয়ে উঠলেন ব্যথায় । সবকিছুই দেখি ঠিকঠাক আছে। অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। হয়তো সেটা মনের ভুল হতে পারে। আসলে হাসিটাসির কোনো শব্দই হয়নি। এবার নিশ্চিন্ত হতে যাচ্ছিলেন তিনি। পরপরই ভাবলেন পরীক্ষামূলকভাবে আরো একটি হাসি দিয়ে দেখা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ, ঠোঁট দুটোকে দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে দাঁতগুলো বিকশিত করলেন। ওম্মা! এবার দেখি হাসির চোটে কানে তালা লেগে যাওয়ার অবস্থা হলো। তালা প্রায় লেগেই গিয়েছিলো, যদি তৎক্ষনাৎ চোখ না খুলতেন তিনি-
ততক্ষণে গোফরান সাহেবকে ঘিরে অসংখ্য মানুষের জটলা তৈরি হয়েছে। কেউ হু-হু-হু করে হাসছে, কেউ হাহ্ হাহ্ করে। আবার কারো পেটে খিল ধরে মরণাপন্ন অবস্থা। গোফরান সাহেব ঘটনার আদ্যোপান্ত ঠাহর করতে পারছেন না। এ দিকে বেরসিকের দল তাকে ঘিরে হেসেই চলেছে। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে তিনি মোটামুটি ধরনের নিশ্চিত হয়েই গেছেন সুকুমার রায়ের বড়বাবুর মতো তার গোঁফজোড়াও বুঝি চুরি গেল। আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেনÑ ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি।
চুরি হবে কেনো, ডাকাতি। তারই এক সহকর্মী পরিস্থিতি সম্পর্কে সামান্য ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করলেন।
একি অনাসৃষ্টি! দিনদুপুরে ডাকাতি!
গোফরান সাহেবের গোঁফজোড়া বুঝি এবার খোয়াতে হবে। টিটকিরি করলেন ভিড়ের মধ্য থেকেই আরেকজন।
এতবড় স্পর্ধা! ডাকাতির হুমকি! উত্তেজিত বাতচিত শুরু করলেন গোফরান সাহেব। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এক হাত দেখে নেয়ার উদ্দেশ্যে।
অভ্যাগতদের মাঝে এতক্ষণ যারা মূল ঘটনাটি দেখতে পাচ্ছিলেন না, এবার তারাও স্পষ্ট করে দেখার সুযোগ পেলেন। রাগে গজগজ করতে থাকা গোফরান সাহেবের ডালমাখা গোঁফজোড়ায় লেপ্টে আছে চুইংগাম। বড়ই আঠাল পদার্থ এটি। একবার গোঁফে লেপ্টে গেলে শেভ না করে উপায় থাকে না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অফিসজুড়ে লেগে গেল মহা হট্টগোল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে গোফরান সাহেবের মুখের চুইংগাম গোঁফে লাগল কিভাবে?
কে জানে কিভাবে।